অনূর্ধ্ব-১৯ সাফ নারী চ্যাম্পিয়নশিপে শিরোপা জয়ের গৌরব যেন বাংলাদেশের বিজয়ের মুকুটে আরেকটি পালক। ফুটবল-ক্রিকেটের ব্যর্থতার বছরের শেষে এসে বিজয়ের মাসে মেয়েরা পেয়েছে বীরত্বগাথা এক জয়। সমকালের পক্ষ থেকে আমরা তাদের অভিনন্দন ও ধন্যবাদ জানাই। এটা নিঃসন্দেহে আনন্দের, নারী ফুটবল দল ধারাবাহিকভাবে সাফল্য পেয়ে আসছে এবং বয়সভিত্তিক সাফ গেমসে এটা বাংলাদেশের তৃতীয় শিরোপা। ২০১৭ সালের ডিসেম্বরেই ঢাকায় ভারতকে হারিয়ে প্রথমবার মেয়েদের ফুটবলে যে সাফল্য এসেছিল, কিশোরীদের সেই সাফল্যের শুরুটা বাংলাদেশের ফুটবলের নতুন দিগন্তের সূচনাই বলা চলে। আমরা দেখেছি, বুধবার কমলাপুর বীরশ্রেষ্ঠ শহীদ সিপাহি মোস্তফা কামাল স্টেডিয়ামে ভারতকে হারানোর পর বাংলাদেশের চ্যাম্পিয়ন হওয়ার খুশি ছড়িয়ে পড়ে দেশজুড়ে। শীতের রাতেও কমলাপুর স্টেডিয়ামের গ্যালারিতে ওড়ে লাল-সবুজের পতাকা। বস্তুত মেয়েদের হাত ধরে আসা জয় শুধু স্টেডিয়ামের প্রায় ১৫ হাজার দর্শককেই নয়; বরং নাড়িয়ে দিয়েছে কোটি বাঙালিকে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যেমন মানুষের উচ্ছ্বাস প্রকাশ পেয়েছে, তেমনি সংবাদমাধ্যমের আয়োজনেও জয়ের বাতাস বইছে। ক্রীড়ামোদি রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর অভিনন্দন বার্তা সেই আনন্দে যোগ করে বাড়তি মাত্রা।
বুধবার ফাইনাল ম্যাচে স্বাগতিক বাংলাদেশ ফেভারিট হলেও শক্তিশালী ভারতের বিপক্ষে গুরুত্বপূর্ণ দিনে যেভাবে স্নায়ুর চাপের মধ্যেও অভিজ্ঞতা ও কৌশল প্রদর্শন করে বাংলাদেশ দল জয় এনেছে, সেটি বলার অপেক্ষা রাখে না। জয়ের রানী আনাই মুগনিই নয়, প্রত্যেক খেলোয়াড়ের মধ্যে ফুটবলীয় নৈপুণ্য আমরা যেমন দেখেছি, তেমনি ১১ সদস্যের টিম গঠনে অসাম্প্রদায়িক যে সৌন্দর্য দেখা গেছে, সেটিও উল্লেখযোগ্য। মেয়েদের এ জয়ের মাধ্যমে ফুটবলের সেই গৌরব ফিরিয়ে আনা অসম্ভব নয়। বিশ্বকাপকেন্দ্রিকতা থেকে বেরিয়ে এসে 'অবহেলিত' ফুটবল আরও গুরুত্ব পেলে মেয়েদের মতো আমাদের ছেলেদের টিমও ভালো কিছু উপহার দিতে পারবে বলে আমরা বিশ্বাস করি।
আমরা মনে করি, মেয়েদের জয়ের বার্তা বহুবিধ। খেলাধুলায় বিশেষ করে ফুটবলে মেয়েরা যে এগিয়ে আসছে, এটি শুধু তার লক্ষণই নয় বরং ঘরের বাইরেও সব ক্ষেত্রে নারীর অবদানেরও বহিঃপ্রকাশ। যারা নারীদের ঘরে আবদ্ধ থাকার ফতোয়া দিচ্ছে, তারও প্রতিবাদ। একই সঙ্গে আমরা দেখছি, সর্বত্র খেলার মাঠ কমছে। সেখানেও দৃষ্টি দেওয়ার বার্তাবহ। শুধু বিনোদনের মাধ্যম হিসেবেই নয়; আমরা মনে করি শারীরিক সুস্থতার জন্যও এ খেলাধুলার চর্চা অব্যাহত রাখা প্রয়োজন। সে জন্য গ্রাম-গঞ্জ-শহরে খেলার অনুশীলনের জন্য মাঠ বাড়ানো প্রয়োজন। কারণ, এর মাধ্যমেই জাতীয় পর্যায়ে খেলোয়াড়রা খেলার সুযোগ ও যোগ্যতা অর্জন করে। বর্তমানে ক্রিকেটের প্রাধান্য দেখা গেলেও একসময় ফুটবল নিয়েই বাঙালির উৎসাহ বেশি ছিল। বাংলাদেশের ফুটবলের গৌরবোজ্জ্বল যে অধ্যায় ছিল এবং মুক্তিযুদ্ধের সময়ও স্বাধীন বাংলা ফুটবল দল গৌরবের যে ইতিহাস তৈরি করেছিল, এবারের অনূর্ধ্ব-১৯ সাফ নারী চ্যাম্পিয়নশিপে শিরোপা জয় যেন আমাদের সে কথাও স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে।
বলাবাহুল্য, ক্রীড়া এখন আর নিছক খেলার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। এটি যেমন ভেদাভেদ ঘুচিয়ে মানুষকে ঐক্যবদ্ধ করেছে, তেমনি জাতীয় চেতনারও প্রতীক হয়ে উঠেছে। পাশাপাশি, বৈশ্বিক পরিমণ্ডলেও দেশকে উপস্থাপনের সুযোগ এনে দিয়েছে এ ক্রীড়া। আমরা জানি, বিশ্বে ফুটবল খেলুড়ে দেশের সংখ্যা অনেক বেশি। সে অর্থে পরিকল্পিতভাবে ফুটবল গুরুত্ব পেলে বিশ্বেও বাংলাদেশের গর্বের পরিচয় তুলে ধরতে সক্ষম হবে।
ফুটবল কিংবা ক্রিকেট- যে খেলাই হোক, দর্শক ও সমর্থকদেরও দায়িত্বশীল ভূমিকার বিষয়টিও আমরা স্মরণ করিয়ে দিতে চাই। বিজয়ের আনন্দে যেমন আমরা উদ্বেলিত হই, তেমনি পরাজয়েও যেন তাদের পাশে থাকি। মনে রাখতে হবে, ক্রীড়া দীর্ঘ অনুশীলন, ধৈর্য, মেধা আর অভিজ্ঞতার খেলা। এখানে রাতারাতি সাফল্য পাওয়া কষ্টকর। সেদিক থেকে ক্রিকেটের পাশাপাশি ফুটবলও যেন প্রশাসনের কাছে গুরুত্ব পায়। খেলোয়াড়দের প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম ও সুযোগ-সুবিধার বিষয়টি ভুলে গেলে চলবে না। অনূর্ধ্ব-১৯ সাফ নারী চ্যাম্পিয়নশিপে আমাদের শিরোপা ফুটবলের অতীত ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনার মাধ্যম হোক- এটাই প্রত্যাশা।