১৯৭১ সাল আমার কিশোরকাল। সপ্তম শ্রেণির ছাত্র। আবার ১৯৬৫ সাল পাকিস্তান-ভারত যুদ্ধের কাল; তাও ঘটেছে আমার শৈশবে বুদ্ধি ফোটার কালে। সেকালে রেডিওই ছিল মানুষের মধ্যে প্রধান বার্তাবাহক। একাত্তরের অগ্নিঝরা মার্চ মাসে অনেক প্রেরণাদায়ক গান রেডিওর বদৌলতে আমরা শুনতে পাই এবং অনুপ্রাণিত হই। ইতোমধ্যে দীর্ঘ আন্দোলন-সংগ্রাম, জেল-জুলুম ও আত্মত্যাগের মধ্য দিয়ে মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতা সংগ্রামের স্থপতি, মহান নেতা শেখ মুজিবুর রহমান বঙ্গবন্ধু হয়ে উঠেছেন। জাতির অবিসংবাদিত নেতা হয়ে বাঙালির মনে আসন পেতে বসেছেন।

আমার দেখা মুক্তিযুদ্ধ প্রসঙ্গে বলতে গিয়ে বীর শহীদদের পাশাপাশি মনে পড়ে সেকালের মুক্তিকামী শ্রমজীবী সাধারণ মানুষের কথা, যাদের আত্মত্যাগের মাধ্যমে মহান মুক্তিযুদ্ধের ভিত্তিভূমি রচিত হয়েছিল এবং তা আলোর মুখ দেখেছিল। আরও মনে পড়ে তৃণমূল পর্যায়ে মুক্তিযুদ্ধের সংগঠকদের কথা, যারা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে অকুতোভয় সৈনিক হয়ে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে জনমত গঠন করেছিলেন এবং সাধারণ মানুষকে মুক্তির আকুলতা ও সফলতার স্বপ্নে বিভোর করেছিলেন। মুক্তিযুদ্ধের সূচনালগ্ন থেকে জীবন বাজি রেখে তারা মাঠ-ঘাট, পথ-প্রান্তর, গ্রাম-গঞ্জ, শহর-বন্দরে নির্ভীক চিত্তে দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ হয়ে স্বদেশের হিত সাধন ও মাতৃভূমি রক্ষার জয়গান করেছেন। তরুণ প্রজন্মকে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণে প্রেরণা জুগিয়েছেন, এলাকায় মুক্তিযোদ্ধাদের আগমন-নির্গমন, মুক্তিযুদ্ধ সংগঠিত করার লক্ষ্যে মুক্তিযোদ্ধাদের সার্বিক সহায়তা প্রদান করেছেন। জীবন বিপন্ন করে তারা কাজটি করেছেন। অনেকে প্রাণ বিসর্জনও দিয়েছেন। প্রাণে বেঁচে গেলও অনেকে নিগৃহীত ও লাঞ্ছিত হয়েছেন। আবার অনেকে হয়তো পালিয়ে বেঁচেছেন। আমার স্মৃতিতে এমন ক'জন উজ্জ্বল। যোদ্ধাদের ওপর পাকিস্তানি সেনারা মুক্তিযুদ্ধের শুরুতে নির্বিচারে গুলি করে। তুলসীপাড়ার জনপ্রিয় তরুণ ফুটবলার ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্ভাবনাময় তুখোড় ছাত্র আব্দুল মান্নান শহীদ হন; অনেকে আহত। কাটাখালী ব্রিজে অথবা পরবর্তীকালে আরেকজন প্রতিভাবান ছাত্র আব্দুল লতিফকে পাকিস্তানি সেনারা হত্যা করে। ওই দু'জন মেধাবী ছাত্রের হত্যাকাণ্ডে এলাকায় শোকের ছায়া নেমে আসে এবং মুক্তিযুদ্ধের প্রতি মানুষ আগ্রহী হয়ে ওঠে। বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ, তাকে বন্দি করে পাকিস্তানের কারাগারে প্রেরণ, গণহত্যা, নরী নির্যাতন ও লুণ্ঠনের ঘটনায় মানুষ মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়তে দৃঢ়প্রত্যয়ী হয়ে ওঠে।

জামালুর রহমান প্রধান (এমপি) ও শাহ জাহাঙ্গীর কবির (এমপি) ইউনিয়ন পর্যায়ের নেতা হিসেবে আস্থাভাজন হন এবং পরবর্তীকালে তিনি তাদের ঘনিষ্ঠজন হয়ে উঠেছিলেন। ইতোমধ্যে মহিমাগঞ্জের তিন সমাজসেবী ও আওয়ামী লীগ নেতা মরহুম ইমাদ আকন্দ, আব্দুল কাদির সরকার ও সোবহান চেয়ারম্যানকে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ধরে এনে রাত্রিকালে শ্রীমুখ পেরিয়ে গাবগাছের সন্নিকটে নৃশংসভাবে হত্যা করে। এর কিছুকাল পরে আমাদের কোচাশহর এলাকার সাধারণ মানুষের প্রিয়ভাজন ও তৃণমূল পর্যায়ে মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক বাচ্চা সরদার চাচাকে রাত্রিকালে বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে যায় এবং নৃশংসভাবে হত্যা করে। এলাকায় ওই হত্যাকাণ্ড পাকিস্তানি সেনাদের বিরুদ্ধে মানুষের ক্ষোভ ও রোষের কারণ হয়। সম্ভবত জুলাই বা আগস্ট মাসে গোবিন্দগঞ্জ উপজেলার রাখালবুরুজ ইউনিয়নে ত্রিমোহনী ঘাটে মুক্তিযোদ্ধাদের অবস্থান জানতে পেরে হানাদার বাহিনী বালুয়া, নাকাইহাট ও বোনারপাড়ার দিক থেকে ত্রিমুখী আক্রমণ চালায়। ভোর ৬টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত তুমুল লড়াই চলে। বোমা বিস্ম্ফোরণ ও মেশিনগানের গুলির আওয়াজে এলাকা প্রকম্পিত হয়। গোলাবারুদ ফুরিয়ে যাওয়ায় মুক্তিযোদ্ধাদের পরাজয় ঘটে। ১১ মুক্তিযোদ্ধা শহীদ হন বলে জানা যায়। ওই লোমহর্ষক ঘটনার এক দিন পর আমার বাবা এলাকায় স্বচক্ষে যুদ্ধক্ষেত্র ও মুক্তিযোদ্ধাদের কবর দেখতে যান। ফিরে এসে গ্রামের লোকজনের কাছে দুঃখভারাক্রান্ত মনে ওই নির্মম ঘটনার বিবরণ দেন। মুক্তিযুদ্ধের ওই দিনগুলোতে রণাঙ্গনের খবরে অর্থাৎ বিভিন্ন অঞ্চল থেকে মুক্তিযুদ্ধের নানা ইতিবাচক খবর ভেসে আসত। তাতে আমরা আনন্দ ও প্রেরণা বোধ করতাম। ওই সময় আমার বাবা বেশ কিছুদিন দুর্গম এলাকায় আত্মগোপনে থাকলেও আমরা পরিবারের সদস্যরা আত্মীয়স্বজনের বাড়িতে বেশি দিন থাকতে অধৈর্য হয়ে পড়ি এবং জীবনের ঝুঁকি নিয়ে বাড়ি ফিরে আসি। আত্মীয়-পরিজন কেউ কেউ তাদের বাড়িতে আমাদের উপস্থিতিতে বিরক্তি বোধ করেন এবং নিজেদের বিপদের কারণ মনে করেন, তা বুঝতে পারি। এমনি দুর্বিষহ পরিবেশে অনেকটা প্রাণ হাতে করে বাড়ি ফিরলেও সদা হানাদার বাহিনীর আক্রমণের আশঙ্কায় জীবন ওষ্ঠাগত হয়ে ওঠে। কতবার যে রাজাকার বা হানাদার বাহিনী এলো- এমন গুজবে বাড়ি থেকে বহুবার পালিয়েছি। স্থানীয় রাজাকাররা আমার বাবাকে ধরে নিয়ে গিয়েছিল। তবে রাজাকারদের সংখ্যা অল্প হওয়ায় শান্তি কমিটির নেতারা কিছুটা ভড়কে গেলেও আমার বাবাকে তারা দেশদ্রোহী আখ্যায়িত করে এবং তারাগনায় মুক্তিযোদ্ধাদের আগমন ও সেখানে মুক্তাঞ্চল ঘোষণার বিষয়ে তাকে মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে যোগসাজশকারী, ষড়যন্ত্রকারী বলে অভিযুক্ত করে। তখন শান্তি কমিটির নেতাদের অনুনয়-বিনয়, যুক্তি-তর্ক ও বাদানুবাদে শ্বাসরুদ্ধকর পরিবেশে সারাদিন শেষে সন্ধ্যায় ১২৫ টাকা ফাইন দিয়ে এবং মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে আর যোগসাজশ ও ষড়যন্ত্র করবেন না মর্মে অঙ্গীকারনামা দিয়ে আমার বাবা মুক্ত হন। বিজয়ের সুবর্ণজয়ন্তীতে বিনয়াবনত চিত্তে স্মরণ করি আমার বাবাসহ তৃণমূল পর্যায়ের মুক্তিযুদ্ধের সংগঠকদের, যাদের আত্মত্যাগে মুক্তিযুদ্ধ সফল পরিণতি লাভ করেছিল। তাদের কোনো স্বীকৃতি মেলেনি। তাদের কোনো তালিকাও হয়নি। তারা আছেন মানুষের মুখে-মুখে। তবে কালের যাত্রায় আর কিছুদিন পর তারা হয়তো বিস্মৃত হয়ে যাবেন, তাদের স্মরণ করার মানুষ হারিয়ে গেলে। মুক্তিযুদ্ধের ওই সংগঠকদের উপজেলাওয়ারি একটি তালিকা করা যায় কিনা সে বিষয়ে নীতিনির্ধারকদের ভেবে দেখতে অনুরোধ জানাই।

ড. মো. মোস্তাফিজার রহমান: সাবেক অধ্যক্ষ, নওগাঁ সরকারি কলেজ