বুধবার কক্সবাজারের সৈকত লাবনী পয়েন্ট থেকে স্বামী-সন্তানকে তিন দুর্বৃত্ত জিম্মি করে এক নারীকে তুলে নিয়ে দুই দফায় সংঘবদ্ধ ধর্ষণ ও আটকে রাখার ঘটনা আমাদের ক্ষুব্ধ ও উদ্বিগ্ন না করে পারে না। শুক্রবার সমকালে প্রকাশিত শীর্ষ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পর্যটক ধর্ষণে অভিযুক্তরা কক্সবাজার দাপিয়ে বেড়ায়। র‌্যাব এই মামলার পাঁচ আসামির মধ্যে তিনজনকে সিসিটিভি ফুটেজ দেখে শনাক্তও করেছে। কক্সবাজার সদর মডেল থানায় ওই নারীর স্বামীর করা মামলার প্রধান আসামি পুলিশের তালিকাভুক্ত সন্ত্রাসী আশিকুল ইসলাম আশিকের বিরুদ্ধে রয়েছে ১৬টি মামলা। আসামিদের সঙ্গে স্থানীয় রাজনৈতিক প্রভাবশালীদের সখ্যের তথ্যও উঠে এসেছে ওই প্রতিবেদনে। আশিকের নেতৃত্বে সন্ত্রাসী চক্রের সদস্যরা পর্যটন শহরটিতে যেভাবে ছিনতাই, চাঁদাবাজিসহ নানা দুস্কর্ম চালিয়ে গেছে, তা বিস্ময়কর।

আমরা জানি, কক্সবাজারের বিশ্বের দীর্ঘতম সমুদ্রসৈকত, সেন্টমার্টিন, মহেশখালীসহ আরও কিছু এলাকা আকর্ষণীয় পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে দেশ-বিদেশে খ্যাত। কিন্তু আমরা দেখছি, কক্সবাজার তো বটেই, দেশের অন্য পর্যটনকেন্দ্রেও পর্যটকরা নিরাপত্তাহীনতায় ভোগেন। কক্সবাজারে সংঘটিত বর্বরোচিত ঘটনাটি পর্যটকদের কাছে যে বার্তা দিল, তা শুধু পর্যটনের ক্ষেত্রেই নয়, আরও নানা দিকে এর বিরূপ অভিঘাত লাগবে। ২২ ডিসেম্বর সমকালের একটি প্রতিবেদনেই বলা হয়েছে, পর্যটক বিশেষ করে বিদেশিদের টানতে থাইল্যান্ড-সিঙ্গাপুরের আদলে কক্সবাজারের পর্যটনকেন্দ্রগুলো গড়ে তোলার উদ্যোগ নিয়েছে সরকারের সংশ্নিষ্ট বিভাগ। আমরা জানি, বিশ্বের অনেক দেশেই পর্যটন খাত জাতীয় অর্থনীতিতে উল্লেখযোগ্য অবদান রাখছে। আমাদের দেশে বিভিন্ন অঞ্চলের পর্যটনের অপার সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় তা কাজে লাগাতে পারছি না। বস্তুত সর্বাগ্রে নিরাপত্তা যদি নিশ্চিত করা না যায়, তাহলে এ ক্ষেত্রে গৃহীত কোনো পরিকল্পনাই সুফল বয়ে আনবে না। আমরা জানতে চাই, দেশের অন্যতম পর্যটনকেন্দ্র কক্সবাজারে সন্ত্রাসী চক্রের এত উন্মত্ততার খবর জানা সত্ত্বেও প্রশাসন কেন দুর্বৃত্ত-সন্ত্রাসীদের মূলোৎপাটন করতে পারছে না?

আমরা দেখছি, ধর্ষণ প্রতিরোধে সাম্প্রতিক কিছু ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে সরকার চূড়ান্ত দণ্ডের বিধান রেখে আইন করলেও ধর্ষণ, সংঘবদ্ধ ধর্ষণের রাশ টানা যাচ্ছে না। আমরা এ-ও দেখছি, অনেক ক্ষেত্রে উল্টো ভিকটিম আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হেনস্তার শিকার হন। এসব কারণে কোনো কোনো ভুক্তভোগী আইনের আশ্রয় নিতে অনাগ্রহী। ভিকটিম ব্লেমিংয়ের মতো দায়িত্বশীলদের দায়িত্বহীন কর্মকাণ্ডে দুস্কর্মকারীরা আশকারা পায় বলেও আমরা মনে করি। তা ছাড়া বিচার প্রক্রিয়ায় ধাপে ধাপে অসংগতি, সমন্বয়হীনতাও ন্যায়বিচার পাওয়ার ক্ষেত্রে অন্তরায় হয়ে দাঁড়ায়। সমকালসহ অন্য সংবাদমাধ্যমে কক্সবাজারের ঘটনায় অভিযুক্ত মূল হোতাদের রাজনৈতিকভাবে প্রশ্রয়ের যে অভিযোগ উঠেছে, এমন পরিস্থিতি সারাদেশেই কমবেশি বিদ্যমান। আমরা আশা করব, কক্সবাজারের ঘটনায় দ্রুত আসামিদের গ্রেপ্তার করে দৃষ্টান্তযোগ্য বিচারের ব্যবস্থা নিশ্চিত করা হবে। নির্যাতিত নারীর পরিচয় কিংবা সামাজিক অবস্থান যা-ই হোক, এটা বিবেচ্য নয়। মূল কথা হলো, অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে নির্মোহ অবস্থান নিশ্চিত করতেই হবে। দূর করতে হবে ন্যায়বিচারের পথে অন্তরায় বিদ্যমান সব প্রতিবন্ধকতাও।

আমরা এ-ও মনে করি, এ নিয়ে ধূম্রজাল সৃষ্টির যে প্রবণতা সংবাদমাধ্যমে উঠে এসেছে, তা অনাকাঙ্ক্ষিত। আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা ও ন্যায়বিচারের অপরিহার্য প্রয়োজনে অপরাধকে অপরাধ হিসেবেই দেখতে হবে। নির্যাতনের শিকার ব্যক্তির পেশা ও শ্রেণি এ ক্ষেত্রে বিবেচ্য হতে পারে না। দুর্বৃত্ত, সমাজবিরোধীদের যারা নানাভাবে পৃষ্ঠপোষকতা দিয়েছেন, তাদেরও আইনের আওতায় আনা প্রয়োজন। কক্সবাজারের মতো সম্ভাবনাময় অঞ্চল কেন দুর্বৃত্তদের চারণভূমি হয়ে উঠেছে, এর কারণ অনুসন্ধানক্রমে যথাযথ প্রতিকারে দৃষ্টি দিতে হবে উৎসে। আমরা চাইব, বিলম্বে হলেও কক্সবাজার থেকেই কাজটা শুরু হোক।