ঢাকা সোমবার, ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৪

মিয়ানমারের গৃহযুদ্ধে হস্তক্ষেপ করছে না চীন

প্রতিবেশী

মিয়ানমারের গৃহযুদ্ধে হস্তক্ষেপ করছে না চীন

.

নিয়ান পেংগ

প্রকাশ: ০৫ ডিসেম্বর ২০২৩ | ২২:৪৬

অক্টোবরের শেষদিকে তিন বিপ্লবী গোষ্ঠী বা ত্রয়ী ভ্রাতৃত্ব জোট সামরিক জান্তার বিরুদ্ধে ‘অপারেশন ১০২৭’ পরিচালনা করেছিল। মাত্র কয়েক সপ্তাহের মধ্যে তারা শত শত নিরাপত্তা বলয় ও সরকার নিয়ন্ত্রিত উত্তরাঞ্চলের তিনটি এলাকা সফলভাবে দখল করে নেয়। এ ছাড়া ‘মিয়ানমার জাতীয় গণতান্ত্রিক সামরিক জোট’ চীন সীমান্ত থেকে মাত্র পাঁচ কিলোমিটার দূরত্বের একটি শহরও ঘিরে ফেলে। 

সম্প্রতি এ সংঘর্ষ মিয়ানমারের উত্তরাঞ্চলের অধিবাসীদের উদ্বেগকে আরও তীব্র করে তুলেছে। কৌশলগত কারণে তারা বিশেষত শান রাজ্যের মান্দারিয়ানভাষীদের কোকাং অঞ্চলের ওপর গুরুত্ব দিয়েছিল। ২০০৯ সালে মিয়ানমারের সামরিক বাহিনী ক্ষমতা দখল করার আগ পর্যন্ত ‘গণতান্ত্রিক সামরিক জোট’ কোকাং অঞ্চলের নিয়ন্ত্রণে ছিল। ২০১৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে গণতান্ত্রিক সামরিক জোট অঞ্চলটি পুনরুদ্ধারের লক্ষ্যে ব্যর্থ এক হামলা চালায়। বর্তমান সংঘাতের প্রেক্ষাপট সেখান থেকেই তৈরি হয়।

সৈন্য সংখ্যা, মারণাস্ত্র ও অন্যান্য যন্ত্রে সামরিক জান্তা যতই এগিয়ে থাকুক; বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে লড়তে গিয়ে তাদের অনেক ক্ষয়ক্ষতির মুখোমুখি হতে হয়েছে। মহামারি এবং দেশব্যাপী জান্তাবিরোধী আন্দোলনের কারণে অর্থনৈতিক অবনতি, বিশেষত গণপ্রতিরক্ষা বাহিনীর বিপ্লবী কর্মকাণ্ডের কারণে সামরিক জান্তা যে অবস্থায় পড়েছে, তাতে খুব শিগগিরই বড় আকারের পাল্টা হামলা তারা করতে পারবে না। যাই হোক, আকাশপথে হামলা চলছে। সব মিলিয়ে আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যে মিয়ানমারের উত্তরাঞ্চলের সংঘর্ষের সমাপ্তি ঘটার সম্ভাবনা খুবই কম। 

এদিকে সংঘর্ষের কবলে পড়ে বহু বাস্তুহারা মানুষ চীনের ইউনান সীমান্তের দিকে পাড়ি জমাচ্ছে। এ পরিস্থিতি ইউনান অঞ্চলের স্থানীয় লোকদের জীবনযাপন ও আর্থিক অবস্থা দুরূহ করে তুলেছে। উল্লেখ্য, ২০১৫ সালে গণতান্ত্রিক সামরিক জোটের সঙ্গে মিয়ানমার সামরিক বাহিনীর সংঘর্ষে বিমান হামলায় তিন চীনা নাগরিক নিহত হয়। এ জন্য চীন অবশ্যই মিয়ানমারের উত্তরাঞ্চলের চলমান সংঘর্ষের ওপর খুব কাছ থেকে নজর রাখবে। তা ছাড়া চীন বিমান হামলা মোকাবিলা ও তাদের ক্ষয়ক্ষতি হ্রাস করতে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করবে। 

নভেম্বরের ২৫ তারিখ চীনের গণমুক্তি বাহিনী মিয়ানমার সীমান্তে বাস্তব সামরিক মহড়া শুরু করার ঘোষণা দেয়। প্রশিক্ষণের ক্ষেত্রে তারা যুদ্ধকবলিত অঞ্চলে সংঘর্ষের সক্ষমতা, যেমন দ্রুত জায়গা পরিবর্তন, সীমান্ত এলাকা বন্ধ ও নিয়ন্ত্রণ, গোলাগুলির ওপর গুরুত্ব দেয়। এসব সামরিক প্রস্তুতির উদ্দেশ্য জরুরি পরিস্থিতিতে জাতীয় সার্বভৌমত্ব রক্ষা, সীমান্ত এলাকা স্থিতিশীল রাখা ও জনসাধারণের জীবন ও সম্পদ নিরাপদ রাখা। 

চীনের সামরিক প্রস্তুতি পশ্চিমা বিশ্বের বিশেষ নজর কেড়েছে। তাদের দাবি, চীন মিয়ানমারের সামরিক জান্তাবিরোধী তিনটি বিপ্লবী গোষ্ঠীকে সহযোগিতা করছে। এ ধরনের প্রচারণার উদ্দেশ্য মিয়ানমারে চীনবিরোধী মনোভাব সৃষ্টি করা এবং চীন-মিয়ানমার সম্পর্কের মধ্যে অন্তর্ঘাত চালানো। এ ধরনের অনুমানের কোনো সত্যতা নেই। চীন মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ বিষয়াদিতে জড়িত না-হওয়ার নীতি নিয়েছে। এ ছাড়া জাতিগত সংখ্যালঘুদের ওপর সামরিক হামলা নিয়ে কখনও মধ্যস্থতা করেনি। বরং তারা দুই গোষ্ঠীর মধ্যে শান্তিপূর্ণ আলোচনা ও মিয়ানমারের বাস্তুহারাদের মানবিক সহযোগিতা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। 

সামরিক প্রশিক্ষণ ও মহড়ার উদ্দেশ্য সামরিক জান্তা ও সশস্ত্র নৃগোষ্ঠীগুলোর মধ্যে বাড়তে থাকা উদ্বেগ কমানোয় উভয়কে উৎসাহিত করা। এ উদ্যোগ ক্রমবর্ধমান সংঘর্ষের সময় সীমান্ত রক্ষায়, বিশেষত চিন জাতিগোষ্ঠীর নিরাপত্তা যখন হুমকির মুখোমুখি, তখন সীমান্তের ওপারে বিমান হামলা বা বোমাবর্ষণ মোকাবিলার বাস্তব প্রস্তুতি হিসেবে ভূমিকা রেখেছে। 

চীন সরকার যৌথভাবে টেলিকম জালিয়াতি প্রতিরোধে সশস্ত্র নৃগোষ্ঠীগুলোর পরিবর্তে সামরিক জান্তার সঙ্গে সহযোগিতা করেছে। সুতরাং, চীন টেলিকম জালিয়তিকাণ্ডে সশস্ত্র নৃগোষ্ঠীদের সহযোগিতা করছে– এ বক্তব্য সত্য নয়। যদিও চীন তাদের প্রচেষ্টায় কোনো ধরনের বাধা দিচ্ছে না। বেইজিংয়ের কাছে এটি স্পষ্ট যে, সশস্ত্র নৃগোষ্ঠীগুলোর প্রকৃত উদ্দেশ্য হারানো অঞ্চল পুনরুদ্ধার। 

সর্বশেষ, মিয়ানমারের গৃহযুদ্ধে মধ্যস্থতা করাকে চীন অলাভজনক মনে করে। তা ছাড়া এ হস্তক্ষেপ বিনিয়োগ ও বাণিজ্যিক সম্পর্ক এবং মিয়ানমারের সঙ্গে আন্তরিক সম্পর্ককে অবনতির দিকে ঠেলে দিতে পারে। বস্তুত, অক্টোবরে সংঘর্ষ বাধার পর থেকে লাশিউ থেকে মিউস ও কিংগশুই নদী পর্যন্ত প্রধান দুটি পথে যোগাযোগ সম্পূর্ণভাবে বিচ্ছিন্ন রয়েছে। তা ছাড়া নভেম্বরের ২৩ তারিখ চীন-মিয়ানমার সীমান্তে দৈনন্দিন প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র বহনকারী ১২০ কার্গো ট্রাক ড্রোন হামলায় ধ্বংস করে দেওয়া হয়েছিল। ইউনান থেকে মিয়ানমারের উত্তরাঞ্চলজুড়ে দুই দেশের মধ্যকার বাণিজ্যিক লেনদেনের অর্ধেকটা হয়ে থাকে। যদি মিয়ানমারের গৃহযুদ্ধের কারণে সীমান্তের বাণিজ্যিক লেনদেন বন্ধ হয়ে যায়, তাহলে উভয় পক্ষই বিপুল পরিমাণ আর্থিক ক্ষতির মুখোমুখি হবে। 

এসব সত্ত্বেও এটি গুরুত্বপূর্ণ যে, বেইজিংয়ের বিরুদ্ধে সামরিক জান্তাবিরোধী বিপ্লবী শক্তিগুলোকে সমর্থন দেওয়ার অভিযোগ তুলে গত মাসে সামরিক জান্তাপন্থি কিছু গোষ্ঠী চীনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ মিছিল করেছে। মিয়ানমারে চীনবিরোধী মনোভাব গড়ে উঠলে চীন তাদের কৌশলগত ও অর্থনৈতিক উভয় দিক থেকে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে বলে চিন্তিত। এ কারণে চীনের লক্ষ্য মিয়ানমারে চীনবিরোধী মনোভাব শান্ত করতে সে দেশের গৃহযুদ্ধে হস্তক্ষেপ না করা। 

পরিশেষে, মিয়ানমারের উত্তরাঞ্চলে নৃগোষ্ঠীদের চলমান সংঘর্ষে চীন সুবিধার বদলে বরং অসুবিধাতেই পড়বে। চীন আশা করে, মিয়ানমারের সামরিক জান্তা ও সশস্ত্র নৃগোষ্ঠীগুলোর মধ্যে যুদ্ধবিরতি চুক্তি হোক। একই সঙ্গে সীমান্তে শান্তি ও স্থিরতা বিরাজ করুক। 

নিয়ান পেংগ: হংকং রিসার্চ সেন্টার ফর এশিয়ান স্টাডিজ-এর পরিচালক; দ্য ডিপ্লোম্যাট থেকে ভাষান্তর ইফতেখারুল ইসলাম 

আরও পড়ুন

×