ঢাকা সোমবার, ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৪

নির্বাচনী ট্রেনের কিছু কোচ কিন্তু এখনও খালি

রাজনীতি

নির্বাচনী ট্রেনের কিছু কোচ কিন্তু এখনও খালি

.

এম এ আজিজ

প্রকাশ: ০৫ ডিসেম্বর ২০২৩ | ২২:৪৭

দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনী ট্রেন প্রথম শ্রেণির অনেক যাত্রীবিহীন কোচ নিয়ে যাত্রা শুরু করেছে। অবশ্য দ্বিতীয় ও তৃতীয় শ্রেণির কোচে উপচে পড়া ভিড়। যেহেতু এই ট্রেনটি আর থামার সুযোগ নেই, তাই খালি কোচগুলো থেকে কোনো রাজস্ব পাওয়ার সম্ভাবনাও নেই। অর্থাৎ বিএনপি যেহেতু তার সঙ্গী দলগুলোসহ এই নির্বাচনী ট্রেনে যাত্রী হয়নি, তাই এই নির্বাচনও অংশগ্রহণমূলক হওয়ার সম্ভাবনা নেই। তবে সংবিধান নতুন করে নির্বাচনী ট্রেন ছাড়ার সুযোগ রেখেছে। যেমন– সংবিধানের ১২৩(খ) অনুচ্ছেদে সংসদ সদস্যদের সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হইবে: ‘মেয়াদ-অবসান ব্যতীত অন্য কোন কারণে সংসদ ভাঙ্গিয়া যাইবার ক্ষেত্রে ভাঙ্গিয়া যাইবার পরবর্তী নব্বই দিনের মধ্যে।’ অর্থাৎ সরকার চাইলে সংবিধানের উল্লিখিত অনুচ্ছেদ অনুসরণ করে যথেষ্ট সময় নিয়ে বিরোধী দলগুলোর সঙ্গে সমঝোতা করে একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও অংশগ্রহণমূলক জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আয়োজন করতে পারে। কিন্তু সরকারি দল তার প্রতিদ্বন্দ্বী দলগুলোর জন্য ‘লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড’ সংকুচিত করে মিত্রদের নিয়ে একটি একপক্ষীয় নির্বাচনের প্রস্তুতি প্রায় শেষ করেছে। অন্যদিকে বিরোধী দল বিএনপি ও তার সঙ্গী দলগুলো এই নির্বাচনী তপশিল প্রত্যাখ্যান করে সরকারের পদত্যাগ দাবিতে বিরতি দিয়ে হরতাল-অবরোধ ডাকছে।
সরকার মনে করে, জনগণ বা ভোটার অংশগ্রহণ করলেই নির্বাচন অংশগ্রহণমূলক হবে। কিন্তু আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে, যে নির্বাচনে সর্বোচ্চসংখ্যক রাজনৈতিক দল অংশগ্রহণ করে এবং যে রাজনৈতিক দলগুলোর অনেক ভোটার রয়েছে ও তাদের মধ্য থেকে যে কোনো দলের জয়ের সম্ভাবনা থাকে, সেই দলগুলো যদি স্বাধীনভাবে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে পারে, তাহলে তাকেই অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন বলা যাবে।

যাহোক, বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরসহ কেন্দ্র থেকে গ্রাম পর্যায়ে শত শত নেতাকর্মীকে গ্রেপ্তার করে দলটিকে নেতৃত্বশূন্য এবং নির্বাচনে সংসদ সদস্য প্রার্থীশূন্য করা হয়েছে। সেই সঙ্গে পুরোনো মামলায় মৃত ও গুম হওয়া ব্যক্তিসহ বিএনপি নেতাকর্মীকে অতিদ্রুত কারাদণ্ড দেওয়া চলমান, যাতে তারা কারাগারে থেকেও সংসদ নির্বাচনে প্রার্থী বা ভোটকেন্দ্রে দলের এজেন্ট হতে না পারেন।
আবার বিরোধী দলের আন্দোলন দমনে সরকারি দল আওয়ামী লীগের শীর্ষ পর্যায় থেকে তাদের ভাষায় ‘বিএনপি-জামায়াত সন্ত্রাসীদের’ পুলিশে ধরিয়ে দিতে দলটির নেতাকর্মীকে নির্দেশ দিয়েছে। তাই যুবলীগ-ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা বিএনপি ও জামায়াতের নেতাকর্মীকে পুলিশের কাছে তুলে দিচ্ছে। 

শুধু তাই নয়, যদি বাঞ্ছিত বিএনপি ও জামায়াত নেতা বা কর্মীকে না পাওয়া যায় তাহলে পুলিশ তাঁর আপনজন কাউকে তুলে নিয়ে যাচ্ছে। আবার সাদা মাইক্রোবাসে বিএনপি কর্মীদের তুলে নিয়ে হত্যা করে ড্রেনে ফেলে দেওয়া হচ্ছে (সমকাল, ৬ নভেম্বর ২০২৩)।

যেহেতু শহর থেকে গ্রাম পর্যন্ত প্রায় প্রতিটি পরিবারেই আওয়ামী লীগ, বিএনপি অথবা জামায়াতের সদস্য বা সর্মথক রয়েছে এবং তারা একে অপরকে চেনে, তাই বিএনপি ও জামায়াত নেতাকর্মী গ্রেপ্তার এড়াতে ঘরবাড়ি ছেড়ে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে ছিটিয়ে গা-ঢাকা দিয়েছে। তাদের অনেকেই ঢাকা শহরেও মোটরবাইক বা রিকশা চালাচ্ছে। কেউ কেউ রিকশা-ভ্যানে নানা ধরনের পণ্য বিক্রি এবং হকার বা ফেরিওয়ালা হিসেবে কাজ করছে।

জাতীয় নির্বাচন ঘিরে সৃষ্ট সংকট নিরসনে বিশ্বের গণতান্ত্রিক হিসেবে খ্যাত প্রায় সব দেশসহ নিজেদের দেশের বেশির ভাগ রাজনৈতিক দল ও নাগরিক সমাজ সংলাপের মাধ্যমে সমঝোতা করে একটি অবাধ, সুষ্ঠু, অংশগ্রহণমূলক ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচন প্রত্যাশা করেছিল। কিন্তু তা নিষ্ফল।

প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) কাজী হাবিবুল আউয়াল গত ২৮ নভেম্বর বলেছেন, ‘গণতন্ত্রকে বাঁচিয়ে রাখতে নির্বাচনকে বাঁচিয়ে রাখতে হবে। আমাদের নির্বাচনে কিন্তু বাইরে থেকেও থাবা, হাত এসে পড়েছে। দেশের অর্থনীতি, ভবিষ্যৎসহ অনেক কিছু রক্ষা করতে হলে আগামী জাতীয় নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য করতে হবে।’ তাঁর এই বক্তব্যে মনে হয়, তিনি আগেই জানতেন, ‘মার্কিন শ্রমনীতির লক্ষ্যবস্তু বাংলাদেশ।’

উল্লেখ্য, গত ২০ নভেম্বর এক চিঠিতে যুক্তরাষ্ট্রের বাংলাদেশ মিশন থেকে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়কে শ্রম ইস্যুতে সম্ভাব্য মার্কিন নিষেধাজ্ঞা নিয়ে সতর্ক করা হয়েছে। যদিও মার্কিন শ্রমনীতি বিশ্বের সব দেশের ওপরেই প্রযোজ্য, তবু বিশ্বাস করার যথেষ্ট কারণ রয়েছে যে, এর অন্যতম লক্ষ্য হতে পারে বাংলাদেশ।

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশের বড় ধরনের বাণিজ্য, বিনিয়োগ, প্রবাসী আয়সহ অনেক ধরনের সম্পর্কের পাশাপাশি ‘নিরাপত্তা সহযোগিতা’ আছে, যা মার্কিন জাতীয় স্বার্থের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট। এ ছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় সব মিত্র রাষ্ট্রের সঙ্গেও বাংলাদেশের অনেক ধরনের সম্পর্ক আছে। তা ছাড়া রয়েছে ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চল ঘিরে ভূরাজনীতি।

ইতোমধ্যে প্রধানমন্ত্রী গণভবনে আওয়ামী লীগের ২৯৮ জন প্রার্থীর তালিকা ঘোষণার পর মনোনয়নবঞ্চিতদের সভায় দলীয় প্রার্থীদের একজন করে ডামি প্রার্থী রাখার নির্দেশ দিয়েছিলেন। তিনি বলেছিলেন, বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হলে তাঁর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। স্বতন্ত্র প্রার্থী হতে বাধা নেই ইঙ্গিত করে আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদকের বক্তব্যের পর মনোনয়নবঞ্চিত এমপিরাসহ আওয়ামী লীগের বহু নেতা ডামি ও স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়েছেন। আবার আওয়ামী লীগ তার ২৯৮ আসনের মধ্য থেকে জাতীয় পার্টি, তৃণমূল বিএনপিসহ সঙ্গী দলগুলোকে কিছু আসন ছেড়ে দিলে আওয়ামী লীগের আসন সংখ্যা কমে যাওয়ায় দলটি থেকে আরও অনেকেই বিদ্রোহী প্রার্থী হতে পারেন।

এসব জটিল সমীকরণে কীভাবে নির্বাচনী সমঝোতা তৈরি হবে ও সংঘাত-সহিংসতা এড়িয়ে কীভাবে নির্বাচন হবে এবং বিএনপি ও তার মিত্রদের নির্বাচনের বাইরে রেখে, তাদের নেতাকর্মীকে গ্রেপ্তার করে, জেল দিয়ে ও ঘরছাড়া করে কীভাবে অবাধ, সুষ্ঠু ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন হবে, সেটাই দেখার জন্য অপেক্ষা করতে হবে।

এম এ আজিজ: জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক ও কলাম লেখক

আরও পড়ুন

×