ঢাকা সোমবার, ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৪

সামরিক শাসন গেছে কিন্তু গণতান্ত্রিক মুক্তি এসেছে কি?

ফিরে দেখা

সামরিক শাসন গেছে কিন্তু গণতান্ত্রিক মুক্তি এসেছে কি?

মুশতাক হোসেন

মুশতাক হোসেন

প্রকাশ: ০৫ ডিসেম্বর ২০২৩ | ২২:৫৬

১৯৯০ সালের ৬ ডিসেম্বর আমাদের দীর্ঘ আন্দোলনের এক সফল পরিসমাপ্তি ঘটেছিল। সে জন্য দিবসটি স্বৈরাচার পতন ও গণতন্ত্র মুক্তি দিবস হিসেবে পালন করা হয়। এদিন সামরিক স্বৈরাচার এরশাদ সরকার জনগণের দাবির কাছে মাথা নত করতে বাধ্য হয়। নানা ছলে-বলে-কৌশলে এরশাদ ক্ষমতা দীর্ঘায়িত করার চেষ্টা করেছিলেন। তাঁর বিরুদ্ধে প্রধান অভিযোগ ছিল নির্বাচন পদ্ধতি কলুষিত করার। এর আগে সামরিক শাসক জিয়াউর রহমান যেমনটা করেছিলেন; এরশাদও একইভাবে ক্ষমতায় থেকে দল গঠন ও পাতানো নির্বাচন করেছেন। 

গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের মাধ্যমে সরকার পরিবর্তন হবে; জনগণের ভোটে নির্বাচিত রাজনৈতিক দল সরকার গঠন করবে; এটা ছিল আমাদের প্রত্যাশা। গণতান্ত্রিক কাঁটা অপসারণ ছিল আমাদের দাবি। কিন্তু দেখা গেল, সামরিক শাসনের বদলে রাজনৈতিক দলগুলো পালাক্রমে ক্ষমতায় এসেছে; কিন্তু রাজনৈতিক দলগুলোর ব্যর্থতার মাঝখানে স্বল্প সময়ের জন্য হলেও সামরিক সরকার সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার এসেছিল। এখনও আমরা ওই জায়গায়ই রয়ে গেছি। অর্থাৎ কীভাবে শান্তিপূর্ণ উপায়ে জনগণের ভোটে সরকার পরিবর্তন হবে, সেই ভোটের পদ্ধতিটাই আবার বিতর্কিত হয়ে গেছে। 
সামরিক সরকারের আমলে যেমন পাতানো ভোট, সাজানো নির্বাচন এবং নির্বাচন পদ্ধতি নিয়ে আন্দোলন, হরতাল, বিক্ষোভ কিংবা নির্বাচন বর্জনের ঘটনা ঘটেছিল; সেগুলোই এখন আমরা আবার দেখছি। অথচ এখন জনসমর্থিত রাজনৈতিক দল ক্ষমতায়। আবার জনসমর্থিত রাজনৈতিক দল রয়েছে বিরোধী দলেও। তারপরও আমরা গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে সরকার পরিবর্তনের জায়গায় একমত হতে পারছি না। গণতন্ত্রের পথে নতুন নতুন বাধা তৈরি হয়েছে। এইচএম এরশাদ কিংবা জিয়াউর রহমানের সময় বাধা হিসেবে আর্থসামাজিক ও রাজনৈতিক কাঠামোর পরিবর্তন দরকার ছিল। রাজনৈতিক দলের সরকারের আমলেও বাধা দূর হয়নি। কেবল বর্তমান সরকার নয়; দুই দলই পালাক্রমে ক্ষমতায় আসছে। তারা নিপীড়ন এবং গণতন্ত্র হরণকারী যন্ত্রকে নিজেদের ক্ষমতা দীর্ঘায়িত করার জন্য কাজে লাগাচ্ছে। কর্তৃত্বপরায়ণতা এখন আরও শক্তভাবে গেড়ে বসেছে। এই সমস্যার সমাধান শান্তিপূর্ণভাবে হওয়া উচিত। 

সামরিক সরকারের বিরুদ্ধে যেমন গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে সে সরকারকে পরাজিত করে দাবি আদায় করতে হয়েছে; আমি মনে করি, একটি গণসমর্থিত রাজনৈতিক দলের শাসন, সেটা কর্তৃত্ববাদী হোক বা যেটাই হোক, তার বিরুদ্ধে গণঅভ্যুত্থান নিঃসন্দেহে সঠিক পথ নয়। জনগণ যাতে সে পথে যেতে বাধ্য না হয়; তাতে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা আরও ক্ষতিগ্রস্ত হবে। এতে জনগণ রাজনৈতিক ব্যবস্থার প্রতি বীতশ্রদ্ধ হতে পারে এবং গণঅভ্যুত্থানকে পর্দার আড়ালের স্বৈরশক্তি কাজে লাগাতে পারে, যা বিভিন্ন আরব দেশে আমরা দেখেছি। সেখানে আরব বসন্ত ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করে আরও খারাপ অবস্থা সৃষ্টি হয়েছে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার জন্য। এ ধরনের চোরাবালিতে বাংলাদেশ পড়বে না– তেমনটা বলা যায় না। 

এইচএম এরশাদ ক্ষমতা দখলের পর থেকেই আমরা আন্দোলন শুরু করি। ১৯৮৩ সালে আমরা ছাত্রসমাজ এ আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকা রাখি। ছাত্রসমাজের ঐক্যবদ্ধ হওয়াটাই ওই সময় রাজনৈতিক আন্দোলনের ঐক্য আনতে ভূমিকা রেখেছিল। আমাদের কর্মসূচিতে হাজার হাজার মানুষ জীবনের মায়া ত্যাগ করে রাজপথে নেমে আসে। শুধু রাজনৈতিক দলের কর্মী নয়; সমগ্র ছাত্রসমাজ, বিভিন্ন পেশাজীবী এমনকি সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরাও শেষ পর্যায়ে এসে আন্দোলনে নামেন এবং অসহযোগ শুরু করেন। ১৯৯০ সালের ২৭ নভেম্বর এইচএম এরশাদের স্বৈরশাসনবিরোধী আন্দোলনের উত্তাল মুহূর্তে আন্দোলনের সংগঠক ও বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশনের যুগ্ম মহাসচিব ডা. শামসুল আলম খান মিলন সন্ত্রাসীদের গুলিতে নিহত হয়েছিলেন। ডা. মিলনের মৃত্যুর পর পুরো শহরের মানুষ সঙ্গে সঙ্গে বিদ্যুৎ গতিতে রাস্তায় নেমে পড়ে। তারা ঢাকা মেডিকেল কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়, প্রেস ক্লাবে সমবেত হয়। ঢাকা মেডিকেল কলেজ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সব শিক্ষক পদত্যাগ ঘোষণা করেন। এক কথায় পুরো প্রশাসনযন্ত্র অচল হয়ে যায়। 

সামরিক সরকার চেয়েছিল, মিলন হত্যার দায় ছাত্রসমাজের ঘাড়ে চাপিয়ে দিয়ে নতুন করে নিপীড়ন করবে। তারা কারফিউ বা জরুরি অবস্থা জারি করে। কিন্তু সেটা হিতে বিপরীত হয়। ওই সময় এখনকার মতো যোগাযোগের এত মাধ্যম ছিল না। তারপরও মানুষ জেনে যায়, আন্দোলনকে বিভক্ত করার জন্য এরশাদই ডা. মিলনকে হত্যা করে। শেষ পর্যন্ত আন্দোলনের মুখে এরশাদকে বিদায় নিতে হয়। ১৯৯০ সালের ৪ ডিসেম্বর তিনি পদত্যাগ করেন এবং ৬ ডিসেম্বর আনুষ্ঠানিকভাবে বিচারপতি সাহাবুদ্দীনের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করেন। এরশাদের পতনের পর হাজার হাজার মানুষ রাতেই ঢাকার রাস্তায় নেমে আসে। তারা বিজয় উদযাপন করে।

কিন্তু দেখা যাচ্ছে, এখনও আমরা যেন সেই চোরাবালিতেই পড়ে আছি। সরকার ব্যবস্থা পরিবর্তনে গণতান্ত্রিক পন্থার যে স্বপ্ন ছিল, সেটা এখনও পূরণ হয়নি। তখন ছাত্রসমাজ যে ভূমিকা রেখেছিল, আজ তা দেখা যায় না। কারণ বড় বড় রাজনৈতিক দল ছাত্র রাজনীতি ও শ্রমিক রাজনীতিকে ধ্বংস করে ফেলেছে। আজকে বিরোধী দল গণতান্ত্রিক আন্দোলন করার পরও এবং তাদের যথেষ্ট জনসমর্থন থাকার পরও, সংঘবদ্ধ ছাত্র রাজনীতি না থাকার ফলে শক্ত আন্দোলন দাঁড় করাতে পারছে না। পুলিশের ভয়ে তারা রাজপথ ছেড়ে দেয়। অথচ নব্বই সালে ছাত্রসমাজ যেভাবে দৃঢ়ভাবে দাঁড়িয়েছিল, কারফিউ ভঙ্গ করেছিল, সেই অবস্থা কি আছে? ফলে দেশ একটা দীর্ঘস্থায়ী অচলাবস্থার মধ্যে পড়ে যাচ্ছে এবং কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন আসছে না। উল্টো দেশি-বিদেশি বিভিন্ন শক্তির দিকে আমাদের তাকিয়ে থাকতে হচ্ছে। অথচ দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক আন্দোলনের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক থাকার কথা নয়। 

ক্ষমতায় এবং ক্ষমতার বাইরে যারা রয়েছে এবং অতীতে গণতন্ত্রের জন্য সংগ্রাম করেছে, অর্থাৎ এরশাদের পতনে যারা ভূমিকা রেখেছে, সেসব পক্ষ কেউ ক্ষমতায়, কেউ ক্ষমতার বাইরে। এখনও সময় আছে। সময় থাকতে তারা যেন ঐকমত্যে আসে। শান্তিপূর্ণ পন্থায় নির্বাচনের মাধ্যমে সরকার পরিবর্তনের ধারা তারা যেন ফিরিয়ে আনে কিংবা নতুন করে তৈরি করে। তাহলেই কিন্তু আমরা ৬ ডিসেম্বরকে কেন্দ্র করে শহীদদের স্মরণ করতে পারি। শহীদ ডা. মিলনের রক্তে বিশেষ করে গণঅভ্যুত্থান গড়ে ওঠে। তাঁর মৃত্যুতে জনতা বারুদে দিয়াশলাই কাঠির 
মতো বিস্ফোরিত হয়। সেই বিস্ফোরণে স্বৈরাচারী সরকার মাথা নত করতে বাধ্য হয়েছিল। একই ঘটনা যেন জনসমর্থিত রাজনৈতিক দলের ক্ষেত্রে না হয়। তাই আলাপ-আলোচনা ও সমঝোতার মাধ্যমেই চলমান সংকটের ফয়সালা হওয়া দরকার। 

ডা. মুশতাক হোসেন: এরশাদবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতা ও ডাকসুর সাবেক সাধারণ সম্পাদক (জিএস)

আরও পড়ুন

×