ঢাকা শনিবার, ০২ মার্চ ২০২৪

স্বৈরাচার পতন দিবস ও আজকের ভাবনা

স্বৈরাচার পতন দিবস ও আজকের ভাবনা

মোস্তাফিজুর রহমান বাবুল। ফাইল ছবি

মোস্তাফিজুর রহমান বাবুল

প্রকাশ: ০৬ ডিসেম্বর ২০২৩ | ১৮:২৭

১৯৯০-এর ৪ ডিসেম্বর ছাত্র জনতার অভূতপূর্ব গণঅভ্যুত্থানের পটভূমিতে স্বৈরশাসক এরশাদ সরকারের পতন হয়েছিল। ৬ ডিসেম্বর বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদের কাছে আনুষ্ঠানিক ক্ষমতা হস্তান্তরের মধ্য দিয়ে এরশাদ সরকারের ৯ বছরের স্বৈরশাসনের অবসান ঘটেছিল।

তবে দুর্ভাগ্য আমাদের, গণতন্ত্রের এই যাত্রা দীর্ঘ হয়নি। পরাজয় মেনে নিতে না পেরে দেশে-বিদেশে গ্রহণযোগ্য ১৯৯১–এর নির্বাচনকে আওয়ামী লীগ সভানেত্রী সূক্ষ্ম কারচুপির নির্বাচন হিসেবে আখ্যায়িত করে নতুন সরকারকে ২৪ ঘণ্টাও শান্তিতে থাকতে না দেওয়ার ঘোষণা দেন। শুরু থেকেই আওয়ামী লীগ বিএনপির নেতৃত্বাধীন নির্বাচিত সরকারকে পদে পদে বিরোধিতা করতে থাকে, সংসদকেও অকার্যকর করে ফেলতে থাকে। এরই মধ্যে আওয়ামী লীগ, জাতীয় পার্টি এবং জামায়াতে ইসলামী তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবি সামনে আনে। ’৯৪ সালে অনুষ্ঠিত মাগুরা উপনির্বাচনে কারচুপির অভিযোগে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে এরা সংসদ বর্জন করতে থাকে এবং এক পর্যায়ে সংসদ থেকে পদত্যাগ করে চরম অচলাবস্থা তৈরি করে। হরতাল-অবরোধ কর্মসূচির মাধ্যমে দেশকে বিপর্যয়ের মধ্যে ফেলে দেয়।

সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা রক্ষায় ৯৬’র মধ্য ফেব্রুয়ারির নির্বাচন করে বিএনপি সংসদে বসে সংবিধানে ত্রয়োদশ সংশোধনী এনে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে পরবর্তী সংসদ নির্বাচনের ব্যবস্থ করে দেড় মাসের মাথায় সংসদ ভেঙে দেয়। এরপর ৯৬’র জুন মাসে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয়। ধারাবাহিকভাবে ২০০১ এ অনুষ্ঠিত নির্বাচনে বিএনপি’র নেতৃত্বাধীন ৪ দলীয় জোট ক্ষমতায় ফিরে আসে।

তারপরের ইতিহাস রাজনীতির জন্য শুভ নয়। বিচারপতিদের বয়স বাড়ানোয় সদ্য বিদায়ী প্রধান বিচারপতি কেএম হাসানের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা হবার কথা। আওয়ামী লীগ এটা মানতে নারাজ এবং এর বিরুদ্ধে তারা রক্তক্ষয়ী আন্দোলন গড়ে তোলে। রাজনীতিতে চরম অচলাবস্থা সৃষ্টি হয়। রাষ্ট্রপতি ইয়াজ উদ্দিন আহম্মেদ তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রধান হন, নির্বাচন কমিশন তফসিল ঘোষণা করে। সকল দল মনোনয়নপত্র জমাও দেয়। আকস্মিকভাবে আওয়ামী লীগ, জাতীয় পার্টি’র নেতৃত্বাধীন মহাজোট মনোনয়নপত্র প্রত্যাহার করে নেয় এবং পর পরই বিদেশীদের সরাসরি হস্তক্ষেপে সেনা সমর্থিত ফখরুদ্দিন আহম্মেদের সরকার প্রতিষ্ঠিত হয়। রাজনীতি থেকে দু’বছর হারিয়ে যায়। ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত হয় জাতীয় সংসদের ৯ম নির্বাচন। আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে মহাজোট ক্ষমতায় আসে। এই নির্বাচনে দল বিশেষের পক্ষে দেশে বিদেশে নানা শক্তির প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ ভূমিকার কথা শোনা যায়। ভারতের প্রয়াত রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জী তাঁর প্রকাশিত পুস্তকেও তা বলে গেছেন।

নানা সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত ৪টি নির্বাচনই দেশে–বিদেশে গ্রহণযোগ্যতা পেয়েছে। এ কথা অনস্বীকার্য যে, দলীয় সরকারের অধীনে বাংলাদেশে কোন নির্বাচনই গ্রহণযোগ্যতা পায়নি।

এর পরের ঘটনা সাম্প্রতিক। ২০১৪–এর নির্বাচনের আগে ২০১১ সালে সুপ্রিম কোর্টের একটি আদেশকে উপলক্ষ বানিয়ে আওয়ামী লীগ সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে সংবিধানে পঞ্চদশ সংশোধনী এনে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল করে সংসদ বহাল রেখে দলীয় সরকারের অধীনে সংসদ নির্বাচনের বিধান চালু করে। দেশে নতুন করে রাজনৈতিক সংকট তৈরি হয়।

২০১৪ সালে ১০ম জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। বিরোধী দলবিহীন এ নির্বাচনে ১৫৩ জন বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় এমপি নির্বাচিত হয়ে যান। অবশিষ্ট আসনে শতকরা পাঁচ ভাগ ভোটারও ভোট দেননি। বিএনপিসহ বিরোধী রাজনৈতিক দল তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা ফিরিয়ে আনা, সংসদ বাতিলের দাবিতে ২০১৪’র নির্বাচন বর্জন করলেও শেখ হাসিনার দেওয়া প্রতিশ্রুতির ওপর আস্থা রেখে দলীয় সরকারের অধীনেই ২০১৮’র একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নিয়ে ভয়ংকর তিক্ত অভিজ্ঞতা লাভ করে। প্রমাণ হয়, দলীয় সরকারের অধীনে নিরাপদে কেন্দ্রে গিয়ে পছন্দমতো প্রার্থীকে ভোট দিয়ে এমপি নির্বাচিত করা যায় না।

ইতোমধ্যে ঘোষিত দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনের তপশিল অনুযায়ী নির্বাচনী প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। মনোনয়নপত্র জমাদানের তারিখ পার হয়ে গেছে। আওয়ামী লীগ এবং তার জোট–মহাজোট সঙ্গীরা ছাড়া কেউই এই নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে না। নির্দলীয় নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের দাবি আদায়ের লক্ষ্যে বিএনপিসহ বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলি যুগপৎ ধারায় লাগাতার কর্মসূচি পালন করছে। দেশের মানুষও চায় দল নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থায় নির্বাচন। বিশ্ব জনমতও বাংলাদেশে অবাধ, সুষ্ঠু, গ্রহণযোগ্য ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের পক্ষে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, অস্ট্রেলিয়া, জাপান বাংলাদেশে অবাধ, সুষ্ঠু, শান্তিপূর্ণ ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন নিশ্চিত করার জন্য সরকারের ওপর চাপ অব্যাহত রেখেছে। জাতিসংঘও এ ব্যাপারে সোচ্চার। মানবাধিকার আর গণতন্ত্রের ইস্যুতে নানা কথা জোরেশোরেই আলোচিত হচ্ছে। ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা ও ভিসা পলিসির বাস্তবায়ন– এ সবই দৃশ্যমান। অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে, সামনের দিনে যেকোনো মূল্যে ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্য ক্ষমতাসীনরা খুন, নির্বিচার গ্রেপ্তার, গায়েবি মামলা, বিরোধী দলের নেতা–কর্মীদের দ্রুত সাজা প্রদান এবং বলপয়োগের মাধ্যমে একতরফা নির্বাচনী প্রক্রিয়া অব্যাহত রাখবে। আর এর ফলে শ্রম অধিকার, গণতন্ত্র ও মানবাধিকার লংঘনের সুস্পষ্ট অভিযোগে দেশের অর্থনীতি, ব্যাবসা– বাণিজ্য  চরম ঝুঁকির মধ্যে পড়বে কি না এ নিয়ে শংকা দিনে দিনে বাড়ছে। দেশের ব্যবসায়ী সমাজের সাথে সমাজ ও রাজনীতি–সচেতন, দেশপ্রেমিক মানুষ উদ্বেগ উৎকণ্ঠা নিয়ে সময় পার করছে।

৯০ এ অসংখ্য শহীদের আত্মদানের মধ্য দিয়ে দেশের ছাত্র–জনতা গণতন্ত্র ফিরিয়ে এনেছিল। ৩৩ বছর পেরিয়ে গেল। এখনও দেশের মানুষকে তার ভোটের জন্য, গণতন্ত্রের জন্য, গনতান্ত্রিক শাসনের জন্য রক্ত দিতে হয়, নিষ্ঠুর নির্যাতন নিপীড়ন কারাবাসের মুখোমুখি হতে হয়। দমনপীড়ন চালিয়ে জোরজবরদস্তি করে কি গণতন্ত্রের জন্য জনগণের শাশ্বত আকাঙ্ক্ষাকে শেষপর্যন্ত দমিয়ে রাখা যাবে? যাবে না। বাংলাদেশ পরাজয় মানবে না। পরাভূত হবে না।

মোস্তাফিজুর রহমান বাবুল: ’৯০-এর ছাত্র-গণঅভ্যুত্থানের কেন্দ্রীয় নেতা

আরও পড়ুন

×