ঢাকা মঙ্গলবার, ০৫ মার্চ ২০২৪

তরুণরা কোথায় যাবে?

অন্যদৃষ্টি

তরুণরা কোথায় যাবে?

.

রমিজ ইসলাম

প্রকাশ: ০৯ ডিসেম্বর ২০২৩ | ২২:২৭

মুক্তিযুদ্ধ-পূর্ব ও স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশে তরুণদের বারবার স্বপ্ন দেখানো হয়েছে; কিন্তু সে স্বপ্ন অধরাই রয়ে গেছে। তরুণরা বিশ্ব দরবারে দাঁড়িয়ে লাল-সবুজের পতাকাকে তুলে ধরতে চেয়েছে; তা না হয়ে বারবার দুর্নীতিতে চ্যাম্পিয়ন হওয়ার গ্লানি সহ্য করতে হয়েছে। তরুণরা সাক্ষী হয়েছে ঘর থেকে তুলে নিয়ে গিয়ে হত্যা, গুম ও খুনের। তরুণরা প্রত্যক্ষ করেছে গাড়িতে পেট্রোল বোমা মেরে এবং লগি-বৈঠা নিয়ে জীবিত মানুষ পিটিয়ে মেরে লাশের ওপরে উদ্দাম নৃত্য।

স্বাধীনতার উদ্দেশ্যই ছিল একটি শক্তিশালী গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের সূচনা করা; যেখানে জনগণ তার ভোটাধিকার প্রয়োগ করবে; কিন্তু তা না হয়ে এদেশে হয় ক্ষমতাকে কুক্ষিগত করা হয়েছে রাষ্ট্রশক্তিকে ব্যবহার করে অথবা স্বাভাবিক গণতান্ত্রিক নির্বাচন প্রক্রিয়াকে নস্যাৎ করে দেওয়া হয়েছে ক্ষমতা প্রয়োগ করে। ক্ষমতার মসনদে থেকে ক্ষমতাশীলরা রাষ্ট্রের উন্নয়নকে ত্বরান্বিত করা ও মূল্যবোধকে শক্তিশালী করার বদলে ব্যর্থতাকে আড়াল করা ও বিরোধী মত দমন করে কীভাবে আবার ক্ষমতার চেয়ারে বসা যায় সেই স্বপ্ন বুনেছে।

একজন তরুণ হিসেবে এবং একুশ শতকের সভ্য ও অতি-আধুনিক বিশ্ব নাগরিক হিসেবে নিজ দেশের এমন পরিস্থিতে উদ্বিগ্ন না হয়ে পারা যায় না। এই সময়ে এসে আমরা একটি সহঅবস্থানমূলক ও শক্তিশালী গণতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থা দেখব অথচ আমরা দেখছি বিভক্তি, সৃষ্টির পরিবর্তে ধ্বংস, আবিষ্কারের পরিবর্তে অন্ধকার সমাজ। আমাদের শুনতে হচ্ছে বাংলাদেশে গণতন্ত্র নেই, আমরা প্রত্যক্ষ করছি দেশের অর্থ পাচার হচ্ছে ভিনদেশে। আমাদের দেখতে হচ্ছে– ভঙ্গুর শিক্ষাব্যবস্থা, ছাত্ররাজনীতির নামে মাস্তানি ও শিক্ষায় জ্ঞান সৃষ্টি আবিষ্কারের পরিবর্তে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো শেষ হয়ে যেতে। এমন নিয়ন্ত্রিত পরিবেশ তৈরি করা হয়েছে যে, আমাদের তরুণ শিক্ষার্থীরা নতুন জ্ঞান অর্জন, সৃষ্টি ও গবেষণার পরিবর্তে একে অপরের বিরুদ্ধে স্লোগান দিচ্ছে। দু-চারজন মেধাবী যা তৈরি হচ্ছে, তারা এমন পরিস্থিতি দেখে দেশ ছেড়ে বিদেশে পাড়ি জমাচ্ছে। উচ্চমানের শিক্ষাবিদ, লেখক, গবেষক, বিজ্ঞানী, মানবপ্রেমী বিশ্বনাগরিক ও আন্তর্জাতিক মানের মানবসম্পদ তৈরির পরিবর্তে বিশেষ মত ও মতাদর্শের তৈল মর্দনকারী বিবেকহীন দাসে পরিণত করার প্রচেষ্টা অব্যাহত। তরুণরা ভীষণভাবে উদ্বিগ্ন ও উৎকণ্ঠায় দিন কাটাচ্ছে দেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে।

তরুণরা স্বাধীন বাংলাদেশের স্বপ্ন চোখে নিয়ে বুকের রক্ত ঢেলে দিয়েছিল ১৯৭১ সালে। একটা স্বাধীন ভূখণ্ড পেলেও পূর্ণভাবে কখনও পায়নি চিন্তা, লেখা ও কথা বলার স্বাধীনতা। এ সময়ের মধ্যে তরুণরা বড় বড় দালানকোঠার ইমারত দেখেছে বটে; কিন্তু জাতিসত্তার ভিত্তিকে আবিষ্কার করেছে খুব দুর্বলভাবে। তরুণরা বিভিন্ন মত-মতাদর্শের সহাবস্থান, রাজনৈতিক দর্শন লালন এবং রাজনীতি করার অধিকারসমেত এক শক্তিশালী রাষ্ট্রের কাঠামো চেয়েছিল; তারা দেখেছে রাজনৈতিক পীড়ন, নির্যাতন, ভিন্ন মতাবলম্বী দমন ও আগ্রাসী মনোভাব, যেটি শক্তিশালী করেছে বিভক্তি ও পরস্পরের বিদ্বেষকে। 
তাই তরুণ প্রজন্মের প্রতিনিধি হিসেবে অভূত সম্ভাবনার দেশ বাংলাদেশকে একটি প্রকৃত গণতান্ত্রিক ও বিশ্ব দরবারে গর্ব করার মতো শক্তিশালী রাষ্ট্র হিসেবে দেখার প্রত্যাশা করি। এ জন্য সর্বপ্রথম দেশের জাতীয় নির্বাচন হওয়া উচিত স্বচ্ছ, নিরপেক্ষ ও অংশগ্রহণমূলক; যেখানে সব দল আইন মেনে তাদের রাজনৈতিক মতাদর্শ লালন ও নির্বাচন করার অধিকার পাবে। যাতে কোনো রাজনৈতিক দলমতের ক্ষমতা কুক্ষিগতকরণ বা ক্ষমতায় আরোহণের ইচ্ছার ফলে সৃষ্ট সংকটে পরাশক্তিগুলোর ঘোলা পানিতে মাছ শিকারের বাস্তবতা আমরা চাই না। 

রমিজুল ইসলাম : পিএইচডি  গবেষক, গাজী ইউনিভার্সিটি, তুরস্ক

আরও পড়ুন

×