ঢাকা মঙ্গলবার, ০৫ মার্চ ২০২৪

আধুনিক রাষ্ট্রে লৈঙ্গিক বৈচিত্র্যের অধিকার

ট্রান্সজেন্ডার

আধুনিক রাষ্ট্রে লৈঙ্গিক বৈচিত্র্যের অধিকার

.

মার্জিয়া প্রভা

প্রকাশ: ০৯ ডিসেম্বর ২০২৩ | ২২:২৮

সম্প্রতি একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে একজন ট্রান্সজেন্ডার অধিকারকর্মীকে ক্যারিয়ার-সংশ্লিষ্ট অনুষ্ঠানে অতিথি হিসেবে আমন্ত্রণ করার পরও অনুষ্ঠানের আগে বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে সেই আমন্ত্রণ নাকচ করা হয়েছে। এ ঘটনাটির ঠিক পরপরই আমরা দেখতে পাচ্ছি, বাংলাদেশ লিবারেল ইসলামী জোট একজন হিজড়া সম্প্রদায়ের প্রার্থীকে গাজীপুর-৫ আসনে মনোনয়ন দিয়েছে। গত কয়েক বছরে হিজড়া সম্প্রদায়ের অনেক ব্যক্তিই জয়িতা পুরস্কার অর্জন করেছেন কিংবা ইউপি মেম্বার ও পৌর কাউন্সিলর হয়েছেন। প্রচুর সামাজিক বাধা থাকা সত্ত্বেও হিজড়া সম্প্রদায়ের কতিপয় মানুষের এই অর্জন একটা স্বীকৃতি। গত কয়েক বছরে হিজড়া সম্প্রদায়ের এ অর্জনের পরও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যারিয়ার-সংশ্লিষ্ট অনুষ্ঠানে এই বৈপরীত্য আমরা কেন দেখতে পেলাম?

হিজড়া একটি গোষ্ঠীভিত্তিক পরিচয়। এই উপমহাদেশে হিজড়া সংস্কৃতি বহুল পুরোনো। হিজড়া সম্প্রদায় সমাজের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত থাকলেও নাগরিক হিসেবে ন্যূনতম অধিকার ও মর্যাদা কখনোই তারা পাননি। বাংলাদেশের মতো ৫২ বছর পেরোনো একটি আধুনিক রাষ্ট্রে গত দুই দশক আগেও তাদের ভোটাধিকার ছিল না। 

স্কুলে লেখাপড়ার অধিকার ছিল না। জয়িতা পুরস্কারজয়ী হিজড়া ময়ূরী জানিয়েছিলেন, ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ারিং পাস করে তিনি চাকরি পান, কেবল হিজড়া পরিচয় জানাজানি হলে তাঁকে চাকরি থেকে অন্যায্যভাবে বের করে দেওয়া হয়েছিল। আধুনিক গণতান্ত্রিক একটি রাষ্ট্রে অধিকারহীন অবস্থায় যখন হিজড়া সম্প্রদায় প্রতিনিয়ত লড়ছে, তখন ‘ট্রান্সজেন্ডার মতবাদ কতটা ভয়ংকর’ সেই আলাপ করাটি গোদের ওপর বিষফোড়ার মতো।  আলাপটি কারা করছে এবং কেন করছে তাদের মনস্তত্ত্ব বোঝাও জরুরি।

চলমান বেশির ভাগ আলোচনায় হিজড়াকে প্রাকৃতিক লিঙ্গ হিসেবে গণ্য করা হচ্ছে। অন্যদিকে ট্রান্সজেন্ডারকে মনে করা হচ্ছে একজন ব্যক্তির স্বেচ্ছাচারী চর্চার ফলে এক লিঙ্গ থেকে আরেক লিঙ্গে রূপান্তরিত হওয়ার ফল। ‘আজ পুরুষ কাল কীভাবে নারী হয় কিংবা আজ নারী কীভাবে কাল পুরুষ হয়?’  কিংবা ‘আসলে তারা কি নারী নাকি পুরুষ?’ এসব আলাপই ঘুরেফিরে আসছে ।
রূপান্তরিত বা ট্রান্সজেন্ডার এবং আন্তঃলিঙ্গ (ইন্টারসেক্স) এই দুই লিঙ্গ পরিচয় এক নয়। মানুষের প্রাকৃতিক লিঙ্গ পরিচয় দিয়েই কেবল তার লিঙ্গ পরিচয় শেষ হয়ে যায় না। যদি তাই হতো, তাহলে সব নারী এবং সব পুরুষ একই রকম হতো। শরীর দেখেই লিঙ্গ পরিচয় নির্মাণের প্রচলিত ধারণাটি মনস্তাত্ত্বিকভাবে আর সব লৈঙ্গিক বৈচিত্র্যকে নেই করে দেয়। 

ট্রান্সজেন্ডারের ক্ষেত্রে একজন পুরুষের শরীর নারীর মতো করে ভাবতে চায়, বাঁচতে চায় কিংবা একজন নারীর শরীর আচরণগতভাবে পুরুষের মতো করে গড়ে উঠতে চায়। একজন ট্রান্সজেন্ডারের পক্ষে এই ভাবনাটাই বরং স্বাভাবিক। কিন্তু সমাজের একপক্ষ আরেক পক্ষের এ ভাবনাকেই অস্বাভাবিক, প্রকৃতিবিরুদ্ধ বলছে। লঙ্ঘিত হচ্ছে ট্রান্সজেন্ডার ব্যক্তির মানবাধিকার।

আধুনিক প্রায় প্রতিটি রাষ্ট্রের সংবিধানে উল্লেখ করা, কোনো মানুষকেই লিঙ্গ, শ্রেণি, বর্ণ, গোত্র ও ধর্মের ভিত্তিতে বৈষম্য করা যাবে না। বাংলাদেশের সংবিধানেও তাই আছে। সংবিধানে লেখা সত্ত্বেও বৈষম্য তৈরি করার উপাদান রাষ্ট্রে বিদ্যমান রয়েছে। যেমন– ৩৭৭ ধারা পেনাল কোডটি, ভারত যেটি বাতিল করেছে ইতোমধ্যে। পৃথিবীর প্রায় অনেক মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশেও এ ধরনের আইন নেই (তুরস্ক, ইন্দোনেশিয়া লেবানন প্রভৃতি)। এই আইনে ‘প্রকৃতিবিরুদ্ধ’ যে কোনো যৌন সম্পর্ককে ফৌজদারি অপরাধ হিসেবে দেখা হয়েছে। আইনে কোনোভাবে ট্রান্সজেন্ডারের কথাটি উল্লেখ না থাকলেও, ট্রান্সজেন্ডার সম্পর্কে সমাজের মনস্তত্ত্ব এটিই জারি আছে যে, ট্রান্সজেন্ডার ব্যক্তি প্রকৃতিবিরুদ্ধে যৌনকর্ম করে, তাই তাঁকে সব নাগরিক অধিকার থেকে বঞ্চিত করা হবে। অথচ একজন ট্রান্সজেন্ডার ব্যক্তির কোনো যৌনকর্মের প্রতি আগ্রহী নাও হতে পারেন, অযৌন হতে পারেন, সে ক্ষেত্রেও কি ৩৭৭ ধারাটি প্রযোজ্য হবে? 

এসডিজি গোল-৫ জেন্ডার সমতার লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের জন্য বাংলাদেশ তৃতীয় লিঙ্গ বলে এক আলাদা পরিচয় দিয়ে এনেছে। কিন্তু তৃতীয় লিঙ্গ দিয়েও কি সব লৈঙ্গিক পরিচয়কে বোঝানো সম্ভব? আধুনিক রাষ্ট্রে লৈঙ্গিক বৈচিত্র্যের অধিকার তখনই প্রতিষ্ঠিত হওয়া সম্ভব, যখন লৈঙ্গিক বৈচিত্র্য, ধর্মীয় বৈচিত্র্য, জাতিগত বৈচিত্র্যের মতো আর সব বৈচিত্র্যকে গ্রহণ করা হবে, স্বীকৃতি দেওয়া হবে এবং নাগরিক সব সমান সুযোগ ও মর্যাদা দেওয়া হবে।  কেবল দু-একজন লৈঙ্গিক বৈচিত্র্যের মানুষকে রাষ্ট্রীয় পদে আসীনের মাধ্যমে সমাজের মানুষের মন থেকে লিঙ্গ বৈচিত্র্যের প্রতি সামন্ততান্ত্রিক দৃষ্টিভঙ্গি, ঘৃণা করা, নাকচ করা এবং  অসম্মান করার প্রবণতাকে নেই করে দেওয়া সম্ভব নয়। সম্প্রতি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের সে ঘটনাটিই বারবার মনে করিয়ে দেয়।
 
মারজিয়া প্রভা: নারীবাদী অধিকারকর্মী 

আরও পড়ুন

×