ঢাকা মঙ্গলবার, ০৫ মার্চ ২০২৪

মিয়ানমার-বাংলাদেশ নিয়ে ভারত-রাশিয়ার ঐকমত্যের তাৎপর্য

কূটনীতি

মিয়ানমার-বাংলাদেশ নিয়ে ভারত-রাশিয়ার ঐকমত্যের তাৎপর্য

জেনারেল হ্লাইং ও প্রেসিডেন্ট পুতিন

এম কে ভদ্রকুমার

প্রকাশ: ০৯ ডিসেম্বর ২০২৩ | ২২:৩০ | আপডেট: ১০ ডিসেম্বর ২০২৩ | ২১:৫৮

পররাষ্ট্রনীতির কৌশল বাস্তবায়নে কূটনীতিতে সময়ই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। বিগত দুই সপ্তাহে ভারতের পররাষ্ট্র দপ্তর তার দুটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিবেশী দেশ বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের সঙ্গে শলাপরামর্শের আয়োজন করে, যা নিঃসন্দেহে উল্লেখযোগ্য ঘটনা। বিদ্যমান অস্থির আন্তর্জাতিক পরিবেশে এ ঘটনা দেখিয়ে দেয়, ভারতের কৌশলগত স্বার্থ কোথায় রয়েছে। 

বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক নিশ্চয় এক রকম নয়, তবে মিলেরও অভাব নেই। বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের কেন্দ্রে যদি থাকে উন্নয়ন, বাণিজ্য এবং কানেক্টিভিটি বা পারস্পরিক সংযোগ এবং অবশ্যই, গভীর সমধর্মী সামাজিক ও সাংস্কৃতিক মূল্যবোধ, সে ক্ষেত্রে ভারত-মিয়ানমার সম্পর্কের মূল বিষয় ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা স্বার্থ এবং কানেক্টিভিটি।

উভয় দেশই ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতায় প্রভাব রাখে, মূল ভারতের সঙ্গে যে অঞ্চলটির একত্রীকরণ স্বাধীনতার ৭৫ বছরেও সম্পন্ন হয়নি। একইভাবে মিয়ানমার ও বাংলাদেশ উভয়েই বৃহৎ শক্তিগুলোর দ্বন্দ্বের মধ্যে অবস্থান করছে, যার ফলাফল এ অঞ্চলের ভূরাজনীতিতে সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলবে। যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান, যারা একদিকে বাংলাদেশের নির্বাচন প্রক্রিয়ায় হস্তক্ষেপ করছে, অন্যদিকে গোপনে মিয়ানমারের শাসনব্যবস্থা পরিবর্তনে কাজ করছে, যা ভারতকে এ ব্যাপারে চীন ও রাশিয়ার দিকে ঠেলে দিয়েছে।

সংক্ষেপে বলা যায়, বাংলাদেশে ৭ জানুয়ারির নির্বাচনে শেখ হাসিনা সরকারের পরাজয় বা মিয়ানমারের ঐক্য ও অখণ্ডতাকে চ্যালেঞ্জ করে বিচ্ছিন্নতাবাদী প্রবণতার উত্থান ভারতের জন্য ক্ষতিকর পরিণতি বয়ে আনবে। উল্লেখ্য, বাংলাদেশের সঙ্গে পররাষ্ট্র দপ্তরের পরামর্শ (২৪ নভেম্বর) হয়েছে এমন সময়, যখন দেশটি নির্বাচনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছিল। আর মিয়ানমারের সঙ্গে আলোচনার (৬ ডিসেম্বর) সময়টা ছিল এমন, যখন বিদ্রোহী জাতিগত গোষ্ঠী এবং যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড ও কানাডার গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর সমন্বয়ে গঠিত ফাইভ আইস সমর্থিত ‘গণতন্ত্রপন্থি’ বাহিনীর হাতে মিয়ানমারের সামরিক সরকারের পতনের ঘণ্টা শোনা যাচ্ছে।

মজার ব্যাপার হলো, পররাষ্ট্র দপ্তরের আলোচনার প্রাক্কালে রাশিয়ার নিরাপত্তা পরিষদের সেক্রেটারি নিকোলে পাত্রুশেভের নেতৃত্বে একটি উচ্চপর্যায়ের আন্তঃমন্ত্রণালয় প্রতিনিধি দল মিয়ানমার সফর করে। তাস নিউজ এজেন্সি জানিয়েছে, ওই আলোচনায় স্থান পায় ‘আইন প্রয়োগকারী সংস্থা, বিশেষ পরিষেবা ও প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের মধ্যে সহযোগিতার বিষয়, যেখানে গুরুত্ব পায় আইনশৃঙ্খলা ও আইনের শাসন রক্ষা, সন্ত্রাস দমন ব্যবস্থা এবং সন্ত্রাসী সংগঠনগুলোর অর্থায়নের মাধ্যম ও উৎসগুলোর বিশ্লেষণ’।

 ক্রেমলিনের সর্বোচ্চ নিরাপত্তা কর্মকর্তা পাত্রুশেভকে মিয়ানমার রাষ্ট্রীয় প্রশাসন পরিষদের চেয়ারম্যান জেনারেল মিন অং হ্লাইং স্বাগত জানান। (২০২১ সালের ফেব্রুয়ারিতে ক্ষমতা দখলের পর এ পর্যন্ত জেনারেল হ্লাইং তিনবার মস্কো সফর করেছেন।)

গত মাসে প্রথমবারের মতো মিয়ানমার ও রাশিয়া তিন দিনের যৌথ নৌ মহড়া দিয়েছে। বঙ্গোপসাগরে মহড়াটি আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিকভাবে অনেক মনোযোগ কাড়ে।
প্রসঙ্গত, ভয়েস অব আমেরিকা একটি মন্তব্যে বলেছে, ‘বিশ্লেষকরা বলছেন, ভারত তার পুরোনো মিত্র এবং প্রতিরক্ষা সরঞ্জামের বৃহত্তম সরবরাহকারী রাশিয়ার প্রতি বিরূপ নয়; কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ জলসীমায় চীনের সম্প্রসারিত পদক্ষেপ প্রতিহত করার লক্ষ্যে যুক্তরাষ্ট্র, জাপান, অস্ট্রেলিয়া এবং ভারতের মধ্যে গভীরতর অংশীদারিত্ব সত্ত্বেও রাশিয়া ভারতের প্রতিবেশীর সামুদ্রিক অংশে নিজের উপস্থিতি বাড়াচ্ছে। পশ্চিমা অংশীদারদের চাপ উপেক্ষা করে নয়াদিল্লি মস্কোর সঙ্গে তার বহু দশকের সম্পর্ক বজায় রেখেছে এবং ইউক্রেন যুদ্ধে নিরপেক্ষ অবস্থান নিয়েছে।’

স্পষ্টত, রাশিয়া ব্যাপকভাবে মিয়ানমারে ফিরছে। গেল বৃহস্পতিবার মার্কিন সরকারের অর্থায়নে পরিচালিত এবং মিয়ানমারের বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলোর সমর্থক রেডিও ফ্রি এশিয়া রাশিয়া-মিয়ানমারের সম্পর্কের গভীরতা নিয়ে একটি অসাধারণ মন্তব্য করেছে। এর শিরোনাম ছিল অস্ত্রের সম্পর্কে জড়াল একঘরে দেশগুলো। সেখানে বলা হয়, রাশিয়া সেনাশাসিত মিয়ানমারে একটি মিত্র খুঁজে পেয়েছে, যা মিয়ানমারের সঙ্গে সোভিয়েত ইউনিয়নের সম্পর্কের দীর্ঘ ইতিহাস মনে করিয়ে দেয়। ওয়াশিংটন ক্ষুব্ধ এ কারণে যে, যখন মিয়ানমারে ফাইভ আইসের সরকার পরিবর্তনের প্রকল্পটি কিছুটা সাফল্য দেখছে, ঠিক তখনই দৃশ্যপটে রাশিয়া ‘স্পয়লার’ হিসেবে হাজির হয়েছে।

 পেয়েও কেন সামরিক বাহিনী এমন ফাঁদে পা দেবে?
স্পষ্টতই, মিয়ানমার পরিস্থিতি নিয়ে রাশিয়া-ভারত একটি অভিন্ন অবস্থানে রয়েছে। মস্কো এবং দিল্লি জেনারেল মিন অং হ্লাইংকে ক্ষমতাচ্যুত করার জন্য ফাইভ আইসের প্রকল্পে বিশ্বাস করে না। তারা বুঝতে পারছে, ফাইভ আইস প্রকল্পটি হলো অং সান সু চি যুগের অবসান ঘটানো এবং পরবর্তী সময়ে পশ্চিমাপন্থি উপদলগুলোকে কিছু ক্ষমতা ভাগাভাগির ব্যবস্থায় সন্নিবেশ করা, যা বঙ্গোপসাগরের ভূ-রাজনীতির ভারসাম্য উল্লেখযোগ্যভাবে নড়িয়ে দিতে পারে।

প্রকৃতপক্ষে, সু চি তাঁর বাবার মেয়ে হয়ে উঠেছেন; তাঁর বাবা ছিলেন একজন কট্টর বার্মিজ জাতীয়তাবাদী, যিনি কোনো কিছুর বিনিময়েই তাঁর দেশের সার্বভৌমত্ব এবং স্বাধীনতা বিসর্জন দেননি। শেখ হাসিনারও একই অবস্থা। মূল বিষয় হলো, যুক্তরাষ্ট্র কখনোই স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণকারী জাতীয়তাবাদী শাসনকে সহ্য করে না।

মিয়ানমার ও বাংলাদেশে পশ্চিমাদের প্রকল্প সফল হলে বঙ্গোপসাগরের উপকূলবর্তী রাষ্ট্রগুলোর জন্য এর পরিণতি হবে খুবই ভয়াবহ। তখন কানাডা ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ভারতের বর্তমান সমস্যাগুলো তুলনামূলকভাবে নিছক ‘পিকনিক’ বলে মনে হবে। উদাহরণস্বরূপ, পান্নুনের ব্যর্থ হত্যাচেষ্টা ঘিরে তর্কবিতর্কগুলোর কথা ধরা যেতে পারে।

রাশিয়া বঙ্গোপসাগরের ভূরাজনীতিতে জড়িত থাকার পরিণামের বিষয়টি বুঝতে পারে এবং বাংলাদেশ ও মিয়ানমার উভয়ের ওপর মার্কিন চাপ পেছনে ঠেলে শক্তিগুলোর সমন্বয়ের মধ্যে তার স্বার্থ কীভাবে নিহিত তাও তার জানা। এ ধরনের একটি জটিল কৌশলগত পটভূমিতে বার্ষিক রাশিয়ান-ভারত শীর্ষ সম্মেলন ফের শুরু করা একটি কৌশলগত প্রয়োজন হয়ে উঠেছে। এখানে বিরাম চিহ্ন টানা মানে এ অঞ্চলের ভূরাজনীতিকে নীরব স্বর দিয়ে পূর্ণ করা। আমরা কি কল্পনা বা মায়াবী জগতে বাস করি না? কূটনীতির বড় কাজ হলো বাস্তবতা খুঁজে বের করা।

এম কে ভদ্রকুমার: ভারতের সাবেক কূটনীতিক; শ্রীলঙ্কা গার্ডিয়ান থেকে ভাষান্তর করেছেন সাইফুর রহমান তপন

আরও পড়ুন

×