ঢাকা মঙ্গলবার, ০৫ মার্চ ২০২৪

দেশের জন্য যে সুযোগ দ্বিতীয়বার আসে না

দশদিক

দেশের জন্য যে সুযোগ দ্বিতীয়বার আসে না

ফারুক ওয়াসিফ

ফারুক ওয়াসিফ

প্রকাশ: ০৯ ডিসেম্বর ২০২৩ | ২২:৩৩

‘সব সুখী পরিবার একই রকম, কিন্তু সব অসুখী পরিবার যার যার মতো করে অসুখী’– রুশ সাহিত্যিক লিও তলস্তয়ের আনা কারেনিনা উপন্যাসের শুরুর এই বাক্যটা আজ বাংলাদেশের মনে করা দরকার। পৃথিবীর যেসব দেশ নিম্নমধ্যম আয় থেকে মধ্যম আয়ের দেশ হয়েছে, তাদের সবার গল্পটা একই রকম। কিন্তু যারা আর এগোতে পারেনি, তাদের একেকজনের সমস্যার ধরন ও কারণ একেক রকম। যারা উন্নত হয়েছে, তারা প্রতিষ্ঠান গড়েছে। ওসব প্রতিষ্ঠান অর্থনৈতিক উদ্ভাবনা বা চমক এনেছে, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যব্যবস্থার মান বাড়িয়েছে, প্রতিযোগিতার যোগ্যতায় এগিয়ে গিয়েছে। এসবের মধ্যে একটা বিষয় সবার মধ্যে দেখা গেছে। সেটা হলো, দেশ গড়ার রূপরেখা নিয়ে শাসক এলিটদের বিভিন্ন অংশের মধ্যে একটা সমঝোতা প্রতিষ্ঠা করা।

এটা জরুরি। কারণ, মধ্যম আয়ের ফাঁদ বলে একটা কথা উন্নয়নশাস্ত্রে মোটামুটি প্রতিষ্ঠিত। গত পাঁচ যুগে জাপান, তাইওয়ান, দক্ষিণ কোরিয়া ও সিঙ্গাপুর ছাড়া এশিয়ার কোনো দেশ মধ্যম আয়ের দেশের থেকে উন্নত দেশের পদোন্নতি পায়নি। ভারত, ইন্দোনেশিয়া, থাইল্যান্ড তো পারেইনি, এমনকি মালয়েশিয়াও এখনও উচ্চ আয়ের দেশ হতে পারেনি। পৃথিবীর প্রায় শখানেক দেশ এখন মধ্যম পর্যায়ে পড়ে আছে, কারও কারও এই পড়ে থাকার বয়স কয়েক যুগ। 

আমরা জানি, যেসব দেশকে মধ্যম আয়ের ফাঁদে পড়া দেশ বলা হয়, যারা নাকি মাথা পিছু ২ থেকে সাড়ে ৭ হাজার ডলার আয়ের কোটায় ২৮ বছর ধরে পড়ে আছে, অথবা ১৪ বছর যাবত যাদের মাথাপিছু আয় সাড়ে ৭ থেকে সাড়ে ১১ হাজার ডলারে আটকে আছে, অথবা মধ্যম আয়ের সীমানার মধ্যে থাকতে হচ্ছে ৪২ বছর ধরে। বাংলাদেশ সরকার ঘোষণা করেছে, আমাদের নাগরিকদের মাথাপিছু আয় আড়াই হাজার ডলার ছাড়িয়েছে। সবচেয়ে ধনীদের আয় যখন রকেট গতিতে বাড়ে, যখন ধনী আর গরিবে আয় বৈষম্য সব রেকর্ড ছাপিয়ে যায়, তখন আপনার ১ হাজার আর আমার ১০০ টাকাকে গড় করলে ৫৫০ টাকা আয় দেখানো যায় বটে; কিন্তু এই গড়ের সুবাদে আমার আয় ১০০-এর ওপর এক টাকাও আসলে বাড়ে না। এই শুভঙ্করের ফাঁকি মেনে নিয়েও প্রশ্ন করা যায়, আমরা নিম্নমধ্যম স্তর থেকে মধ্যম স্তরে পৌঁছাব কতদিনে, আদৌ কি ফাঁদে আটকে থাকার নির্ধারিত মেয়াদ অর্থাৎ ২৮ বছরের আগে পৌঁছাব?

এখানেই তলস্তয়ের আনা কারেনিনা উপন্যাসের ওই কথাটি স্মরণে আসে। ইন্দোনেশিয়া সামরিক শাসন, পূর্ব তিমুর রাজ্য নিয়ে বিবাদ ইত্যাদি কারণে পারেনি, ভারত প্রাযুক্তিক ও রপ্তানিতে চমক দেখাতে না পারার জন্য আটকে আছে, পাকিস্তানের যন্ত্রণা তার সেনাশাসন, আর্জেন্টিনা দুর্নীতি ও মাদকযুদ্ধে বিপর্যস্ত হয়েছে। তাই তারা পারেনি। ওপরে বলা সংকটগুলো বাংলাদেশে আছে, বাড়তি আছে একটা মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা। দেশ শাসনকারী এলিট গোষ্ঠীগুলির মধ্যে যতটা দ্বন্দ্ব বাংলাদেশে দেখা যায়, এক দল আরেক দলকে যেভাবে মাইনাস করতে মরিয়া, যেভাবে ভূরাজনৈতিক দুটি শিবিরে দেশের রাজনীতি মুখোমুখি দাঁড়িয়ে যাচ্ছে, যেভাবে গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান ও বিশ্বাস বিসর্জন দেওয়া চলছে, তা নিয়ে পৃথিবীর কোনো দেশ মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হতে পারেনি। কোনো রেকর্ড নেই, কোনো শাস্ত্র কোনো বিজ্ঞান কোনো ইতিহাস বলে না যে, এ রকম অগণতান্ত্রিকতা নিয়ে, এ রকম হানাহানি আর বিভক্তি নিয়ে এ রকম মুখোমুখি দ্বিজাতীয়তাবাদ নিয়ে কোনো দেশ উন্নত হওয়া দূরে থাক, নিতান্তই মধ্যম আয়ের দেশ হয়েছে!

দেশ এক পায়ে চলে না। মানুষের মতোই স্বাভাবিক দেশের দুটি পা, দুটি রাজনৈতিক ধারা থাকে। আমেরিকান ধারার চিন্তকেরা বলে থাকেন, রাজনৈতিক ধারা দুইয়ের বেশি হলে সরকারগুলো অস্থিতিশীল হয়, নিত্যনতুন কোয়ালিশন গড়ে ওঠে আর ভাঙে। ফলে কমজোরি সরকার তৈরি হয়, যারা কোনো বড় সিদ্ধান্ত নিতে বা দীর্ঘদিন ধরে কোনো কর্মসূচি বাস্তবায়ন করে যেতে পারে না। যা হোক, দেশের যদি দুটি পা হয়, তাহলে একটি যখন সামনে পদক্ষেপ নেবে, অন্যটি পেছন থেকে তাকে অনুসরণ করবে। পেছনের পা যখন সামনে যাবে, তখন সামনে থাকা আগের পা-টি তাকে সেই জায়গা করে দেবে। নাহলে হয়ে যাবে ফ্রগ জাম্প। দুই পা দু’দিকে যেতে চাইলে হাঁটা সম্ভব না। আবার দুই পা একসঙ্গে সামনে যেতে চাইলে হাঁটা বা দৌড়ানোর বদলে ব্যাং লাফ দিয়ে চলতে হবে। সেটি কোনো কাজের কথা না। 
আবার মাইনাস ওয়ান ফর্মুলায় যদি আমরা একটি বৃহৎ রাজনৈতিক ধারাকে পঙ্গু করে ফেলি, তখন কি আমরা এক পায়ে দৌড়াব? এক পায়ে কোনো দেশ চলতে পারে? কিংবা একচক্ষু হরিণের দশা? একচক্ষু হরিণ কেবল একটা পাশ দেখতে পায় বলে একদিকেই বাঁক নিয়ে দৌড়ায়। ফলে তার দৌড়ানোতে গতি থাকে; কিন্তু প্রগতি থাকে না। সে কেবল বৃত্তাকার পথে দৌড়ায়, একই জায়গায় ফিরে আসে, সামনে এগোতে পারে না। প্রতিটি নির্বাচনের সময়ে যে আমরা নিরপেক্ষতার সংকটে পড়ি, আমাদের সব প্রতিষ্ঠান যে দলীয়করণ হয়ে যায়, আমাদের সব বুদ্ধিজীবী যে একস্বরে রা করে; সেটাও কিন্তু ওই একচক্ষু হরিণেরই দশা। মধ্যম আয়ের দেশ হতে হলে অন্তত মধ্যম মানের প্রতিষ্ঠান, মধ্যম মানের বিচারব্যবস্থা ও মানবাধিকার এবং মধ্যম মানের বুদ্ধিজীবী দরকার হয়। দরকার হয় বৈশ্বিক মানের মধ্যম স্তরে উঠতে পারার মতো শিক্ষা।

মধ্যম আয়ের দেশ হতে হলে তিনটা জায়গায় অবশ্যই কঠোরভাবে মান বজায় রাখতে হবে। এই তিন জায়গা হলো– পণ্য, দেশ পরিচালনা ও রাজনীতি। অর্থাৎ পণ্যের মান যাচাই ব্যবস্থা ঠিকঠাক না হলে প্রতিযোগিতায় টেকা যাবে না। দেশ পরিচালনার ওপর রাজনীতি, গণমাধ্যম, বিচারব্যবস্থা এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যা সেই সংসদের নিষ্ঠাবান নজরদারি দরকার হবে। তৃতীয়ত, রাজনীতিতে ভারসাম্য থাকতে হবে এবং অসাধু লোকদের রাজনীতির মগডালে ওঠার পথ বন্ধ করতে হবে। এসব নাই, কিন্তু রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং দ্বিদলীয় কাবিলাযুদ্ধ তুমুল আকারেই আছে।

আমরা দেশ হিসেবে সফল হতে চাই, মাথা তুলে দাঁড়িয়ে থাকতে চাই। মাথা সোজা রাখতে হলে কোমরের জোর, অর্থাৎ অর্থনীতির তাকত থাকা চাই। আমরা নিম্নমধ্যম আয়ের দেশ থেকে সত্যিকার মধ্যম আয়ের দেশে যেতে চাই। মারাত্মক রকম চাই। কে হায় এই গরিবিকে আজকাল ভালোবেসে মহান বলবে? জীবন একটাই। সেই জীবনে আমাদের না হোক, আমাদের সন্তানদের একটা মধ্যম আয়ের দেশে বসবাসের ভরসা আসুক।

আমাদের দেশটা যে কত কত আশা আর স্বপ্নের কবরস্থান। বারবার আমাদের পড়তে হয় বাঁদরের তৈলাক্ত লাঠি বেয়ে উঠার পুরোনো গল্পের ফাঁদে। স্বাধীনতার দশকটা গেছে হানাহানি আর অভ্যুত্থান-পাল্টা অভ্যুত্থানে। আশির দশক গেল স্বৈরশাসনে। গণতান্ত্রিক নব্বইয়ের পরের দেড় দশক শত সমস্যার মধ্যেও সব দিকে বাংলাদেশ এগিয়েছিল। ২০১০-এর দশকে আরও এগিয়ে যাওয়া যাবে ভাবা হয়েছিল। কিন্তু এখন দেখা যাচ্ছে, অর্থনীতির কোমরে জোর কমছে– খরচ কমাতে বেল্ট টাইট করে পরতে হচ্ছে। সম্ভাব্য দুর্ভিক্ষের হুমকি আর আশঙ্কা দুটিই খবরের কাগজের শিরোনাম হচ্ছে। গণতন্ত্রকে বিসর্জন দিতে গিয়ে বলি করতে হচ্ছে রপ্তানি বাজারকে। আমাদের যে ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড বা সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের কর্মক্ষম থাকার সুবিধা, তাও আমরা পায়ে ঠেলছি।

শুধুই তোমার জন্য হে ‘সঠিক রাজনীতি হে বিপুল উন্নয়ন’ আমরা গরিবির হুমকির মুখে পড়ে যাচ্ছি। আমাদের আগামী প্রজন্মকে টানতে হবে আমাদের সময়ে করা ঋণের বিপুল বোঝা। আমরা তাদের জন্য রেখে যাচ্ছি আগের চেয়েও আরও খারাপ শিক্ষা ও স্বাস্থ্যব্যবস্থা। বলা হবে, সুযোগ কত বেড়েছে। অবশ্যই বেড়েছে। দরিদ্র দেশের জন্য দরকার শিক্ষার বিস্তার, মধ্যম আয়ের দেশের জন্য পরিমাণের চেয়ে মানের জরুরত বেশি।

সকল সফল দেশের গল্পে গণতন্ত্র থাকবেই। এমনকি চীনে একদলীয় ব্যবস্থা থাকলেও সেখানে নিচু থেকে শীর্ষব্যক্তি পর্যন্ত কেউই জবাবদিহির ঊর্ধ্বে নয়। তাদের কমিউনিস্ট পার্টি সেভাবেই গড়ে উঠেছে। আমাদের সাফল্যের গল্পে গণতন্ত্র ও সুষ্ঠু নির্বাচন এবং দ্বিদলীয় ভারসাম্য হলো অনিবার্য শর্ত। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ বিভিন্ন কারণে ব্যর্থ হয়েছে, আমরা ব্যর্থ হলে তা ঘটবে কেবল ক্ষমতায় থাকার গোঁয়ার্তুমির জন্য, রাজনৈতিক একচেটিয়াপনার জন্য। শেষ কথা এই, কবি জীবনানন্দ দাশের সেই ‘শঙ্খমালা’ হলো কোনো দেশের উন্নত হওয়ার সুযোগের মতো। ‘এ পৃথিবী একবার পায় তারে, পায়নাকো আর।’ পৃথিবীতে দ্বিতীয় সুযোগ খুবই বিরল। 

ফারুক ওয়াসিফ: লেখক এবং সমকালের পরিকল্পনা সম্পাদক
farukwasif0@gmail.com

আরও পড়ুন

×