ঢাকা সোমবার, ২০ মে ২০২৪

অন্যদৃষ্টি

খেলাধুলার সাফল্যের মেয়াদ

খেলাধুলার সাফল্যের মেয়াদ

.

ইফতেখারুল ইসলাম

প্রকাশ: ১৮ ডিসেম্বর ২০২৩ | ২৩:০৬

যুব এশিয়া কাপের ট্রফি মাথায় করে বাংলাদেশ অনূর্ধ্ব-১৯ দলের উল্লাস আমাদের মনে করিয়ে দেয় ১৯৯৭ সালের আইসিসি ট্রফি অর্জনের কথা। সেদিনও এমন উচ্ছ্বাস, এমন আত্মবিশ্বাস তরুণদের ভাসিয়ে নিয়ে গিয়েছিল। কিন্তু পরেই দেখা গেছে পরাজয়ের ধারা। আমাদের দেশে প্রতিভার অভাব হয় না। অভাব হয় তাদের যথাযথভাবে গড়ে তোলার পরিবেশ, প্রতিষ্ঠান ও নেতৃত্বের। 
আমাদের বেশ কিছু অর্জন অত্যন্ত গৌরবের।

গত রোববার দুবাই আন্তর্জাতিক ক্রিকেট স্টেডিয়ামে বাংলাদেশ অনূর্ধ্ব-১৯ যুব এশিয়া কাপের প্রথম শিরোপা অর্জন, গত বছর সাফ মহিলা চ্যাম্পিয়নশিপ লাভ ইত্যাদি তারই স্মারক বহন করে। এ ছাড়া দাবা থেকে শুরু করে ক্রিকেট, ফুটবল, কাবাডিসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রেও এ কথা একইভাবে প্রযোজ্য। ক্রিকেটের ক্ষেত্রে আইসিসি ট্রফি অর্জন দেশের জন্য খুবই গৌরবের ছিল। আশির দশকে পুরো উপমহাদেশে প্রথম গ্র্যান্ডমাস্টার হওয়ার গৌরব অর্জন করে বাংলাদেশ। যদিও ৩৪ বছর পরও মাত্র পাঁচজন গ্র্যান্ডমাস্টারে থমকে আছে। এ ছাড়া দেশের অন্যতম জনপ্রিয় খেলা ফুটবলের আন্তর্জাতিকভাবে প্রশংসনীয় কোনো অর্জন নেই। ক্রমশ খেলাটি জাতীয় ক্ষেত্রে উপেক্ষার শিকার হচ্ছে। খেলাধুলার জাতীয় প্রতিষ্ঠানগুলো ঝিমিয়ে পড়ছে। অ্যাথলেটিক, ব্যাডমিন্টন, বেসবল, বাস্কেটবল, বক্সিং, গলফ, সাইক্লিং, হকি, টেনিসসহ অন্যান্য খেলায় আমাদের অর্জন নেই বললেই চলে। এশিয়ান গেমস, অলিম্পিক গেমস, মিলিটারি ওয়ার্ল্ড গেমস, ইউরোপিয়ান গেমসে আমাদের সীমিত অর্জন পুরো দেশের দুরবস্থাকে তুলে ধরে। 

আশ্চর্যজনক হলেও সত্য, বাংলাদেশে যে কোনো ক্ষেত্রে কেউ সুনাম অর্জন করলেই রাজনীতির থাবা তাঁর ওপর পড়ে। সম্প্রতি আমরা দেখেছি জাতীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে প্রশংসিত দু’জন খেলোয়াড় রাজনীতির মাঠে নেমেছেন। এ ছাড়া একজন নামজাদা অভিনেতাও এবারের নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে যাচ্ছেন। এতে আমাদের মনে করার কোনো কারণ নেই– সাকিব আল হাসান, মাশরাফি বিন মুর্তজা কিংবা ফেরদৌস আহমেদ বিনোদন জগৎ কিংবা খেলাধুলায় দেশের মুখ আন্তর্জাতিকভাবে উজ্জ্বল করে ফেলবেন। খেলাধুলা নিয়ে গঠিত বিভিন্ন সংগঠন ও প্রতিষ্ঠান দুর্নীতি ও অপপরিচালনার শিকার হচ্ছে। ক্রিকেট বোর্ড থেকে শুরু করে প্রায় সবক’টি প্রতিষ্ঠানে যোগ্য লোকের পরিবর্তে পছন্দের লোকদের বসিয়ে দেওয়া হচ্ছে। বিসিবি কিংবা বাফুফে সভাপতি বা পরিচালকরা দলীয় রাজনীতিকে পুঁজি করে যেভাবে প্রতিষ্ঠানগুলোতে নেতৃত্ব দিচ্ছেন, তা খেলাধুলার ভবিষ্যৎকে আরও বেশি সংকটাপন্ন করে তুলছে। তাদের পাশাপাশি সম্ভাবনাময় খেলোয়াড়ও সেই রাজনীতির মাঠে নামছেন। এভাবে চলতে থাকলে খেলাধুলা তার নিজস্ব সৌন্দর্য হারিয়ে ফেলবে এবং জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পরিসরে দেশের চিত্র আরও বেশি কলুষিত হয়ে পড়বে। 

খেলাধুলাকে অনেকেই শুধু বিনোদন বলে বিবেচনা করেন। অথচ সমাজ ও রাষ্ট্রে এর বহুমাত্রিক দিক আছে। একটি জাতির বিশেষ চরিত্রও খেলাধুলায় নিহিত। সমাজ-সংস্কৃতির সঙ্গে খেলাধুলার সম্পর্ক বেশ গভীর। এ কারণে এতে ওই সমাজের জনগোষ্ঠীর সামাজিক ও রাজনৈতিক সত্তার পরিচয় উঠে আসে। খেলার প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি দেওয়ার মধ্য দিয়ে রাষ্ট্রের প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতাও উপলব্ধি করা যায়। 
তাই চিন্তাশীল রাজনীতিবিদ কিংবা দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের খেলাধুলার মাঠকে বিশুদ্ধ ও স্বচ্ছ রাখতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে হবে। খেলাকে রাজনৈতিক হাতিয়ার বানালে পরিশেষে দেশ ও দশেরই ক্ষতি। তাই জাতীয় ও আন্তর্জাতিক জীবনে দেশের মর্যাদা সমুন্নত করতে চাইলে আমাদের এমন কিছু কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে, যা খেলাধুলাকে প্রাতিষ্ঠানিক ও স্বাধীন ভিত্তি দেবে এবং সব ধরনের খেলোয়াড় নিজেদের উৎকর্ষের পাশাপাশি দেশের সুনাম চারদিকে ছড়িয়ে দেবেন।  

ইফতেখারুল ইসলাম: সহ-সম্পাদক, দৈনিক সমকাল 

আরও পড়ুন

×