ঢাকা বুধবার, ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৪

দক্ষিণ এশিয়ায় ভারতের প্রভাব

প্রতিবেশী

দক্ষিণ এশিয়ায় ভারতের প্রভাব

সি রাজা মোহন

সি রাজা মোহন

প্রকাশ: ৩০ ডিসেম্বর ২০২৩ | ০০:২৬

উপমহাদেশ কি ভারতের হাত থেকে ‘ফস্কে’ গেছে? এ অঞ্চলে (দিল্লির দৃষ্টিকোণ থেকে) ‘নেতিবাচক’ ঘটনাবলি ঘটার প্রেক্ষাপটে দক্ষিণ এশিয়া ‘হারানোর’ এই বিলাপ তীব্রতর হয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, দেশটি থেকে ভারতের সামরিক উপস্থিতি প্রত্যাহারে মালদ্বীপের সাম্প্রতিক দাবির কথা বলা যায়। দক্ষিণ এশিয়া বিষয়ে ভারতে বর্তমানে যে বিতর্ক চলছে, দুর্ভাগ্যজনকভাবে তা নিছক আবেগজাত, যেখানে নিজেরাই নিজেদের সেরা বলছে এবং পরিবর্তনশীল আঞ্চলিক বাস্তবতা থেকে বিচ্ছিন্ন। 

যুদ্ধবাদীরা বিস্মিত, প্রতিবেশী দেশগুলো এ অঞ্চলে ভারতের প্রাধান্যের ধারণাকে চ্যালেঞ্জ করার সাহস দেখাচ্ছে। অন্যদিকে শান্তিকামীরা মনে করে, প্রতিবেশী দেশগুলোর ভারতবিরোধী হওয়ার দায় পুরোপুরিই দিল্লির। প্রথম পক্ষ চায় দিল্লি আরও কঠোর হোক। দ্বিতীয় পক্ষ চায় দিল্লি যেন প্রতিবেশীদের সঙ্গে সুসম্পর্ক রাখে। ‘কঠোর’ কিংবা ‘সুসম্পর্ক নীতি’ কোনোটিই ভারতের আঞ্চলিক চ্যালেঞ্জগুলো দূর করবে না। কারণ এগুলো কাঠামোজাত। ভারতের সঙ্গে দক্ষিণ এশীয় দেশগুলোর এ অসংগতির মূলে রয়েছে বেশ কিছু অভ্যন্তরীণ, আঞ্চলিক ও বাহ্যিক কারণ। 

দক্ষিণ এশিয়ায় দিল্লি তার আধিপত্য হারাচ্ছে– এ মতের গোড়ায় আছে মূলত ব্রিটিশরাজের উত্তরাধিকার সম্পর্কিত ভারতীয়দের যৌথ নস্টালজিয়া। ব্রিটিশরাজই ভারতীয় উপমহাদেশকে একটি অখণ্ড ভূরাজনৈতিক সত্তায় পরিণত করে; কায়েম করে আঞ্চলিক আধিপত্য এবং আশপাশের ভূখণ্ডকে নিজেদের নিয়ন্ত্রিত ও বাফার রাষ্ট্রে পরিণত করে। তবে বহু আগেই ইংরেজরা ভারত ছেড়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে এই বাস্তবতার অবসান ঘটে। 

ধর্মের ভিত্তিতে উপমহাদেশের বিভক্তির মধ্য দিয়ে এর একতারও অবসান ঘটেছে। এর ফলে দুটি সার্বভৌম রাষ্ট্রের জন্ম হয়। একই সঙ্গে দুই দেশের মধ্যে তৈরি হয় অমীমাংসিত সীমানা ও এলাকা বিরোধ, যা এ অঞ্চলকে অব্যাহতভাবে ভোগাচ্ছে। আঞ্চলিক সহযোগিতার অমৃত বাণী এবং অভিন্ন ইতিহাস-ঐতিহ্যকেন্দ্রিক আবেদনও দেশভাগের এ তিক্ত ও অব্যাহত উত্তরাধিকারজনিত সমস্যার অবসান ঘটাতে পারছে না। কাশ্মীর ইস্যুকে পাকিস্তান দেশভাগের অসমাপ্ত বিষয় বলে মনে করে। দেশটি ভারতের সঙ্গে সীমিত তবে ইতিবাচক সম্পর্কের উন্নয়ন ঘটানো কিংবা সার্কের আওতায় দক্ষিণ এশিয়াভিত্তিক আঞ্চলিক সহযোগিতা জোরদার করার স্বার্থে কাশ্মীরের বিষয়টি সাময়িকভাবেও স্থগিত রাখতে চায় না। 

অর্থনৈতিকভাবে স্বাধীন হওয়ার লক্ষ্যে ভারত ও তার প্রতিবেশী দেশগুলো আলাদা উন্নয়ন কৌশল গ্রহণ করেছে। এর ফলে উপমহাদেশের রাজনৈতিক বিভাজন আরও চাঙ্গা হয়েছে। সীমান্তে অতিরিক্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থার কারণে আন্তঃদেশীয় বাণিজ্যিক লেনদেন বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। ১৯৯০-এর দশকের শুরু থেকে অঞ্চলটি বিশ্বায়নের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার পর এখানে আঞ্চলিক অর্থনৈতিক সহযোগিতা নিশ্চিতভাবে বেড়েছে। কিন্তু যে গতি ও মাত্রায় তা হওয়ার কথা ছিল তার চেয়ে এটা অবশ্যই কম। 

তবে পাকিস্তান এতটুকুও করতে রাজি নয়। দেশটি অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে ভারতকে সহযোগিতা করতে চায় না। দেশটির ভূঅর্থনীতিবিষয়ক আলোচনায় ভারতের সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্কের কথা নেই। নওয়াজ শরিফ প্রধানমন্ত্রী থাকাকালে এতে পরিবর্তনের পক্ষে কথা বলতেন। আসন্ন ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে তাঁর ফের প্রধানমন্ত্রী হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। পাকিস্তানের সেনাপ্রধান জেনারেল আসিম মুনির তাঁকে এ বিষয়ে আদৌ কাজ করতে দেবেন কিনা, তা এখনও নিশ্চিত নয়। 

দিল্লির প্রতি আঞ্চলিক প্রভাবশালী গোষ্ঠীগুলোর সমীহ দেখানোর বিষয়টি এসেছে ব্রিটিশরাজের হাত ধরে। তা মাত্র কয়েক বছর টিকেছিল। তুলনামূলক ছোট প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলো শিগগিরই বুঝতে পারে যে, স্বাধীন ভারত ও ব্রিটিশরাজ এক জিনিস নয়। ব্রিটিশরাজ ছিল বিশ্বের ক্ষমতাধর শক্তিরই একটা অংশ। তারা এটাও বুঝতে পারে, ভারতের পক্ষে বা বিপক্ষে প্রতিবেশী দেশগুলোর খেলার সুযোগ আছে। হয়তো ভৌগোলিকভাবে ভারত বিশাল হতে পারে, কিন্তু দিল্লি খুব সহজে পছন্দমতো তার নীতিগুলো প্রতিবেশী দেশগুলোর ওপর আরোপ করতে পারে না। দেশগুলোর নিজের মতো কিছু করার সামর্থ্য আছে। ভারত একদিকে যেমন তাদেরকে বশ্যতা স্বীকারে বাধ্য করতে পারে না, তেমনি পারে না অভিন্ন পরিচয় ও সংস্কৃতির মতো মিষ্টি মিষ্টি বুলি ছেড়ে তাদের সহমত পোষণ করাতে ।

দিল্লিতে ভারতের আঞ্চলিক লক্ষ্যগুলো বেশ সুন্দর শোনালেও প্রতিবেশী দেশগুলো এগুলো দেখে এ অঞ্চলে আধিপত্য প্রতিষ্ঠার গোপন হাতিয়ার হিসেবে। রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘ-আরএসএসের ‘অখণ্ড ভারত’ বা ‘বৃহৎ ভারত’ অথবা অখণ্ড উপমহাদেশ বিষয়ে উদার মত, উভয় নিয়েই তাদের গভীর সন্দেহ। এ ছাড়া প্রতিবেশী দেশগুলোর প্রভাবশালী মানুষেরাও ভারতের নেতৃত্বাধীন আঞ্চলিক ব্যবস্থাটি তাদের জাতীয় সার্বভৌমত্বের সঙ্গে মৌলিকভাবে বিরোধাত্মক বলে মনে করেন।

ভারতের চেয়ে অধিক ক্ষমতাধর আমেরিকার সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের ধরন নিয়ে ভারতের অভ্যন্তরীণ আলোচনা যেমন গোলমেলে; ভারত নিয়ে প্রতিবেশীদের আলোচনাও তেমনি পরাবাস্তব হয়ে দাঁড়ায়। ভারত বিশ্বের বৃহৎ জাতিগুলোর একটি। অথচ যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে একটি সাধারণ লজিস্টিক চুক্তিতে স্বাক্ষর করার জন্য তার এক দশকেরও বেশি সময় লেগেছে। তার এ সময় লেগেছে শুধু এটুকু বুঝতে– চুক্তির মধ্য দিয়ে ‘ওয়াশিংটনকে সামরিক ঘাঁটি স্থাপনের সুযোগ দেওয়া’ হবে না।  সুতরাং ভারতের সামরিক সহযোগিতা নিতে গিয়ে একটা ক্ষুদ্র দেশ মালদ্বীপ নিজেদের সার্বভৌমত্ব নিয়ে উদ্বিগ্ন হলে দেশটিকে আপনি আড়চোখে দেখবেন কেন?

ওরা চাক বা না চাক, প্রতিবেশী দেশগুলোর অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে ভারতের প্রভাব দিন দিন বাড়ছে। কোনো প্রতিবেশী দেশের প্রভাবশালী শ্রেণির দুই যুযুধান অংশের একটি যদি তাদের নিজেদের রাজনৈতিক সংগ্রামে ভারতকে শামিল হতে বলে, অন্য অংশটি ভারতের এহেন হস্তক্ষেপকে আধিপত্য হিসেবে দেখবে। আর যে অংশটি ভারতের সঙ্গে গ্রহণযোগ্য সম্পর্ক রাখতে চায়, তারা জাতীয় সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে ছাড় দিয়েছে বলে অভিযুক্ত হয়। 

এমনকি একই দল ও নেতা ভিন্ন ভিন্ন প্রেক্ষাপটে ভিন্ন অবস্থান গ্রহণ করতে পারেন। মনে করার চেষ্টা করুন, ইমরান খান ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির প্রতি তৎকালীন পাকিস্তানি প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফের উষ্ণতার অভিযোগ তুলে নওয়াজকে আক্রমণ করেছিলেন। ২০১৮ সালে ইমরান খানের নির্বাচনী স্লোগান ছিল, ‘যিনি মোদির বন্ধু, তিনি পাকিস্তানের শত্রু।’ কিন্তু প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ইমরান তাঁর কণ্ঠস্বর কিছুটা পরিবর্তন করেন। ২০১৯ সালে ভারতের সাধারণ নির্বাচনকালে ইমরান খান বলেছিলেন, কাশ্মীর প্রশ্নের সমাধানে মোদি পাকিস্তানের জন্য সবচেয়ে বড় বাজি এবং তিনি ফের নির্বাচিত হবেন বলে ইমরান আশা করেছিলেন। তবে পুলওয়ামায় সন্ত্রাসী আক্রমণ ও বালাকোটে ভারতের পাল্টা হামলায় সেই আশা ভঙ্গ হয়েছিল। 

আমার চূড়ান্ত মত, উপমহাদেশে ব্রিটিশরাজের মতো ভারতেরও একটা বিশেষ প্রভাব আছে– এমন ধারণা একটা বিভ্রম। বিভক্ত ভারত কখনও ব্রিটিশরাজের সমান ক্ষমতা রাখে না; তাই পুরোনো ব্যবস্থা টিকিয়ে রাখার ক্ষমতা তার নেই। ভারতের সঙ্গে পাল্লা দিতে গিয়ে পাকিস্তান যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের দিকে ঝুঁকেছে। আফগানিস্তানে সোভিয়েত ইউনিয়নের হস্তক্ষেপ উপমহাদেশের উত্তর-পশ্চিম অংশকে পাশ্চাত্য, মধ্যপ্রাচ্যের রাষ্ট্রগুলো এবং রাশিয়া ও চীনের ছায়াযুদ্ধের ক্ষেত্রে পরিণত করেছে। ওই যুদ্ধের পরিণামে পাকিস্তান ও আফগানিস্তান সীমান্তে তীব্র নৈরাজ্যের সৃষ্টি হয়েছে, যা উপমহাদেশের ভূরাজনীতির দৃশ্যপটই বদলে দিয়েছে। 

উপমহাদেশে চীনের অর্থনৈতিক ও সামরিক প্রভাবের নাটকীয় বিস্তার নিয়ে ভারতের উদ্বেগ যথাযথ। কিন্তু বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনৈতিক ও সামরিক শক্তির দেশটিকে এই অঞ্চলে শক্তিশালী খেলোয়াড় হওয়া থেকে বিরত রাখতে ভারত পারে না। উপমহাদেশে পাশ্চাত্যের উপস্থিতি ক্রমশ কমে যাচ্ছে। ফলে দক্ষিণ এশিয়ার অর্থনৈতিক, সামরিক ও প্রযুক্তি ক্ষেত্রে চীনের কৌশলগত উপস্থিতি সামনের দিনগুলোতে বৃদ্ধি পাবে। এটাও ঠিক, তা ভারতের জন্য শক্তিশালী চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াচ্ছে। 

তবে দক্ষিণ এশিয়ায় বহিরাগত শক্তি হিসেবে কেবল চীনই ক্ষমতাশালী হচ্ছে, তা নয়। মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর মধ্যে কাতার, সৌদি আরব, তুরস্ক ও দুবাই যতটা অর্থনৈতিক ও সামরিক সক্ষমতা অর্জন করছে, ততটাই তাদের প্রভাব এ অঞ্চলে পড়ছে। এমনকি একদিকে উপমহাদেশের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক উল্লেখযোগ্যভাবে পরিবর্তিত হচ্ছে, অন্যদিকে এর সীমান্তবর্তী দু’দেশ বেশ চাপের মুখোমুখি। পশ্চিমে তালেবান ও পাকিস্তান সেনাবাহিনীর মধ্যকার সংঘর্ষ দিন দিন তীব্র হয়ে উঠছে। আবার পূর্বদিকে মিয়ানমারের সশস্ত্র নৃগোষ্ঠী ও গণতন্ত্রপন্থি শক্তিগুলো একতাবদ্ধ হয়ে বার্মিজ সেনাবাহিনীর হাত থেকে দেশটির উত্তরাঞ্চল মুক্ত করতে চলেছে। 

এ বিষয়গুলো একসঙ্গে বিবেচনা করে বলা যায়, বিশ শতকের মাঝামাঝিতে আমরা যে উপমহাদেশ পেয়েছিলাম, তা থেকে বর্তমান উপমহাদেশ বহুলাংশেই ভিন্ন। কোনো অঞ্চলই স্থির কোনো সত্তা নয়। তাদের ভৌগোলিক পরিস্থিতি, রাজনৈতিক কাঠামো ও অর্থনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি সময়ের সঙ্গে পাল্টায়। ‘দক্ষিণ এশিয়া’ এ ক্ষেত্রে কোনো ব্যতিক্রম হতে পারে না। 
কাজেই জরুরি প্রশ্ন এটা নয় যে, ভারতের হাত থেকে ‘দক্ষিণ এশিয়া ফস্কে যাচ্ছে’। বরং পরিবর্তনশীল একটা অঞ্চলে কীভাবে শক্তি অর্জন করা যায়, সে পথ খোঁজাই জরুরি। শুধু নিজের স্বার্থ রক্ষা নয়; প্রতিবেশী দেশগুলোর ওপর প্রভাব বিস্তারেও ভারতের যথেষ্ট সামর্থ্য আছে। তবে এই কাজটি কার্যকরভাবে করতে হলে দিল্লিকে অবশ্যই দক্ষিণ এশিয়া নিয়ে তার পুরোনো বদ্ধমূল ধারণা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে।    

সি রাজা মোহন: দিল্লির এশিয়া সোসাইটি পলিসি ইনস্টিটিউটের সিনিয়র ফেলো; দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস থেকে ভাষান্তর করেছেন ইফতেখারুল ইসলাম

আরও পড়ুন

×