ঢাকা বুধবার, ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৪

সংসদ সদস্যদের মূল কাজ আসলে কী?

রাজনীতি

সংসদ সদস্যদের মূল কাজ আসলে কী?

ইলাস্ট্রেশন

আবু তাহের খান

প্রকাশ: ১৯ জানুয়ারি ২০২৪ | ১১:৫৭

৩০ জানুয়ারি শুরু হচ্ছে দ্বাদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশন। কিন্তু দেশের দুটি প্রধান রাজনৈতিক দলের একটিকে বাইরে রেখে গঠিত এ সংসদ কেমন চলবে– সেটি খুবই স্বাভাবিক প্রশ্ন। ৭ জানুয়ারির নির্বাচনকে যেমন বলা হয়েছে সংবিধানের ধারাবাহিকতা রক্ষার নির্বাচন; এ অধিবেশনকেও তেমনি বলা যায় সংসদের আনুষ্ঠানিকতা রক্ষার অধিবেশন। ফলে সংসদের আসন্ন অধিবেশন কেমন হবে বা একে নিয়ে তেমন কোনো প্রত্যাশা রয়েছে কিনা, সে বিষয়ে আলোচনা করার চেয়ে বরং বাংলাদেশের বিগত ১১টি সংসদের কাজের চরিত্র ও বৈশিষ্ট্য কেমন ছিল, তা নিয়ে কথা বলা যেতে পারে। সংসদীয় সরকার ব্যবস্থার চেতনা ও জনঅংশীদারিত্বের বিষয়কে এ দেশের রাজনীতিকরা কতটা ধারণ করতে পেরেছেন, সেটা দেখাও আমাদের বিষয়। 

১৯৭০ সালে পাকিস্তান জাতীয় পরিষদ ও পূর্ব পাকিস্তান প্রাদেশিক পরিষদ মিলে পূর্ব পাকিস্তান অংশের আসন সংখ্যা ছিল ৪৬৯টি। ওই আসনগুলোতে বিজয়ীদের মধ্যে প্রয়াত, অনুপযুক্ত ঘোষিত, পাকিস্তানে থেকে যাওয়া দু’জন ও অন্যান্য কারণে অন্তর্ভুক্তিহীন সদস্য  বাদে অবশিষ্ট ৪০৪ জনকে নিয়ে ১৯৭২ সালের ১০ এপ্রিল গঠিত বাংলাদেশ গণপরিষদই বস্তুত এ দেশের প্রথম জাতীয় সংসদ। তবে সেটি ছিল একটি সম্পূর্ণ অস্থায়ী ও অন্তর্বর্তীকালীন সংসদ, যার মূল কাজ ছিল দেশের জন্য একটি সংবিধান প্রণয়ন করা। সে অনুযায়ী প্রণীত সংবিধান ওই বছরের ৪ নভেম্বর গণপরিষদ কর্তৃক অনুমোদিত হয়, যা কার্যকর হয় একই বছরের ১৬ ডিসেম্বর। ওই সংবিধান অনুযায়ী প্রথম জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় ১৯৭৩ সালের ৭ মার্চ এবং নির্বাচিত সংসদের প্রথম অধিবেশন বসে ৭ এপ্রিল। অতএব দেখা যাচ্ছে, ১৯৭২ সালের ১০ এপ্রিল থেকে ১৯৭৫ সালের ২৫ জানুয়ারি সংবিধানের চতুর্থ সংশোধনী গৃহীত হওয়ার আগ পর্যন্ত মাত্র ২ বছর ৯ মাসের জন্য দেশে সংসদীয় সরকার ব্যবস্থা চালু ছিল।

পরে ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট থেকে ১৯৯১ সালের ৫ এপ্রিল ষষ্ঠ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশন শুরু হওয়ার আগ পর্যন্ত মধ্যবর্তী ১৫ বছর (১৯৯০-১৯৯১ সময়ের অন্তর্বর্তীকালীন সরকার বাদে) দেশ ছিল বস্তুত সামরিক শাসনাধীন। ফলে ওই ১৫ বছরের কিছু সময় দেশে জাতীয় সংসদ থাকলেও সেটির বস্তুত কোনো কার্যকারিতা ছিল না। এই পটভূমিতে ১৯৯০ সালে তিন রাজনৈতিক জোটের যৌথ নেতৃত্বে দেশ সামরিক শাসন থেকে সংসদীয় সরকার ব্যবস্থার পথে যাত্রা শুরু করলে জাতীয় সংসদের পক্ষে দেশের সবচেয়ে শক্তিশালী ও আদর্শস্থানীয় একটি প্রতিষ্ঠান হিসেবে আবির্ভূত হওয়ার উজ্জ্বল সম্ভাবনা দেখা দিয়েছিল। কিন্তু রাজনীতিকদের অদূরদর্শিতা, চিন্তার সংকীর্ণতা ও অগভীরতা এবং দেশ ও দেশের মানুষের প্রতি তাদের পর্যাপ্ত মমত্ববোধের অভাবের কারণে অল্প সময়ের মধ্যেই সে সম্ভাবনা ক্ষীণ হতে শুরু করে। তারপরও পঞ্চম ও সপ্তম সংসদজুড়ে (ষষ্ঠ সংসদের কোনো কার্যকারিতা ছিল না) টিকে থাকলেও অষ্টম সংসদ থেকেই এর অধঃপতন শুরু হয়; আজও যা নিম্নমুখী ধারায় অব্যাহত। সেই অধঃপতনের সর্বশেষ চিত্র হচ্ছে সংসদের মোট কার্যসময়ের মাত্র ১৭ শতাংশ আইন প্রণয়নের কাজে ব্যয় হওয়া। (পার্লামেন্ট ওয়াচ, ১-২২ অধিবেশন: জানুয়ারি ২০১৯ থেকে এপ্রিল ২০২৩, ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি), ১ অক্টোবর ২০২৩)

জাতীয় সংসদের কার্যক্রমের ওপর টিআইবির উল্লিখিত পর্যবেক্ষণ সাময়িকী ‘পার্লামেন্ট ওয়াচ’-এর ওই সংখ্যার তথ্য অনুযায়ী একাদশ জাতীয় সংসদের মোট কার্যঘণ্টার মাত্র ১৬ দশমিক ৭ শতাংশ সময় ব্যয় হয়েছে আইন প্রণয়নের কাজে, যে হার ব্রিটিশ পার্লামেন্টের ক্ষেত্রে ৪৯ দশমিক ৩ ও ভারতীয় লোকসভার ক্ষেত্রে ৪৫ শতাংশ। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, সংসদীয় সরকার ব্যবস্থায় একটি রাষ্ট্রের জাতীয় সংসদ যদি তার মোট কার্যঘণ্টার ৮৩ শতাংশেরও বেশি সময় আইন প্রণয়নবহির্ভূত অন্যান্য কাজে ব্যয় করে, তাহলে সে সংসদ কি নিছক একটি আলংকারিক প্রতিষ্ঠান হয়ে দাঁড়ায় না? এর চেয়েও বড় কথা, অসংসদীয় কাজগুলো বাংলাদেশের জাতীয় সংসদ গত ৫২ বছর ধরেই করে আসছে, যেগুলো সম্পাদনের জন্য রাষ্ট্রের সুনির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠান রয়েছে। অর্থাৎ অন্য প্রতিষ্ঠানের কাজ কেড়ে নিয়ে বা ওইসব প্রতিষ্ঠানকে অকার্যকর করে রেখে জাতীয় সংসদ এখতিয়ারবহির্ভূতভাবে এ কাজগুলো সম্পাদন করে চলেছে। রাষ্ট্রবিজ্ঞানের পরিভাষায় এটিকে বলা যেতে পারে কর্তৃত্ববাদ। যেটি একদিকে যেমন ক্ষমতার অপব্যবহার ও স্বেচ্ছাচারিতা, অন্যদিকে রাষ্ট্রের অপরাপর প্রতিষ্ঠানকে দায়িত্ব পালন করতে না দেওয়ারও শামিল। তদুপরি এটি সম্পদেরও অপচয়। আর সেই অপচয় একদিকে যেমন সংসদের আওতায় হচ্ছে, অন্যদিকে ওইসব প্রতিষ্ঠানের আওতায় দায়িত্বরতদেরও অকার্যকর করে রাখা হচ্ছে।

টিআইবির দেওয়া হিসাব অনুযায়ী, সংসদ পরিচালনার প্রতি মিনিটে ব্যয়ের পরিমাণ ২ লাখ ৭২ হাজার টাকা। সে হিসাবে সংসদে মোট ব্যয়ের ৮৩ শতাংশ সময় আইনপ্রণয়নবহির্ভূত কাজে ব্যয় হয়ে থাকে। উল্লিখিত ৮৩ শতাংশের সবটাই হয়তো অপচয় নয়। কিন্তু এর একটি বড় অংশ যে অপচয়মূলক, তাতে বিন্দুমাত্র সন্দেহ নেই। তাহলে একবার শুধু ভেবে দেখুন, অপচয়ের মাত্রা কত বড়! অন্যদিকে যেসব প্রতিষ্ঠানকে অকার্যকর করে রেখে সংসদের এসব অপচয়মূলক ব্যয় নির্বাহ করা হচ্ছে, সেসব প্রতিষ্ঠানও কিন্তু এ কাজগুলো সম্পন্ন না করে ব্যয়গুলো ঠিকই করে যাচ্ছে। ফলে সেসব প্রতিষ্ঠানের কর্মবিহীন ব্যয়কে অপচয় ছাড়া আর কিছু বলার উপায় আছে কি? অপচয়মূলক এ অর্থ জনগণের অতি কষ্টার্জিত করের পয়সা থেকেই মেটানো হচ্ছে। এর চেয়েও বড় কথা, কাজটি হচ্ছে তাদের দ্বারা, যাদের রাষ্ট্র ও জনগণকে আইন ও সিদ্ধান্ত প্রণয়নের মাধ্যমে এ ধরনের ক্ষতি ও অপচয় থেকে সুরক্ষা দেওয়ার কথা।

গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধানের ৬৫(১) অনুচ্ছেদে বলা আছে– “‘জাতীয় সংসদ’ নামে বাংলাদেশের একটি সংসদ থাকিবে এবং এই সংবিধানের বিধানাবলী-সাপেক্ষে প্রজাতন্ত্রের আইনপ্রণয়ন-ক্ষমতা সংসদের উপর ন্যস্ত হইবে।” পৃথিবীতে বর্তমানে যেসব রাষ্ট্রে এ ধরনের সংসদ রয়েছে, বস্তুত সেগুলোর কাজ মোটামুটি একই। অর্থাৎ আইন প্রণয়ন। বাংলাদেশের জাতীয় সংসদও ১৯৭২ সালে বস্তুত সেভাবেই তার যাত্রা শুরু করেছিল। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য, অল্প সময়ের মধ্যেই সে সংসদ তার মৌলিক চরিত্র হারাতে শুরু করে। চারিত্রিক স্খলনের সে ধারা এখন শুধু অব্যাহতই নেই, প্রচণ্ডভাবে বেগবান।

জাতীয় সংসদ এখন তার মূল ভূমিকা বিসর্জন দিয়ে এমন একাধিক নতুন ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছে, যার সঙ্গে কিছুটা মিল রয়েছে স্থানীয় সরকারের। এর বেশির ভাগই সুযোগসন্ধানী ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ড। এ রকম একটি জাতীয় সংসদকে পাথেয় করে যে রাষ্ট্রের পথচলা, সে রাষ্ট্রের পক্ষে সত্যিই কি কখনও নিজ দেশকে একটি শক্তিশালী, গণতান্ত্রিক, প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি দেওয়া সম্ভব?
বাংলাদেশের সংবিধানে বলা আছে– ‘আইনানুযায়ী নির্বাচিত ব্যক্তিদের সমন্বয়ে গঠিত প্রতিষ্ঠানসমূহের উপর প্রজাতন্ত্রের প্রত্যেক প্রশাসনিক একাংশের স্থানীয় শাসনের ভার প্রদান করা হইবে।’

(সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৫৯.১)। এর মানে দাঁড়ায়, রাষ্ট্রের প্রশাসনিক কার্যক্রম পরিচালনার জন্য একাধিক স্তর ও অংশ থাকবে, যেগুলো নির্বাচিত ব্যক্তিদের দ্বারা পরিচালিত হবে। কিন্তু স্বাধীনতার পর থেকে অদ্যাবধি সেসব কাজের সিংহভাগই পরিচালিত হচ্ছে রাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় আমলাতন্ত্রের দ্বারা এবং খানিকটা জাতীয় সংসদের আওতায়। সংবিধানে উল্লিখিত স্থানীয় সরকার সেখানে শিখণ্ডী মাত্র। বস্তুত সে কারণেই দীর্ঘ ৫২ বছর পরও বাংলাদেশের স্থানীয় সরকার ব্যবস্থা একই রকম শক্তি ও সম্পদহীন, পরনির্ভর, নামসর্বস্ব প্রতিষ্ঠান হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে। এর মাধ্যমে জাতীয় সংসদ তার নিজ দায়িত্ব পালন থেকে সরে এসে দেশ ও রাষ্ট্রকে বহুলাংশে পিছিয়ে দিচ্ছে।

সংবিধানের নির্দেশনা অনুযায়ী উল্লিখিত স্থানীয় সরকারের ওপর ভিত্তি করেই মূলত রাষ্ট্রের অধিকাংশ পরিচালন কার্যক্রম (স্কুল, কলেজ, হাসপাতাল, কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ইত্যাদি পরিচালনা) এবং উন্নয়ন উদ্যোগ (রাস্তাঘাট, সেতু ইত্যাদি নির্মাণ) বাস্তবায়িত হওয়ার কথা। কিন্তু দেশের স্থানীয় সরকার ব্যবস্থা বর্তমানে যে তিনটি স্তরে বিভক্ত, তার কোনোটিই এখন পর্যন্ত এসবের পূর্ণাঙ্গ দায়িত্বের সঙ্গে জড়িত নয় বা খুবই দায়সারা।

আবার কোথাও কোথাও তাদের একেবারেই সংশ্লিষ্টতা নেই। স্থানীয় পর্যায়ের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পরিচালনা পর্ষদের সভাপতির দায়িত্ব পালন থেকে শুরু করে এলাকার অবকাঠামো উন্নয়নে সংসদে দাঁড়িয়ে নতুন প্রকল্পের দাবি উত্থাপন, প্রকল্প বাস্তবায়নে যুক্ত থাকা ইত্যাদি কার্যক্রমে সংসদ সদস্য এতটাই সংশ্লিষ্ট যে, তিনি স্থানীয় সরকারের প্রতিনিধি, নাকি আইন প্রণয়নের দায়িত্বে নিয়োজিত জাতীয় সংসদের সদস্য– তা বুঝে ওঠা কষ্টকর।

আবু তাহের খান: গবেষক ও প্রাবন্ধিক

আরও পড়ুন

×