একাধিকবার সরকার পরিচালনাকারী দল বিএনপির বর্তমান অবস্থা নিয়ে রাজনৈতিক পর্যবেক্ষক মহলে ঔৎসুক্যের অন্ত নেই। দেশের অন্যতম বৃহৎ এ রাজনৈতিক দলটির এখন যে ক্ষয়িষুষ্ণ অবস্থা, তা নিয়েও সর্বত্র আলোচনা। দলটির সচেতন নেতাকর্মীরা হতাশ দলের হাইকমান্ডের নেওয়া কতিপয় সিদ্ধান্তে। তারা ওইসব সিদ্ধান্তকে অশনিসংকেত হিসেবে দেখছেন। বিএনপি এখন রয়েছে ত্রিশঙ্কু অবস্থায়। একদিকে চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে সুচিকিৎসার জন্য বিদেশে পাঠাতে সরকারকে রাজি করাতে পারছে না; অন্যদিকে সাংগঠনিক শক্তি বৃদ্ধির জন্য জেলা কমিটি পুনর্গঠন করতে গিয়ে পাকিয়ে ফেলছে তালগোল। ফলে সাংগঠনিক বিশৃঙ্খলা দেখা দিচ্ছে বিভিন্ন জেলায়। আর এই তিন সংকট দলটিকে একেবারে চেপে ধরেছে বলা যায়। এসব সংকট মোকাবিলা করে বিএনপি স্বাভাবিক রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে অদৌ ফিরে আসতে পারবে কিনা- এ এক অন্তহীন প্রশ্ন।

প্রায় দেড় দশক ধরে রাষ্ট্রক্ষমতার বাইরে রয়েছে বিএনপি। ২০০৭ সালের জরুরি অবস্থার সিডরে যে ঝাঁকুনি তারা খেয়েছে, এখনও সে ধাক্কা সামলে উঠতে পারেনি। এলোমেলো হয়ে যাওয়া বিএনপিকে গুছিয়ে পুনরায় সতেজ করার উদ্যোগ বেশ কয়েকবার নেওয়া হলেও কোনো উদ্যোগ শেষ পর্যন্ত সফল হয়নি। একাধিকবার সাংগঠনিক টিম বানিয়ে নেতাদের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে অগোছালো দলকে গুছিয়ে শৃঙ্খলার মধ্যে আনার জন্য। ৭৫টি সাংগঠনিক জেলার জন্য গঠিত ওইসব টিম তাদের ওপর অর্পিত দায়িত্ব সফলভাবে পালন করতে পারেনি। নেতাকর্মীদের মধ্যে দ্বন্দ্ব-কোন্দল এতটাই প্রকট, কোথাও কোথাও কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দ হেনস্তা হয়ে ফিরে এসেছেন। আবার স্থানীয় কোন্দল এড়াতে ঢাকায় কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে নেতাকর্মীদের ডেকে এনেও সুফল পাওয়া যায়নি। সেখানেও দুই বা ততোধিক গ্রুপ হাতাহাতি-সংঘর্ষে লিপ্ত হয়ে ভণ্ডুল করে দিয়েছে বৈঠক। বিএনপি যে এখন চরম দুঃসময় পার করছে- এ বিষয়ে দ্বিমত প্রকাশের অবকাশ নেই। একদিকে সরকারের নানামুখী চাপের কারণে এমনিতেই নাজুক অবস্থায় রয়েছে দলটি। অন্যদিকে দলীয় নেত্রীর কারাবাস এবং লিভার সিরোসিসে আক্রান্ত হওয়ার খবর দলটির নেতাকর্মীদের মনে হতাশার মেঘ জড়ো করেছে। এরই মধ্যে কেন্দ্র থেকে তৃণমূল পর্যন্ত নানা উপদলীয় কোন্দল রূপ নিয়েছে গোদের ওপর বিষফোড়ায়। সবচেয়ে বিস্ময়কর ব্যাপার হলো, যে মুহূর্তে দলটির নেতাকর্মীদের সব রকম দ্বন্দ্ব-কোন্দল ঝেড়ে ফেলে ঐক্যবদ্ধ হওয়া প্রয়োজন, তখন দেখা যাচ্ছে প্রায় সর্বত্র বিভক্তি আরও বাড়ছে। দলে আধিপত্য বিস্তার এবং নিজস্ব বলয় সৃষ্টির অভিপ্রায়ে স্থানীয় নেতাদের মধ্যে বিদ্যমান কোন্দল-রেষারেষি দিন দিন প্রকট হচ্ছে।

আগামী দিনের 'আন্দোলন সংগ্রাম'-এর জন্য দলকে প্রস্তুত করতে সাংগঠনিক পুনর্গঠনের কথা বেশ কিছুদিন ধরেই বিএনপির শীর্ষ নেতারা বলে আসছিলেন। দলটির সমর্থক শুভানুধ্যায়ীরাও মনে করেন, নির্জীব হয়ে পড়া বিএনপিকে চাঙ্গা করতে সাংগঠনিক পুনর্বিন্যাস প্রয়োজন। কিন্তু সেই পুনর্বিন্যাস বা পুনর্গঠন করতে গিয়ে সৃষ্টি করা হচ্ছে নতুন সমস্যা। যার বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে বরিশাল, খুলনা, রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও বগুড়ার কমিটি নিয়ে গৃহীত পদক্ষেপে। তারা এটা বুঝতে পারছেন না- কোন কারণে বা যুক্তিতে বরিশাল বিএনপির কাণ্ডারি হিসেবে পরিচিত নেতা মজিবর রহমান সরোয়ারকে মহানগর সভাপতির পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। অপরদিকে কর্মীবান্ধব ও লড়াকু নেতা হিসেবে সুপরিচিত খুলনা মহানগর বিএনপি সভাপতি নজরুল ইসলাম মঞ্জুকেও বাদ দেওয়া হয়েছে তার পদ থেকে। শুধু তাই নয়, দলীয় এ সিদ্ধান্তের প্রতিবাদ করায় শৃঙ্খলা ভঙ্গের অভিযোগে মঞ্জুকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে জাতীয় নির্বাহী কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদকের পদ থেকেও। সরিয়ে দেওয়া হয়েছে রাজশাহীর তৃণমূল কর্মীদের পথের সাথী হিসেবে সুপরিচিত নেতা সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র মোসাদ্দেক হোসেন বুলবুলকেও। অন্যদিকে রাজশাহী জেলা বিএনপি সভাপতি ও সংসদ সদস্য হারুনুর রশিদ এবং বগুড়া জেলা বিএনপি সভাপতি জিএম সিরাজ এমপিকেও স্ব স্ব পদ থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। এদের কার কী অপরাধ তা জানা না গেলেও জিএম সিরাজের 'অপরাধটা' জানা গেছে। গণস্বাস্থ্য হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরীকে দেখতে যাওয়ার কারণেই তার এ পদচ্যুতি- এ খবর সংবাদপত্রে বেরিয়েছে। রাজনীতি সচেতন ব্যক্তিরা বলছেন, বিএনপির শীর্ষ নেতারা দেশে গণতন্ত্র ফিরিয়ে আনার জন্য অহর্নিশ গলা ফাটাচ্ছেন। কিন্তু উপরোক্ত সিদ্ধান্তগুলো গ্রহণের ক্ষেত্রে তারা কোন গণতান্ত্রিক ফর্মুলা ব্যবহার করেছেন- এ প্রশ্ন এড়িয়ে যাওয়ার উপায় নেই। যদি এক ব্যক্তির ইচ্ছা-অনিচ্ছাকে তারা গণতন্ত্রের চর্চা বলে চালিয়ে দিতে চান, তাহলে সেটা হবে এক মহা আত্মপ্রবঞ্চনা। ওই সিদ্ধান্তগুলো দলটির নেতাকর্মীরা ভালোভাবে নেয়নি। অবশ্য বাদ দেওয়া নেতাদের প্রতিপক্ষ এতে খুশি হলেও সাধারণ নেতাকর্মীর মনে অসন্তোষ সৃষ্টি হয়েছে। এ প্রসঙ্গে ২৮ ডিসেম্বরের সমকালে 'আঞ্চলিক প্রভাবশালীদের বাদ দিয়ে হাইকমান্ড তোপে' শীর্ষক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এ ঘটনায় দীর্ঘদিন ধরে ওইসব জেলা ও মহানগর কমিটিতে একচ্ছত্র অধিপত্য বিস্তারকারী নেতাদের অনুসারীরা কিংকর্তব্যবিমূঢ় ও বিক্ষুব্ধ হয়ে পড়েছেন। কেন্দ্রের এমন সিদ্ধান্তে গণহারে পদত্যাগের পাশাপাশি নিস্ক্রিয়দের পাল্লা ভারি হতে পারে।

সংবাদমাধ্যমে খবর বেরিয়েছে, খুলনা বিএনপির রাজনীতিতে সাবেক দুই ছাত্রদল নেতাকে লাইম লাইটে আনার অভিপ্রায়েই নজরুল ইসলাম মঞ্জুর পদচ্যুতি। ওই দু'জনের একজন ছাত্রদলের সাবেক সভাপতি, অন্যজন দলের বর্তমান ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের এক সময়ের পিএস। তারা তাদের লন্ডন কানেকশনের শক্তি কাজে লাগিয়ে মঞ্জুর মতো শক্তিশালী বৃক্ষকে সহজেই উপড়ে ফেলতে সক্ষম হয়েছেন। তবে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এসব অভিযোগ মানতে নারাজ। তিনি এসব পরিবর্তনকে দলের চলমান পুনর্গঠন প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে অভিহিত করে বলেছেন, যেসব জেলায় কমিটি মেয়াদোত্তীর্ণ, সেখানে কাজ চলছে। নতুন কমিটি হচ্ছে। এ বিষয়ে রাজনীতি-অভিজ্ঞ ব্যক্তিরা পোষণ করছেন ভিন্নমত। তাদের প্রশ্ন- দলের গতিশীলতার জন্য যদি পরিবর্তন আনা হয়ে থাকে তাহলে বাদ দেওয়া নেতাদের অনুসারীদেরও কেন নতুন কমিটিতে স্থান দেওয়া হলো না? এভাবে ব্যক্তিবিশেষের পছন্দের লোকদের নেতৃত্বে আনার জন্য যদি ত্যাগী নেতা ও তাদের অনুসারীদের কমিটি থেকে বাদ দেওয়া হয়, তাহলে এ দলে এক সময় যোগ্য নেতৃত্বের সংকট দেখা দেবে।

সাম্প্রতিক এসব সিদ্ধান্তকে আর যাই হোক গণতান্ত্রিক বলার উপায় নেই। এভাবে ওপর থেকে চাপিয়ে দেওয়া সিদ্ধান্ত নেতাকর্মীরা সবসময় মানবে না। ফলে এর নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া দলটিতে পড়বেই। অনেকেই মনে করেন, বিএনপি এখন নেতৃত্বশূন্যতায় ভুগছে। এই শূন্যতাকে আরও প্রকট করে তুলতে পারে এ ধরনের অপরিণামদর্শী সিদ্ধান্ত। কিন্তু দলটির চালকের আসনে যিনি বা যারা রয়েছেন, তারা তা সম্যক উপলব্ধি করতে পারছেন কিনা- বড় প্রশ্ন সেটাই।

মহিউদ্দিন খান মোহন: সাংবাদিক ও রাজনীতি বিশ্নেষক