কয়েক দিন আগে বউ-বাচ্চাসহ মিরপুর ডিওএইচএসের বোনের বাসা থেকে ফিরছি। রাত ১২টা পার হয়ে গিয়েছিল। কালশী, ইসিবি চত্বর, ফ্লাইওভার হয়ে এয়ারপোর্ট রোডে পড়ার পর আতঙ্কিত হলাম এই রুট ধরে ফেরার কারণে। আমাদের ছোট্ট গাড়িটির ডান-বাম দিয়ে লেটেস্ট মডেলের কার, জিপ সাঁই সাঁই করে ছুটে যাচ্ছে। গাড়িগুলোর বেপরোয়া গতির ফলে কাঁপছে রাস্তা। মনে হচ্ছে, ফ্লাইওভার ভেঙে পড়ছে। ভাবছি, কোনো গাড়ির সঙ্গে একটু লাগলেই ঘটে যাবে দুর্ঘটনা। বুকের স্পন্দন বেড়ে যাচ্ছে। প্রহর গুনছি, কখন শেষ হবে এ তাণ্ডব!
ঢাকা শহরে বিশেষত রাতের বেলা হাইস্পিডের গাড়িগুলো ভয়ানক বিপদের কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে। মনে পড়ছে, ২০১৭ সালের জানুয়ারি মাসের কোনো এক রাতে একটি দৈনিক পত্রিকার এক ফটো জার্নালিস্টকে পান্থপথে বেপরোয়া গতির একটি গাড়ি চাপা দেয়। আর এই তো সেদিন ২৩ নভেম্বর ভোর ৫টার দিকে একটি গাড়ি মহাখালী ফ্লাইওভারের পিলারের সঙ্গে ধাক্কা খেলে দু'জন নিহত ও কয়েকজন আহত হন। বেপরোয়া ড্রাইভিংয়ে রাস্তার ডিভাইডার ও ফুটপাত ভেঙে যায়; বিনা মেঘে বজ্রপাতের মতো পথচারী ও রাস্তার আশপাশে থাকা ব্যক্তিরা প্রাণ হারায়; জানমালের ক্ষয়ক্ষতির তালিকা প্রতিনিয়ত বড় হতে থাকে। এ ধরনের দুর্ঘটনা প্রায়শ ঘটছে। রাতের বেলা রাজধানীর ফাঁকা রাস্তায় বেপরোয়া গতির যানবাহন চলার কারণে সংঘটিত দুর্ঘটনায় মৃত্যু বা ক্ষতির মাত্রা বেশি হলে খবরটি গোচরে আসে; নতুবা অগোচরেই থেকে যায়। বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের সড়ক দুর্ঘটনা গবেষণা ইনস্টিটিউটের প্রতিবেদন বলছে, আমাদের দেশে যানবাহনের লাগামহীন গতি এবং চালকের বেপরোয়া মনোভাবের কারণে যথাক্রমে ৩৭ ও ৫৩ শতাংশ দুর্ঘটনা ঘটে থাকে।
এরা কারা, যারা এ ধরনের উপদ্রবকে গুরুতর বিপদের কারণে পরিণত করছে? হ্যাঁ, এরা শৌখিন গাড়িচালক। এদের বেশিরভাগই ছোটবেলা থেকে সীমাহীন প্রাচুর্যে বেড়ে ওঠা অল্পবয়সী। এরা না চাইতেই সবকিছু পেয়ে যায়। অভাব কোনোদিন তাদের স্পর্শ করেনি। অভিজাত এলাকায় তাদের বসবাস। আর এ জন্য ওরা হয়তো নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করার কোনো তাগিদও অনুভব করে না। তারা অলস সময় পার করে। বন্ধু-বান্ধব নিয়ে সময় কাটানো, মজা-মাস্তির মধ্যেই জীবনের অর্থ খুঁজে বেড়ায়। এদের অনেকেই গভীর রাত অবধি জেগে থাকে। তারই অংশ হিসেবে রাতের বেলা বন্ধু-বান্ধব নিয়ে বের হয়, ট্রাফিক আইনকে তুচ্ছ জ্ঞান করে নিউ মডেলের গাড়ি নিয়ে রাজপথ দাপিয়ে বেড়ায়। গাড়িতে উচ্চস্বরে মিউজিক বাজিয়ে রাতের নীরবতাকে খান খান করে দেয় এবং এদের গাড়ি চালানোর কসরত রাতের বেলাতেই বেশি দৃশ্যমান। অনেকেরই ড্রাইভিং লাইসেন্স থাকে না। তারপরও ওদের মধ্যে কোনো ভীতি কাজ করে না।
এরা দুর্ঘটনা ঘটিয়ে নিজের জীবনকে যেমন বিপদাপন্ন করে তোলে, তদ্রূপ আশপাশের যানবাহন ও পথচারীর জীবনকেও তছনছ করে দেয়। বেপরোয়া ড্রাইভিংয়ের কারণে এরা দুর্ঘটনায় আহত হলে চিকিৎসা হয় দেশ-বিদেশের নামি-দামি হাসপাতালে। আর ওদের কারণে যারা আহত হয়, তারা হয়তো যথোপযুক্ত চিকিৎসাই পায় না। পঙ্গুত্ব মেনে নিয়েই জীবন পার করে দিতে হয়। শুধু কি তাই? দুর্ঘটনার পর আহত বা পঙ্গু অনেকেই প্রাপ্য ক্ষতিপূরণটুকুও পায় না। মনে হয়, এসব অভাগার প্রতি আমাদের সহমর্মিতা ও দায়িত্ববোধ কমে যাচ্ছে। সে কারণেই হয়তো ওদেরকে রাতের বেলা বেপরোয়া ড্রাইভিং থেকে নিবৃত্ত করা যাচ্ছে না। আমাদের এসব নিয়ে ভাবতে হবে। এর থেকে পরিত্রাণের উপায় খুঁজে বের করতে হবে। সামর্থ্যবান হলেই পরিবারের সব সদস্যের নামে (অপ্রয়োজনে) আলাদা গাড়ি কেনার লোক দেখানো বিলাসিতা থেকে সরে আসতে হবে। মনে রাখতে হবে, অতিরিক্ত ভোগ-বিলাসিতা ও মাত্রাতিরিক্ত সুযোগ-সুবিধা মানুষের যৌক্তিক চিন্তাকে বাধাগ্রস্ত করে।
অপ্রাপ্তবয়স্ক সন্তানকে কখনোই স্টিয়ারিং ধরতে উৎসাহিত করা ঠিক নয়। আর আমরা এই বেঠিক কাজটিরই চর্চা করে যাচ্ছি সোৎসাহে। গভীর রাতে যথোপযুক্ত কারণ ছাড়া ছেলেমেয়েরা যেন গাড়ি নিয়ে বের হতে না পারে, সে ব্যাপারে বাবা-মাকে সতর্ক থাকার পাশাপাশি অন্যান্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।
বেপরোয়া গতির ড্রাইভিং সড়ক দুর্ঘটনার প্রধান কারণ। তাই সড়কে কোনো গাড়ি বেপরোয়া গতিতে চললেই সে গাড়িকে চিহ্নিত করা ও আইনের আওতায় আনার পদ্ধতি (উন্নত দেশের মতো) আমাদের এখানেও প্রবর্তন করতে হবে। গাড়ির ফিটনেস ও চালকের লাইসেন্স বাতিলসহ প্রয়োজনে অন্যান্য শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের মাধ্যমে ট্রাফিক আইন পালনে চালকদের বাধ্য করতে হবে। রাতের বেলা মোবাইল কোর্ট চালুর উদ্যোগ গ্রহণ ও তা নিয়মিত পরিচালনায় আশানুরূপ ফল পাওয়া যেতে পারে।
গবেষণা বলছে, যারা বেপরোয়া ড্রাইভিংয়ে অভ্যস্ত, তাদের সামাজিকীকরণের আওতায় আনতে হবে। লেখাপড়া ও কাজকর্মে উৎসাহিত করতে হবে। এদেরকে মানসিকভাবে সুস্থির রাখার ব্যবস্থা করতে হবে। সুশৃঙ্খল ও সুনিয়ন্ত্রিত জীবনযাপনের আহ্বান জানাতে হবে। এলোমেলো ড্রাইভিংসহ সমাজ ও আইনবিরুদ্ধ কাজকর্ম বন্ধে অভিভাবক, শিক্ষক ও সুধীজনের মোটিভেশনাল কাজে এগিয়ে আসতে হবে। জীবনের ছন্দ মেনে সামনে চলতে নতুনদের উদ্বুদ্ধ করতে হবে।
সালাহ্‌ উদ্দিন নাগরী: উপপরিচালক, জাতীয় বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি জাদুঘর

snagari2012@gmail.com