বিচারপতি মুহাম্মদ হাবিবুর রহমানের পরিচয় ও খ্যাতির সীমানা বিস্তৃত। তিনি তার কর্মে খ্যাতি ও পরিচয়ের সীমানা নিজেই করে গেছেন দিগন্ত-বিস্তৃত। গবেষক, লেখক, শিক্ষাবিদ, আইনবিদ, রবীন্দ্র বিশেষজ্ঞ, ভাষাসংগ্রামী, অভিধান প্রণেতা মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান দেশের প্রধান বিচারপতি ছিলেন। তিনি তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন। রাষ্ট্রীয় ও প্রাতিষ্ঠানিক সব দায়িত্ব থেকে অবসর গ্রহণ করার পর তিনি বিচক্ষণ ও দায়িত্ববান একজন বুদ্ধিজীবী হিসেবেও গুরুদায়িত্ব পালন করে গেছেন। তার কাজের সর্বক্ষেত্রেই অসামান্য সাফল্য দৃশ্যমান। তার প্রজ্ঞার আলোয় আলোকিত হয়েছিল পরিপার্শ্ব। তিনি যেসব রচনা রেখে গেছেন, তা আমাদের বড় সম্পদ। এই সম্পদ ভান্ডার আমাদের জানার আশ্রয়ের বড় জায়গা হয়ে আছে।
তিনি শিক্ষাজীবনে যুক্ত ছিলেন ছাত্র রাজনীতির সঙ্গে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সলিমুল্লাহ মুসলিম হল ছাত্র সংসদের ছিলেন নির্বাচিত সহসভাপতি। সেকালে ছাত্র রাজনীতির দ্যুতি-ঔজ্জ্বল্য সমাজকে অন্যভাবে প্রজ্বলিত রাখত। নিঃসন্দেহে মেধাবীরাই তখন ছাত্র সংসদে শিক্ষার্থীদের প্রতিনিধি হিসেবে নির্বাচিত হতেন। আমাদের জাতীয় ইতিহাসের বাঁক পরিবর্তনের অধ্যায় বায়ান্নর রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনে তিনি ছিলেন অন্যতম অগ্রজন। সুঠাম দেহের অধিকারী প্রজ্ঞাবান এ মানুষটি ক্রমেই হয়ে ওঠেন আমাদের বাতিঘর। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগ থেকে এমএ পাস করে তিনি যোগ দিয়েছিলেন শিক্ষক হিসেবে। বাম ধারার ছাত্র রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত মুহাম্মদ হাবিবুর রহমানের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষাজীবনে সলিমুল্লাহ হলের গেটে পান-সিগারেট বিক্রির বিষয়টি তখন তো বটেই, পরবর্তী সময়েও নানা মহলে আলোচনায় উঠে আসত।
মুহাম্মদ হাবিবুর রহমানের ডাক নাম শেলী। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইতিহাসে প্রথম শ্রেণিতে প্রথম স্থান অধিকারী মুহাম্মদ হাবিবুর রহমানের 'দোকানদারি'র এ খবর তখন ঢাকা ও কলকাতার কয়েকটি পত্রিকায় প্রকাশিতও হয়েছিল। তার ওই ঘটনার মধ্য দিয়ে সাহস, কৌতুকবোধ ও মৌলিকত্বের যে প্রকাশ ঘটেছিল; এর সবই ছিল তার চরিত্রের খুব স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্য। নির্মোহ এ মানুষটি কাউকে খুশি করার জন্য কখনও কিছু করেছেন বলে শোনা যায়নি। নিজের দায়িত্ব-কর্তব্যবোধ থেকে বিবেকের তাগিদে তিনি নিষ্ঠার সঙ্গে সবকিছুতে ছিলেন অবিচল। তার লেখায়ও সে পরিচয় মেলে। অত্যন্ত কঠিন কথাও তিনি লিখতেন একেবারে সরল প্রসন্নতায়। তার অনেক বক্তৃতা শুনেছি। ওইসব বক্তৃতায় শুধু সাবলীলতারই পরিচয় পাইনি; পেয়েছি গভীরতাও। তার বক্তব্য মানুষ সাদরে গ্রহণ করেছে, মান্য করেছে।
তিনি আইনশাস্ত্রে উচ্চতর ডিগ্রি নিয়েছিলেন। শেষ ধাপে পড়াশোনার জন্য যান অক্সফোর্ডে। ইতিহাস ও আইন তো বটেই, আরও অনেক বিষয়ে তিনি ছিলেন প্রজ্ঞার অধিকারী। আমরা দেখেছি, অবসর জীবনেও তিনি বসে থাকেননি। আলস্য তাকে স্পর্শ করতে পারেনি। অমূল্য সব গ্রন্থ রচনা করেছেন। পত্রপত্রিকায় সমসাময়িক ও সাহিত্য বিষয়ে লেখালেখি করেছেন। তার গবেষণা ও লেখায় যত্নের ছাপ তো পাওয়াই যায়। এর পাশাপাশি এমন অনেক কিছু আছে, যা যুগের পর যুগ পঠিত হতে থাকবে। প্রায় প্রতিবার একুশের বইমেলায় তো বটেই, অন্য সময়েও তার বই প্রকাশিত হতো। কর্মমুখর মুহাম্মদ হাবিবুর রহমানের কাছে সময়ের গুরুত্ব ছিল বরাবরই বেশি। লেখার ক্ষেত্রে শব্দচয়নে ছিলেন খুব সতর্ক। বলা যায়, তার লেখায় শব্দের ব্যবহার অনবদ্য। তার 'যথাশব্দ' অমূল্য গ্রন্থটি এরই উর্বর জমিন বলা যায়।
আইন বিষয়ে রয়েছে তার অনেক গ্রন্থ। কাব্যগ্রন্থের সংখ্যাও কম নয়। আমরা দেখেছি, তার বিশেষ আগ্রহের ক্ষেত্র রবীন্দ্রনাথ। রবীন্দ্র গবেষণায় তার মৌলিকত্বের আরও বেশি প্রকাশ ঘটে। লক্ষ্য করার বিষয়, চীন দেশ নিয়ে তিনি গবেষণা করে আমাদের যা দিয়ে গেছেন, তাও অনন্য। সামাজিক দায়িত্ববোধে অনুপ্রাণিত মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান সব কাজেই থাকতেন সতর্ক ও দায়িত্বশীল। তার অসংখ্য নিবন্ধ-প্রবন্ধ দিকনির্দেশক হিসেবে কাজ করেছে। সামাজিক দায়বদ্ধতার স্পষ্ট সাক্ষ্য দেয় তার রচিত নিবন্ধ-প্রবন্ধ। অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ সেসব রচনা। তার কাছে আমাদের ঋণের শেষ নেই। তিনি তো নানা কারণেই স্মরণীয় হয়ে থাকবেন। তার প্রয়াণ ঘটেছিল বলতে গেলে আকস্মিক এবং খুব সহজভাবে। প্রস্থানও যেন তার জীবনাচারের মতোই ছিল সহজ।
মুহাম্মদ হাবিবুর রহমানের গভীর অন্তর্দৃষ্টির প্রতিফলন ঘটেছে নানা ক্ষেত্রে। তার 'গঙ্গাঋদ্ধি থেকে বাংলাদেশ' গ্রন্থটির প্রেক্ষাপট সুবিশাল। প্রাগৈতিহাসিক যুগ থেকে স্বাধীন বাংলাদেশে সংবিধান প্রণয়ন পর্যন্ত নানা চড়াই-উতরাই এ গ্রন্থের প্রেক্ষাপট। বইটির নামই বলে দেয় প্রেক্ষাপটের অধ্যায় কত বিস্তৃত ও গভীর। ঢাকা ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা দিয়ে তার যে কর্মজীবন শুরু হয়েছিল, তার শেষ বিশেষ ব্যবস্থার তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালনের মধ্য দিয়ে। কোরআন শরিফের সরল বঙ্গানুবাদ ও 'কোরানসূত্র' তার বড় কাজ। তার 'প্রথমে মাতৃভাষা পরভাষা পরে' গ্রন্থটি পাঠে সমৃদ্ধ হতেই হবে। দেশপ্রেম, নিজ ভাষাপ্রীতির পাশাপাশি ব্যক্তির দায়বদ্ধতার বিষয় কীভাবে মানুষকে বিকশিত করতে পারে, এ গ্রন্থ থেকে এর বড় অনুপ্রেরণা মেলে।
তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দায়ভার, স্বাধীনতার দায়ভার, বাংলাদেশের নানান ভাষা, নাগরিকদের জানা ভালো, বাংলাদেশের রাজনৈতিক ঘটনাপঞ্জি, ভাষার আপন পর, যার যা ধর্ম, ভারতীয় ঐতিহ্য ও রবীন্দ্রনাথ, বাঙালির ইতিহাস : আদিপর্ব, বাংলাদেশের তারিখ, বচন ও প্রবচন, বাংলাদেশ দীর্ঘজীবী হোক, বাংলা ব্যাকরণের রূপরেখা ইত্যাদি অমূল্য গ্রন্থ ছাড়াও বিদেশি কবিতার অনুবাদ গ্রন্থও রয়েছে। স্থিতধী, বিবেকবান, দূরদর্শী, দায়িত্ববান মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান অনেক কঠিন কাজ করে গেছেন নিজের বিবেকের কাছে সৎ ও দায়বদ্ধ থেকে। মুক্তিযুদ্ধ, গণতন্ত্র থেকে শুরু করে বার্নার্ড শ, রবীন্দ্রনাথ, শামসুর রাহমান- কতজনকে নিয়ে তিনি বলে গেছেন এবং উন্মোচিত করেছেন নতুন নতুন দিক! আইনের শাসনের প্রতি নিষ্ঠাবান থেকে প্রশাসক হিসেবেও দক্ষতা-স্বচ্ছতার যে উজ্জ্বল ছাপ রেখে গেছেন, তাও অনুসরণীয় হয়ে থাকবে।
৮৫ বছর বয়সে এই গুণী ব্যক্তির জীবনাবসান ঘটে। তিনি জন্মগ্রহণ করেছিলেন পশ্চিমবঙ্গের মুর্শিদাবাদে। একুশে পদক, বাংলা একাডেমি পুরস্কারসহ তার অর্জনের ঝুলিতে রয়েছে অনেক পদক-সম্মাননা। অনুসন্ধিৎসু মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান তার কর্ম ও সৃষ্টির জন্য আমাদের মাঝে জাগ্রত থাকবেন। আমরা তাকে সব সময়ই মনে করব মূল্যবান ও গর্বিত উপমা হিসেবে। তিনি ও তার সব রচনা আমাদের অমূল্য সম্পদ। অষ্টম মৃত্যুবার্ষিকীতে গভীর শ্রদ্ধায় তাকে স্মরণ করি।
সেলিনা হোসেন: কথাসাহিত্যিক