গত নভেম্বরে জাতীয় দৈনিকগুলোতে খবর এসেছে, চাহিদামতো বখশিশ না পেয়ে ১৫ বছরের এক কিশোরের অক্সিজেন মাস্ক খুলে দেয় বগুড়ার মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের এক অস্থায়ী কর্মচারী। এ ঘটনায় নির্দয়তা, অমানবিকতার চিত্র ফুটে উঠলেও এর সঙ্গে আছে নিম্নশ্রেণির কিছু সরকারি-বেসরকারি কর্মচারীর বহুদিনের কাজ করে বা না করে হাত পাতার অভ্যাস। তাদের চেয়েও অনেকে অর্থনৈতিকভাবে গরিব আছে, কিন্তু ভিক্ষাবৃত্তি তাদের মধ্যে নেই। যেমন- রিকশাওয়ালা, সবজিওয়ালা, চায়ের দোকানদার। হাত পাতার সঙ্গে যে অর্থনৈতিক অবস্থার সম্পর্ক নেই, তার আরেকটা প্রমাণ ঘুষবাণিজ্য। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ে প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে সল্ফ্ভ্রান্ত চাকরি থাকা সত্ত্বেও অনেকেই শুরু করেন ঘুষের কারবার। এতে রাষ্ট্রের অপূরণীয় ক্ষতি হয়, আর দেশের মানুষ বঞ্চিত হন নাগরিক সেবা থেকে। সরকার বেতন বাড়িয়ে ও বিভিন্নভাবে অর্থনৈতিক সুবিধা দিয়েও তাদের বশে আনতে পারেনি। এমন ঘুষজীবীদের মধ্যে অনেকে আবার একটু চক্ষুলজ্জা রাখেন। তাই তাদের ঘুষের কারবারটা সরাসরি নিজে না করে পিয়ন, ড্রাইভারদের মাধ্যমে সারেন। তাই সরকারি অফিসের অনেক পিয়ন, ড্রাইভার আজ কোটি কোটি টাকার মালিক।

এর সঙ্গে দীর্ঘদিনের দায়মুক্তির একটা সম্পর্ক থাকে। কেউ দিনের পর দিন যখন দুর্নীতি করেন, আর বিশ্বাস করতে শুরু করেন- কেউ তার কিছু করতে পারবে না, তখন চক্ষুলজ্জাটুকুও কেটে যায়। তাই তো বালিশের দাম হয় ৪০ হাজার টাকা আর পর্দার দাম হয় ৩৭ লাখ টাকা! বিদ্যাবুদ্ধি থেকে কী লাভ, যদি বিবেক না থাকে? ইঞ্জিনিয়ার সরকারি আমলা হয়ে বা প্রকল্পপ্রধান থেকে বছর না ঘুরতেই প্রকল্পের বাজেট বাড়াতে থাকেন দ্বিধাহীন চিত্তে। হয়ে যায় পুকুরচুরির পরিবর্তে সাগরচুরি। তাদের খামখেয়ালিতেই অসাধু ঠিকাদাররা রডের পরিবর্তে বাঁশ ব্যবহার করার সাহস পায়। আর এক দল আবার চাকরিতে গুরুত্বপূর্ণ পদে থেকেও কোনো বিশেষ গোষ্ঠীর স্বার্থ সংরক্ষণ করে চলে। যেন রিটায়ারমেন্টের পরও অন্য কোনো লাভজনক পদে আসীন হওয়া যায়। শুধু চাই আর চাই! চাওয়ার যেন শেষ নেই! তারা অভাবে নয়, স্বভাবে গরিব। তাদের তুষ্ট করা যায় না কিছুতেই।

দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনেও এমন চর্চা বিদ্যমান। কোনো কোনো ধনী রাজনীতিকও নির্বাচনের সময় নিজেকে সাধারণ মৎস্যজীবী দাবি করে তার হলফনামায় মাত্র কয়েক লাখ টাকার সম্পদ দেখান। শতকোটি টাকার মালিক হওয়ার পরও একগাল হাসি দিয়ে কেউ কেউ নিজেকে শ্রমিক নেতা দাবি করেন। কেউ কেউ নির্বাচনী প্রচারণায় নিজে পোস্টার বানিয়ে তার নিচে লিখে দেন- প্রচারে এলাকার সর্বস্তরের জনগণ। এমন সব লোকও রাজনীতির পরশপাথর পেয়ে লজ্জা-ঘৃণার মাথা খেয়ে হয়ে গেছেন সম্পদের কৈলাস পর্বত। অনেকে রাষ্ট্রীয় পদে বসে অক্ষম আর ব্যর্থ হয়েও দিনের পর দিন চেয়ার আঁকড়ে ধরে রাখেন। হাজার সমালোচনা আর নিন্দার ঝড়েও তাদের কিছু যায়-আসে না। দেশের মানুষ যখন ভাঙাচোরা বাসে বাদুড়ঝোলা হয়ে দিনের পর দিন পথ চলে, তখন শুধু রাষ্ট্রীয় পদের সুবিধা নিয়ে দেশের অর্থে কেনা বিলাসবহুল গাড়িতে চড়ে বেড়ান পাবলিক সার্ভেন্টরা।

দেশের সীমানা ছাড়িয়ে বিদেশের মাটিতে বাংলাদেশি পলিটিক্স করতে গিয়ে মারামারি, ঝাড়ু মিছিল করেন। ভাবতে বিস্ময় লাগে, দেশের কেউ কেউ কীভাবে বিদেশে মানসিক দৈন্যের আন্তর্জাতিক স্বাক্ষর রাখছেন! নির্লজ্জতার প্রকাশ দেখা যায় অনেক তথাকথিত বুদ্ধিজীবীর মধ্যেও। উচ্চতর বিদেশি ডিগ্রি নিয়ে, অগাধ পাণ্ডিত্য অর্জন করে যেখানে দেশ ও জাতির বিনির্মাণে তাদের মেধা আর প্রজ্ঞার চর্চা হওয়া দরকার, সেখানে কিছু প্রাপ্তির আশায় জ্ঞান-বুদ্ধি জলাঞ্জলি দিয়ে অনেকেই আজ স্বার্থান্বেষী আর পক্ষপাতদুষ্ট। কোনো ঘটনার প্রকৃত কারণ অনুসন্ধান না করে শুধু কিছু কপট যুক্তি আর শব্দের ব্যবহারে অন্যায়কে ন্যায় বানাতে তাদের লজ্জাবোধে বাধে না। কোনো ঘটনা বা দুর্ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে যেখানে নির্ভেজাল, নিরপেক্ষ প্রতিক্রিয়া বা মতামত দেশের মানুষ আশা করে; সেখানে তারা সুবিধাবাদের রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গির বাইরে আসতে পারেন না। আর এক গ্রুপ আছে, তারা সাধারণত নির্বাক থাকতে পছন্দ করে। চুপ করে থেকে তারা ভবিষ্যতের হিসাব মেলায়। সামনে কোন পদ বা পদক পাওয়া যাবে তাই নিয়ে তাদের বিস্তর গবেষণা। অথচ রাষ্ট্র, সমাজ, অর্থনীতি, রাজনীতি যেন তাদের চিন্তার বাইরে! লোভ আর ভয় নিয়ে তারা বেঁচে আছে।

মো. রবিউল ইসলাম :সহযোগী অধ্যাপক, আইন ও বিচার বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়