নারায়ণগঞ্জ সিটি নির্বাচন থেকে কী বার্তা পাওয়া গেল? যারা নারায়ণগঞ্জের বাইরে থাকেন তারা এ হিসাবটি সহজে মেলাতে পারবেন না। কারণ সারাদেশের আয়নায় তাকিয়ে নারায়ণগঞ্জকে বোঝা যাবে না। নারায়ণগঞ্জকে দেখতে হলে এখানকার বাস্তবতা, পরিপ্রেক্ষিত, রাজনৈতিক সংস্কৃতি ও লড়াই-সংগ্রামকে জানতে হবে। কী কারণে সমাজের পরিবর্তন চাওয়া মানুষ নৌকা প্রতীকেরই পক্ষ নিল, তা সরল অঙ্ক দিয়ে বোঝা যাবে না। ৪০ বছরের 'অ্যান্টি এস্টাব্লিশমেন্ট' সংগ্রামের মধ্য দিয়ে এখানে ভিন্ন একটি পাটাতন গড়ে উঠেছে। যা এই সময়ে বিভিন্ন সরকারের ছত্রছায়ায় রাজনৈতিক ও সামাজিক দুর্বৃত্তায়নের বিরুদ্ধে লড়াই করে করে মানুষ এখানে গড়ে তুলেছে, যে লড়াইটি এখনও জারি আছে।
দলীয় সমর্থকদের বাইরে বড় যে অংশটি রয়েছে, মূলত তারাই নির্বাচনের মাঠে জয়-পরাজয়ের নির্ধারক। বিগত তিনটি সিটি নির্বাচনের দিকে তাকালে এ হিসাবটি স্পষ্ট হয়ে উঠবে। ২০১১ সালে নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন গঠিত হলে সে বছর ৩০ অক্টোবর অনুষ্ঠিত প্রথম নির্বাচনে সেলিনা হায়াৎ আইভী নাগরিক পরিষদের ব্যানারে স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়ে আওয়ামী লীগ সমর্থিত প্রার্থী শামীম ওসমানকে পরাজিত করে মেয়র নির্বাচিত হন। সে নির্বাচনে আইভীর প্রাপ্ত ভোট এক লাখ ৮০ হাজার ৮৪, আর শামীম ওসমানের ৭৮ হাজার ৭০৫। নির্বাচনের আগের রাতে বিএনপি সমর্থিত প্রার্থী তৈমূর আলম খন্দকার নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ান। পরাজিত প্রার্থী বলতে থাকেন, আইভী বিএনপি-জামায়াতের ভোটে বিজয়ী হয়েছেন। কিন্তু ২০১৬ সালের নির্বাচনে দলীয় প্রতীক নিয়ে বিএনপিদলীয় প্রার্থী সাখাওয়াত হোসেন ভোট পান ৯৬ হাজার ৭০০ আর সেলিনা হায়াৎ আইভী পান ১ লাখ ৭৪ হাজার ৬০২ ভোট। ২০১১ সালে মোট প্রদত্ত ভোটের হার ছিল ৭০ শতাংশ, ২০১৬ সালে তা হয় ৬২ শতাংশ আর এবার তা নেমে দাঁড়ায় ৫০ শতাংশে। এবার পুরো এলাকায় ইভিএমে ভোট হয়েছে। দুই-আড়াই ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়েও ভোট দিতে না পেরে কেউ কেউ ফিরে গেছেন। আঙুলের ছাপ মেলাতে কোথাও কোথাও ১০-১৫ মিনিট পর্যন্ত সময় লেগেছে। এবার নির্বাচনে আইভী পেয়েছেন ১ লাখ ৫৯ হাজার ৯৭ ভোট, আর তৈমূর আলম ৯২ হাজার ৫৬২ ভোট। ভোটের ব্যবধান ৬৬ হাজার ৫৩৫। প্রদত্ত ভোটের হার বাড়লে এটি লাখ ছুঁয়ে যেত- সন্দেহ নেই।
নারায়ণগঞ্জ সিটির তিনটি নির্বাচনই যে সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ হয়েছে, তা পরাজিত প্রার্থী ছাড়াও দেশ-বিদেশের পর্যবেক্ষকরা স্বীকার করেছেন। সরকার চেয়েছে বলেই তা হয়েছে। বর্তমান বাস্তবতায় নির্বাচন সুষ্ঠু করার ব্যাপারে নির্বাচন কমিশনের কোনো ভূমিকা বা কৃতিত্ব নেই। সরকারের ইচ্ছা-অনিচ্ছাতেই নির্বাচন সুষ্ঠু ও প্রশ্নবিদ্ধ হয়। তৈমূর আলমের ক'জন কর্মীকে গ্রেপ্তার না করলে নির্বাচনটি আরও আদর্শ ও উদাহরণ হতে পারত।
তৈমূর আলম স্বতন্ত্র প্রার্থী দাবি করলেও তিনি বিএনপিরই দলীয় প্রার্থী ছিলেন। বিএনপি এটিকে তাদের কৌশল হিসেবে নিয়েছে। নির্বাচনের আগের রাতে দেশের বাইরের একটি চ্যানেলের টকশোতে আমার সঙ্গে বিএনপির কেন্দ্রীয় এক নেতা ছিলেন। তিনি স্পষ্ট করেই বলেছেন, এটি তাদের দলের একটি কৌশল। শেষে সঞ্চালক যখন তাকে দর্শকদের উদ্দেশে কিছু বলতে বললেন তিনি বললেন, 'আপনারা হাতি প্রতীকে তৈমূর আলম খন্দকারকে ভোট দিন।'
শুরু থেকেই এখানে একটি কথা চাউর ছিল- আইভীকে ঠেকাতেই তৈমূর আলম খন্দকারকে শামীম ওসমান দাঁড় করিয়েছেন। আওয়ামী লীগ দলেও এ নিয়ে বিস্তর আলোচনা হয়েছে। তৈমূর আলমের ভাইয়ের পক্ষে কাউন্সিলর পদে নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ানোর জন্য শামীম ওসমানের অনুগত একজন কর্মীকে দল থেকে বহিস্কার করা হয়। অনুগত এক কাউন্সিলর তৈমূর আলমের পক্ষে ভোট চাওয়ার অভিযোগে তাকে কারণ দর্শানো নোটিশ দেওয়া হয়। দলীয় প্রার্থীর পক্ষ না নেওয়ায় শামীম ওসমানের অনুগত ছাত্রদের কমিটি ভেঙে দেওয়া হয়। এ নির্বাচনে দলের কেন্দ্রীয় কমিটি থেকে দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতা জাহাঙ্গীর কবির নানক ২৪ ঘণ্টা সময় বেঁধে দিয়ে এক সময় হুঁশিয়ারি দেন। এ সময়ের মধ্যেই নাটকীয়ভাবে সংবাদ সম্মেলন করে নৌকা প্রতীকের পক্ষে থাকার ঘোষণা দেন শামীম ওসমান। যদিও এ নির্বাচনে শেষাবধি শামীম ও তার অনুগতরা আইভীর পক্ষে ছিলেন না। নির্বাচনের দিন ফলাফল ঘোষণার পর একটি ইলেকট্রনিক সংবাদমাধ্যমে তৈমূর আলম অভিযোগ করেন, গত রাতে তার বাসা থেকে বের হওয়ার পর এক সনাতন ধর্মাবলম্বী ও ছাত্রলীগের এক কর্মীকে গ্রেপ্তার করে হেফাজতের মামলায় দেওয়া হয়েছে। তৈমূর আলমকে কেউ প্রশ্ন করেননি- নির্বাচনের আগের রাতে সরকারদলীয় ছাত্র সংগঠনের কর্মী কেন তার বাসায় এলেন?
সন্ত্রাসের জনপদের তকমাটি এমনিতেই এখানে লাগেনি। এর নানাবিধ কারণ রয়েছে। শুরুতে যে বিষয়টি বলছিলাম; রাজনৈতিক ও সামাজিক দুর্বৃত্তদের বিরুদ্ধে এখানে প্রতিনিয়ত লড়াই করতে হয়। এ গোষ্ঠীটি এখানে সরকারের নাম করে প্রশাসনের ছত্রছায়ায় নিজেদের আধিপত্য বিস্তারের জন্য সব সময় ভয়ের এক পরিবেশ জিইয়ে রাখতে সচেষ্ট। তারা সিন্ডিকেট করে সবকিছুতে চাঁদাবাজি করে; সরকারি ভূমি দখলে নেয়। ব্যবসায়ী ও সামাজিক প্রতিষ্ঠানগুলো জোর করে নিয়ন্ত্রণে নিতে সহিংস হয়ে ওঠে। এর প্রতিবাদ করলে তাকে হত্যা করতেও নূ্যনতম কুণ্ঠাবোধ করে না। এক সময় শহরের বিভিন্ন জায়গায় তারা টর্চার সেল তৈরি করেছিল। যেখানে বহু যুবককে তারা হত্যা করেছে। অনেককে বাড়ি থেকে ইট খুলে আনার হুমকি দিয়েছে; বাড়ি থেকে স্ত্রীকে তুলে আনার হুমকি দিয়েছে; পিঁপড়ের মতো পায়ে পিষে হত্যার হুমকি দিয়েছে; টুকরো টুকরো করে কেটে লাশ শীতলক্ষ্যা নদীতে ফেলে মাছ দিয়ে খাওয়ানোর হুমকি দিয়েছে। নারায়ণগঞ্জের সাধারণ মানুষ এসব দেখেছেন। তারা প্রতিবাদ করার সাহস পাননি। বিগত সিটি নির্বাচনগুলোতে মানুষ এই দুর্বৃত্ত শক্তির বিরুদ্ধে তাদের ক্ষোভের প্রকাশ ঘটিয়েছেন। এখানে এ গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরে লড়াই জারি রয়েছে। এ লড়াইয়ে সেলিনা হায়াৎ আইভী সাহসের সঙ্গে নাগরিকদের পাশে রয়েছেন; তাদের নিয়ে লড়ে যাচ্ছেন। তার দলের হলেও তিনি আপস করেননি। তার এ অবস্থান মানুষকে সাহসী করেছে।
বিগত ১০ বছরে আইভী সিটি করপোরেশনের পিছিয়ে পড়া অঞ্চলগুলোতে দৃশ্যমান উন্নয়ন করেছেন। মানুষ দেখেছে- আইভী দল-অন্ধ নন; সিন্ডিকেট করে লুটপাট করছেন না; নিষ্ঠার সঙ্গে কাজ করছেন। নানা প্রতিবন্ধকতা, সীমাবদ্ধতা আর প্রতিনিয়ত নিজ দলের বৈরিতা সত্ত্বেও তিনি দক্ষতা ও সাহসের সঙ্গে সবকিছু মোকাবিলা করেছেন। মানুষ এ হিসাবগুলো বিবেচনায় নিয়েছে। আইভী নির্বাচিত না হলে যিনি নির্বাচিত হবেন, তিনি যে দায়িত্ব পালন করতে পারবেন না; তার পেছনের শক্তিই যে তাকে তাড়িয়ে বেড়াবে; পেছনের সে ভয়ংকর শক্তি যে আরও বেপরোয়া হয়ে উঠবে- এ সত্যটি বাইরের কেউ না বুঝলেও নারায়ণগঞ্জের মানুষ ঠিকই বুঝেছে। আর তাই মানুষ আইভীর দলের দিকে না তাকিয়ে; তার প্রতীকের দিকে না তাকিয়ে আইভীকে ভোট দিয়েছেন। এ নির্বাচনে স্থানীয় বাস্তবতা ও প্রার্থীই ছিল গুরুত্বপূর্ণ। আর তাই সারাদেশের পরিপ্রেক্ষিতে একে মেলাতে চাইলে হিসাব মিলবে না। '১৬ তারিখ খেলা হবে'- ঘোষণা দিয়ে প্রকাশ্যে ও গোপনে, ভেতরে ও বাইরে শেষ পর্যন্ত তিনি খেলেছেন। কিন্তু মানুষ খেলায় কোনো অপশক্তিকে জিততে দেননি। বিজয় জনতারই হয়েছে।
রফিউর রাব্বি :লেখক ও নাগরিক অধিকারকর্মী