নির্বাচন কমিশন তথা ইসি গঠনে আইন প্রণয়নের যে উদ্যোগ সরকার গ্রহণ করেছে, সেটাকে আমরা স্বাগত জানাই। সোমবার মন্ত্রিসভার নিয়মিত বৈঠকে আইনের খসড়ায় নীতিগত ও চূড়ান্ত অনুমোদনের মধ্য দিয়ে দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ নাগরিকের আকাঙ্ক্ষাই প্রতিফলিত হয়েছে বলে আমরা বিশ্বাস করি। বস্তুত এ সংক্রান্ত খবরের সঙ্গেই সমকালে প্রকাশিত অপর এক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, ইসি গঠনের লক্ষ্যে রাষ্ট্রপতি আহূত সংলাপে অংশগ্রহণকারী রাজনৈতিক দলগুলোরও বিপুল অধিকাংশ মত দিয়েছে আইন প্রণয়নের পক্ষে। ডিসেম্বরের তৃতীয় সপ্তাহ থেকে আয়োজিত হয়ে আসা এই সংলাপের শেষ দিন সোমবার ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগও একই অভিমত ব্যক্ত করেছে। গত মাসের মাঝামাঝি এই সম্পাদকীয় স্তম্ভেই আমরা এ ব্যাপারে তাগিদ দিয়েছিলাম।
প্রস্তাবিত আইনে যদিও প্রধান নির্বাচন কমিশনার ও কমিশনার নিয়োগে গত দুই মেয়াদে অনুসৃত 'সার্চ কমিটি' তথা বাছাই পর্ষদ গঠন পদ্ধতিই বহাল রাখা হয়েছে, আমরা এই উদ্যোগকে এক ধাপ অগ্রগতি বিবেচনা করি। এর মধ্য দিয়ে গুরুত্বপূর্ণ এই সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের গঠন প্রক্রিয়া নিয়ে অস্পষ্টতা দূর হবে। মাত্র মাসখানেক আগেও আইন প্রণয়নের ব্যাপারে সরকারের পক্ষে যদিও সময় স্বল্পতার অজুহাত দেখানো হয়েছিল, এখন আইন প্রণয়নের পক্ষে অবস্থান নিঃসন্দেহে সাধুবাদযোগ্য। এখন আমরা আরও সামনে এগিয়ে যাওয়ার তাগিদ দিই।
এটাও স্বীকার করতে হবে, ইসি গঠন নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে রাষ্ট্রপতির সংলাপই এক অর্থে ছিল অগ্রগতি। মনে রাখতে হবে, আওয়ামী লীগ সরকারের টানা তিন মেয়াদে এ নিয়ে তৃতীয়বারের মতো এমন উদ্যোগ নেওয়া হলেও তার আগে কখনও এমন নজির নেই। সংবিধানের একটি অনুচ্ছেদে এই উদ্দেশ্যে আইন প্রণয়নের কথা বলা থাকলেও অপর একটি অনুচ্ছেদে রাষ্ট্রপতিকেও ইসি গঠনের একক ক্ষমতা প্রদান করা হয়েছে। স্বাধীনতার পর থেকে সব সরকারই শেষোক্ত পথে হেঁটেছে। সেদিক থেকে একক এখতিয়ার প্রয়োগের বদলে বর্তমান সরকারের সময় যেভাবে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে সংলাপের ধারা চালু করা হয়েছিল, তা নিঃসন্দেহে ইতিবাচক। কিন্তু এটাও সত্য যে, গত দুই দফায় নিবন্ধিত বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে রাষ্ট্রপতির সংলাপ কেবল আনুষ্ঠানিকতাতেই পর্যবসিত হয়েছিল। যদিও সার্চ কমিটি গঠিত হয়েছে, তাদের মাধ্যমে বাছাই করা নির্বাচন কমিশন সাংবিধানিক দায়িত্ব পালন ও রাজনৈতিক নিরপেক্ষতা প্রদর্শনে স্পষ্টত ব্যর্থ হয়েছে।
গত দুইবারের অভিজ্ঞতায় ইসি গঠন প্রক্রিয়াকে আইনের আওতায় আনা ক্ষমতাসীন দলের রাজনৈতিক সদিচ্ছা হিসেবে আখ্যায়িত হতেই পারে। এর মাধ্যমে যেমন জনমতকে সম্মান জানানো হয়েছে, তেমনই জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠাও সহজ হবে। আমরা প্রত্যাশা করি, সংবিধানের আলোকে সুনির্দিষ্ট আইনের মাধ্যমে ইসি গঠিত হলে সংস্থাটির অভ্যন্তরীণ নানা জটিলতা ও বিরোধ নিরসনও সহজ হবে। বস্তুত সাংবিধানিক এই প্রতিষ্ঠানের নির্বাচন কমিশনারদের মধ্যকার 'বিরোধ' বিভিন্ন সময়ে যেভাবে সংবাদমাধ্যমের খোরাক হয়েছে, তা গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা ও সুশাসনের জন্য স্বাস্থ্যকর ছিল না। আমরা এখন দেখতে চাইব, বিরোধিতার জন্য বিরোধিতার বদলে রাজনৈতিক দলগুলো সদিচ্ছা ও আন্তরিকতার সঙ্গে এগিয়ে আসবে। যাতে করে সংসদে আইনটি নিয়ে মানসম্মত আলোচনা ও বিতর্ক হতে পারে। আইনের মাধ্যমে গঠিত সার্চ কমিটি ও সার্চ কমিটির সুপারিশকৃত ইসি নিয়েও রাজনৈতিক কারণে বিরোধিতা কাম্য নয়। বরং সব রাজনৈতিক দল এই প্রক্রিয়ায় যথাসম্ভব অংশগ্রহণ করলে দীর্ঘমেয়াদে সব পক্ষই লাভবান হবে। সবচেয়ে বেশি লাভবান হবে দেশের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা।
এটা ঠিক, খসড়া আইনে উল্লিখিত সার্চ কমিটির কাঠামো যে কোনো সময়ই সরকার তথা ক্ষমতাসীন দলকে সুবিধা দিতে পারে। সমকালে প্রকাশিত প্রতিবেদনেও বিশেষজ্ঞরা এ ব্যাপারে প্রশ্ন তুলেছেন। কিন্তু আমরা মনে করি, বিতর্ক করতে করতেই সামনের দিকে এগিয়ে যেতে হবে। সবাই মিলেই আমাদের গণতান্ত্রিক ধারাবাহিকতা ও নির্বাচনী ব্যবস্থার উৎকর্ষ সাধন করতে হবে। অতীতে রাষ্ট্রপতির একক এখতিয়ারে ইসি গঠনের চেয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর মাধ্যমে সার্চ কমিটি গঠন যেমন এক ধাপ অগ্রগতি ছিল; তেমনই স্থায়ী আইনের মাধ্যমে ইসি গঠনের এই প্রস্তাব আরেক ধাপ অগ্রগতি।