দেশে নির্বাচন কমিশন আইন নিয়ে আলোচনা চলছে দীর্ঘ সময় ধরে। সম্প্রতি নির্বাচন কমিশন গঠনের লক্ষ্যে যখন রাষ্ট্রপতির সঙ্গে সংলাপ অনুষ্ঠিত হয়, তখনও অধিকাংশ দল এ আইনের কথা বলেছে। তারই আলোকে বলা চলে, অতিসম্প্রতি নির্বাচন কমিশন আইনের খসড়া অনুমোদন দিয়েছে মন্ত্রিসভা। এ ব্যাপারে আমি একাত্তর টিভির টকশোতে বলেছি, ২০১১ সালে যখন নির্বাচন কমিশনার হিসেবে আমাদের শেষ সময়, তখন সব রাজনৈতিক দলসহ সাংবাদিকদের সঙ্গে এ বিষয়ে আলোচনা হয়। সে সময় নির্বাচন কমিশন আইনের একটি খসড়া তৈরি করা হয়েছিল। সেটি ছিল একটি পূর্ণাঙ্গ নির্বাচন কমিশন গঠন আইন। সেটি এখনও আমার কাছে রয়েছে। তখন আওয়ামী লীগ ক্ষমতায়। সে সময় সেটি আইন মন্ত্রণালয়ে দেওয়া হয়েছিল। আইন মন্ত্রণালয় তা পড়ে দেখার কথা বলেছিল। আসলে আমরা আইনটি তত্ত্বাবধায়ক সরকারের মাধ্যমেই প্রণয়ন করতে চেয়েছিলাম। কিন্তু তত্ত্বাবধবায়ক সরকার বলেছিল, এটি একটি মৌলিক বিষয়; সংবিধানের বিষয়। এটি নির্বাচিত সরকারেরই করা উচিত। ফলে পরবর্তী সরকারকে আমরা আইনটি দিয়েছিলাম। এর পর সেটি কোথায় গেছে, জানি না।
এখন নির্বাচন কমিশন আইনের যে খসড়া মন্ত্রিসভায় পাস হয়েছে; আমি বলব না, এটা কিছুই হয়নি। অন্তত সার্চ কমিটি গঠনে আওয়ামী লীগ যে উদ্যোগ নিয়েছে, সেটাকে সিদ্ধ করার জন্য আইনটি হচ্ছে। এখানে নির্বাচন কমিশন পুনর্গঠনের কিছু নেই বললেই চলে। আমি মনে করি, বিশ্বের অধিকাংশ দেশেই যে স্বাধীন নির্বাচন কমিশন রয়েছে, তাদের উদাহরণে বলা যায় সার্চ কমিটি গঠন নির্বাচন কমিশন গঠনের অন্যতম পদক্ষেপ, নিঃসন্দেহে। অনেক দেশে সার্চ কমিটি গঠন করে না। সেখানে সাংবিধানিক কমিটি রয়েছে এবং সংসদে নির্বাচন কমিশনের বিষয়টি নির্ধারিত হয়।
আমার বক্তব্য স্পষ্ট, এ আইনটি আসলে সার্চ কমিটি গঠন আইন। যে সার্চ কমিটি এর আগে রাষ্ট্রপতির আদেশে গঠিত হতো, তাকে একটা বৈধতা দেওয়া হয়েছে মাত্র। কারণ একটি গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় যেখানে সংসদীয় পদ্ধতি চলছে, সেখানে একে বলা যায় পুরো প্রক্রিয়ার অর্ধেক পদক্ষেপ। প্রথম কথা হলো, যে নামের কথা খসড়ায় বলা হয়েছে, এই নামগুলো তারা কোথা থেকে পাবেন, কে নাম দেবেন। যিনিই দিন, এটি একটি প্রক্রিয়া। এই প্রক্রিয়ায় কীভাবে নাম আসবে? দ্বিতীয়ত, প্রস্তাবিত ওই নাম থেকে বাছাই করে কি তারা সংসদকে বাদ দিয়ে সরাসরি রাষ্ট্রপতির কাছে পাঠাবেন; নাকি সংসদের মাধ্যমে রাষ্ট্রপতির কাছে পাঠাবেন- সেটি বিস্তারিত নেই। গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় যেসব নিয়োগ হয় সেখানে কিন্তু সংসদ ভূমিকা রাখে।
আরেকটা বিষয়, বাছাইকৃত সেসব নাম রাষ্ট্রপতির কাছে যাবে প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর হয়ে। যেহেতু রাষ্ট্রপতি সাংবিধানিকভাবে প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ ছাড়া শুধু দুটি নিয়োগ দিতে পারেন। অর্থাৎ নির্বাচন কমিশনার নিয়োগ দিতে হলেও রাষ্ট্রপতিকে প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ গ্রহণ করতে হবে। সে জন্যই মূলত নির্বাচন কমিশন আইন প্রয়োজন। আমাদের আলোচনা কিংবা গবেষণা বলে, আপনি সার্চ কমিটি রাখতে পারেন। চাইলে তার আগে আরেকটি কমিটিও হতে পারে, যাতে নাম গ্রহণ করে সার্চ কমিটিতে পাঠানো যায়। একেক দেশে একেক নিয়ম আছে। সার্চ কমিটি জাতীয় সংসদে নামগুলো পাঠাবে। এর পর সংসদের কমিটি অথবা কার্যকর কমিটি যেটা আছে, যেখানে বিরোধী দল যেমন থাকে তেমনি প্রধানমন্ত্রী, স্পিকারসহ অন্যরাও থাকেন। সেখানে নামগুলো নিয়ে আলোচনার পর রাষ্ট্রপতির কাছে যাবে।


অন্যান্য দেশে আমরা যেটা দেখি, সেটা সার্চ কমিটি হোক বা অন্য কোনো কমিটি হোক; তারা নাম আলোচনা করে সংসদে পাঠায়। সংসদে আলোচিত হলে সেটা মানুষ জানতে পারে। তখন মানুষের মধ্যে এক ধরনের আলোচনা হয়- এদের মধ্যে কে ভালো হবেন। সম্প্রতি এ আইনের খসড়া মন্ত্রিসভায় অনুমোদনের পর এ বিষয়ে সচিবালয়ে মন্ত্রিপরিষদ সচিব সাংবাদিকদের কাছে যে বক্তব্য দিয়েছেন, সেখানেই স্পষ্ট যে এটি আসলে সার্চ কমিটির আইন। আইনের খসড়ায় আছে, প্রধান নির্বাচন কমিশনার ও নির্বাচন কমিশনার নিয়োগের জন্য রাষ্ট্রপতির কাছে সুপারিশ দিতে একটি সার্চ কমিটি গঠন করা হবে। রাষ্ট্রপতির অনুমোদন নিয়ে এ সার্চ কমিটি হবে। এ কমিটির দায়িত্ব ও কাজ হবে যোগ্য প্রার্থীদের নাম সুপারিশ করা। ছয় সদস্যের এ অনুসন্ধান কমিটির প্রধান হিসেবে থাকবেন প্রধান বিচারপতি মনোনীত আপিল বিভাগের একজন বিচারপতি। আর সদস্য হিসেবে থাকবেন প্রধান বিচারপতি মনোনীত হাইকোটের্র একজন বিচারপতি, মহাহিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রক, সরকারি কর্ম কমিশনের চেয়ারম্যান এবং রাষ্ট্রপতি মনোনীত দু'জন বিশিষ্ট নাগরিক। কমিটিকে সাচিবিক সহায়তা দেবে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ। কমিটি যোগ্য প্রার্থীদের নাম সুপারিশের পর সেখান থেকে রাষ্ট্রপতি প্রধান নির্বাচন কমিশনার ও নির্বাচন কমিশনার নিয়োগ দেবেন।
আমরা অনেকে বরাবরই বলে এসেছি, নির্বাচন কমিশন নিয়োগ রাষ্ট্রপতি দেবেন ঠিক আছে। কিন্তু সেটা সংসদীয় কমিটিতে আলোচনার মাধ্যমে হওয়া চাই। আমরা বলছি, সংসদ সার্বভৌম। সুতরাং সংসদের ভূমিকা এখানে জরুরি। যাতে কোনো দল এটা বলতে না পারে- আমরা জানি না, কাকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। বিশ্বের ১৩৮ বা ১৪৮টি দেশে স্বাধীন নির্বাচন কমিশন আছে। এর মধ্যে অধিকাংশ দেশেই আইনের মাধ্যমে নির্বাচন কমিশনার নিয়োগ হয়। নির্বাচন কমিশনার হতে পেশাগত কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। এমন না যে একজন বিচারপতি কিংবা আমলাই হতে হবে। অনেক দেশে নাগরিক সমাজ থেকেও প্রধান নির্বাচন কমিশনার হয়ে থাকে। আমাদের এই উপমহাদেশে ভারত ছাড়া অন্যরা আইন অনুসরণ করে। ভারতের উদাহরণ যদিও আমাদের জন্য প্রাসঙ্গিক নয়, যেহেতু তারা ফেডারেল শাসিত। তারপরও ভারতে এ নিয়ে তুমুল আলোচনা হয়েছে। সেখানে এ ব্যাপারে আইন কমিশনের সুপারিশও রয়েছে। এমনকি সেটি এখন ভারতের সুপ্রিম কোর্টে রয়েছে।
নির্বাচন কমিশন গঠনে প্রস্তাবিত নাম যদি উন্মুক্ত আলোচনার মাধ্যমে নাও হয়, সংসদীয় কমিটিতে আলোচনা হতে পারে। উন্মুক্ত হলে আরেকটি রাজনৈতিক সংকট হতে পারে। এখন তৈরি করা সার্চ কমিটি আমি ধরে নিচ্ছি বাংলাদেশের আইন অনুযায়ী সিদ্ধ। হাইপোথিসিস হিসেবে যদি বলি, এ আইনে সার্চ কমিটি গঠিত হলো। এর পর অবশ্যই সংসদের মাধ্যমেই রাষ্ট্রপতি নিয়োগ দেবেন। রাষ্ট্রপতি নিয়োগকর্তা। তিনি বাছাইও করতে পারেন যদি একাধিক অপশন থাকে।
সব শেষে বলব, আমি মনে করি, আইনের বিষয়টিকে সরকার ইতিবাচক। সার্চ কমিটির আইন হওয়া মানে পূর্ণাঙ্গ আইনের পথে সরকার অর্ধেক এগিয়ে রয়েছে। এই ধারা অব্যাহত রাখার মাধ্যমে সময় নিয়ে একটি পূর্ণাঙ্গ নির্বাচন কমিশনের আইন বিষয়েও সরকার উদ্যোগ গ্রহণ করবে বলে আমার বিশ্বাস।
ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) ড. এম সাখাওয়াত হোসেন: সাবেক নির্বাচন কমিশনার