দেশের সবেধন নীলমণি প্রবালদ্বীপ সেন্টমার্টিনের যে বিপর্যয়কর চিত্র রোববার সমকালে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, তাতে আমরা উদ্বিগ্ন হলেও বিস্মিত নই। বস্তুত গত কয়েক দশক ধরেই দ্বীপটির প্রাকৃতিক পরিবেশের ক্রমাবনতি দেখে আসছি। প্রতিবেশগত দিক থেকে সংবেদনশীল ও সংকটাপন্ন এই দ্বীপে ইট-কাঠের জঙ্গল ও পরিবেশ বিনষ্টকারী জনসমাগম তো আছেই; গোদের ওপর বিষফোড়ার মতো যোগ হয়েছে তরল দূষণ। সম্প্রতি বাংলাদেশ ওশানোগ্রাফিক রিসার্চ ইনস্টিটিউটের এক গবেষণায় দ্বীপটির চারপাশে সমুদ্রের পানিতে ই-কোলাই ব্যাকটেরিয়ার ভয়াবহ মাত্রার উপস্থিতি মিলেছে। মূলত মনুষ্যবর্জ্য থেকে ছড়িয়ে পড়া এ ধরনের ব্যাকটেরিয়ার প্রধান উৎস যে দ্বীপে চলাচলকারী নৌযান- তা বোঝার জন্য বিশেষজ্ঞ হওয়ার প্রয়োজন নেই। উপরন্তু সম্প্রতি পরিবেশ অধিদপ্তরের অনুমতি ছাড়াই সাতটি বড় জাহাজ চলাচলের অনুমতি দেওয়া হয়েছে। এতে পরিস্থিতির আরও অবনতি ঘটবে বলে আশঙ্কা করা যায়।
আমরা গভীর উদ্বেগ ও হতাশার সঙ্গে দেখছি, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে পর্যটকদের ভিড়ে একদিকে যেমন দ্বীপের চারপাশের সামুদ্রিক পরিবেশ দূষিত হচ্ছে, অন্যদিকে ভূমিতেও তৈরি হচ্ছে বাড়তি চাপ। সমুদ্রসৈকত বা দ্বীপগুলোর ভূমি যে দেশের মূল ভূখণ্ডের মতো নয়- সংশ্নিষ্টদের এই বোধোদয় কবে হবে? বিশেষত সেন্টমার্টিন আরও স্পর্শকাতর। কারণ এটি পাথুরে নয় বরং প্রবালদ্বীপ। পাথুরে দ্বীপের মতো চাপ সহ্য করার ক্ষমতা এর নেই। অথচ দ্বীপের পৃষ্ঠদেশ শুধু নয়, পানির গভীরেও পৌঁছেছে অবিমৃষ্যকারী আগ্রাসন। সমকালসহ বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে এই চিত্র প্রায়শ উঠে আসে- প্লাস্টিক, ধাতব ও রাসায়নিক দূষণের কারণে পানির নিচের প্রবাল মরে যাচ্ছে। নষ্ট হচ্ছে মৎস্য ও জলজ প্রাণের আবাস এবং প্রজনন প্রক্রিয়া। আবার দ্বীপপৃষ্ঠেও সাধারণ জনবসতির পাশাপাশি হোটেল-মোটেল, রিসোর্ট গড়ে তোলা হচ্ছে নির্বিচারে।
সমকালে প্রকাশিত প্রতিবেদনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক গবেষণা উদ্ৃব্দত করে বলা হয়েছে, ২০১২ সালে সেন্টমার্টিনে ১৭টি হোটেল, কটেজ বা রিসোর্ট ছিল। আট বছরের মধ্যে তা প্রায় ১০ গুণ হয়ে এখন তা দেড়শতে দাঁড়িয়েছে বলে স্থানীয় এক পরিবেশবাদী সংগঠনের গবেষণায় উঠে এসেছে। আমরা জানি, আবাসিক হোটেল-মোটেলের বাইরে ব্যক্তিগত এমনকি সরকারি উদ্যোগেও দীর্ঘদিন ধরে গড়ে উঠছে নানা ভবন। মনে রাখতে হবে, পানির নিচে ও ভূপৃষ্ঠে ক্রমাগত বেড়ে চলা পরিবেশবিরোধী তৎপরতা খোদ দ্বীপটির অস্তিত্বের জন্য হুমকি না হয়ে পারে না। আলোচ্য প্রতিবেদনেই বলা হয়েছে, গত চার দশকে দ্বীপটিতে প্রবাল আচ্ছাদন, প্রবাল প্রজাতি, বৃক্ষ আচ্ছাদিত এলাকা- সবই উল্লেখযোগ্য হারে হ্রাস পাচ্ছে। এ ধারা চলতে থাকলে ২০৪৫ সালের মধ্যে সেন্টমার্টিন দ্বীপ প্রবালশূন্য হওয়ার আশঙ্কা করা হয়েছে আন্তর্জাতিক ওশান সায়েন্স জার্নালে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে।
আমাদের প্রশ্ন- এই আত্মঘাত কি বন্ধ হবে না? ১৯৯৯ সালে প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা হিসেবে সেন্টমার্টিন চিহ্নিত হলেও সে অনুযায়ী সুরক্ষা ও নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা কেন গড়ে তোলা যায়নি- আমরা চাই বিলম্বে হলেও এ ব্যাপারে জবাবদিহি হোক। এই প্রশ্ন সবসময় প্রাসঙ্গিক- স্থানীয় প্রশাসন, জেলা ও বিভাগীয় পরিবেশ অধিদপ্তরের নাকের ডগায় দ্বীপ-মারা কর্মকাণ্ড চলে কীভাবে? দ্বীপটিকে রক্ষা করতে হলে কী করা প্রয়োজন, এ বিষয়ে দীর্ঘ তালিকা দেওয়া সম্ভব। আমরা মনে করি, অন্তত যদি অবৈধ স্থাপনাগুলো উচ্ছেদ করা যায়, তাহলেই পরিস্থিতির উল্লেখযোগ্য উন্নতি সম্ভব। এর আগে বিভিন্ন সময় উচ্ছেদ অভিযান চালাতে গিয়ে দেখা গেছে, বেশিরভাগই আদালত থেকে আগাম স্থগিতাদেশ নিয়ে বসে আছে। অবশ্য গত বছর সেপ্টেম্বরে খোদ উচ্চ আদালত হোটেল মালিকদের আবেদন খারিজ করে দেওয়ার পর এ বিষয়ে আর বাধা থাকতে পারে না। এখন আমরা দেখতে চাইব অবিলম্বে উচ্ছেদ অভিযান চালানো হয়েছে। এ ক্ষেত্রে স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা বোধগম্য নানা কারণেই বাধা দিয়ে থাকেন। কিন্তু ব্যক্তি বা গোষ্ঠীবিশেষের স্বার্থের দিকে তাকালে সামষ্টিক সম্পদ এই দ্বীপ রক্ষা করা যাবে না। আর যা প্রয়োজন, তা হচ্ছে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, দপ্তর ও সংস্থার মধ্যে সমন্বয়। বিভিন্ন সংস্থার মধ্যে চাপান-উতর আর দায় এড়ানোর প্রতিযোগিতায় পরিস্থিতির অবনতিই ঘটতে থাকবে কেবল।