দেশে করোনার গ্রাফ এই মুহূর্তে ঊর্ধ্বমুখী। ওমিক্রন দেশে নতুন করে আতঙ্ক সৃষ্টি করেছে। গত ১৩ তারিখ থেকে ওমিক্রন রোধে বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে। মাস্ক পরা বাধ্যতামূলক করা হলেও তা প্রতিপালনে এখন পর্যন্ত মানুষের মধ্যে ব্যাপক অনীহা পরিলক্ষিত হচ্ছে, যা দেশের সার্বিক করোনা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলতে পারে। পথে-ঘাটে-মাঠে কোথাও স্বাস্থ্যবিধি মানার চিত্র দেখা যাচ্ছে না। যে হারে উন্নত বিশ্বে ওমিক্রন ছড়াচ্ছে, সেই হারে যদি দেশে ওমিক্রন সংক্রমিত হয় তাহলে তা আয়ত্তে আনা খুবই কঠিন হতে পারে। কারণ ঊর্ধ্বমুখী ওমিক্রন মোকাবিলায় দেশের স্বাস্থ্য খাতের সক্ষমতা নিয়ে সন্তুষ্ট হওয়ার মতো কোনো উপযুক্ত কারণ নেই।
এমনিতেই দেশে চলতি মাসে রপ্তানি আদেশ কমে গেছে। ওমিক্রন বিবেচনায় ইউরোপসহ উন্নত বিশ্বের ক্রেতারা পণ্য ক্রয়ে ধীরে চলো নীতি অনুসরণ করছে। এ পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হলে রপ্তানি বাণিজ্য বাধাগ্রস্ত হতে পারে। এতে নতুন করে কর্মরত শ্রমিক চাকরি হারাতে পারে, যা চলমান পরিস্থিতি আরও জটিল করে তুলতে পারে। গত বছরের দীর্ঘ লকডাউনের সময় চাকরি হারানো বহু মানুষ বিকল্প হিসেবে কৃষিকে বেছে নিয়ে নতুন করে জীবনের পথচলা শুরু করেছিল। কিন্তু হঠাৎ কৃষিকাজে ব্যবহূত জ্বালানি তেল ডিজেলের অস্বাভাবিক দাম বৃদ্ধির ফলে কৃষির সঙ্গে তাদের এই পথচলা অনেকটাই ব্যাহত হয়েছে। দীর্ঘ সময় ধরে চলমান করোনা পরিস্থিতির কারণে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ বেশ খানিকটা হ্রাস পেয়েছে। ফলে নতুন করে সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে উল্লেখযোগ্য হারে কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়নি। জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির ফলে জনজীবনে নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি পাওয়ায় নিত্যব্যবহার্য দ্রব্যের দাম বৃদ্ধি পেয়েছে। দীর্ঘদিন যাবৎ সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন-ভাতা বৃদ্ধি না পেলেও দৈনন্দিন ব্যবহূত জিনিসপত্রের দাম হয়েছে কয়েক গুণ। আয়-ব্যয়ের হিসাব মিলিয়ে সংসার চালাতে গিয়ে হিমশিম খাচ্ছে নিম্ন আয়ের মানুষ।
বিশ্ববাসী যেমনটা ভেবেছিল, ২০২২ সালের সূচনা তেমনটা হয়নি। টানা দুই বছর বিশ্বব্যাপী করোনা মানুষের জীবনকে বিপর্যস্ত করেছে। করোনার ভয়াবহতায় সারা পৃথিবী বলতে গেলে এক ধরনের নিশ্চল হয়ে পড়েছিল। বিশ্ব অর্থনীতি অনেকটা স্থবির হয়ে পড়েছিল। বিশ্বব্যাপী ভ্যাকসিনেশন কার্যক্রম শুরুর ফলে সংক্রমণ ও মৃত্যুর সংখ্যা কমলে সবাই স্বাভাবিক জীবনে আশাবাদী হয়ে উঠেছিল। মানুষ ভেবেছিল, এই বুঝি বিশ্ব তার পুরোনো রূপে ফিরতে শুরু করল। তবে সে আশার প্রদীপ নিভিয়ে নতুন ভ্যারিয়েন্ট ওমিক্রনের প্রকোপ বিশ্বজুড়ে নতুন আতঙ্কের জন্ম দিয়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা জানিয়েছে, করোনাভাইরাসের নতুন ধরন ওমিক্রনকে কম ঝুঁকিপূর্ণ মনে করার কোনো কারণ নেই। ওমিক্রনে আক্রান্ত হয়ে মানুষ মারা যেতে পারে বলে তারা বিশ্বকে সতর্ক করে দিয়েছে।
এতদিন বিশেষজ্ঞরা বলে আসছেন, করোনার নতুন ধরন ওমিক্রন ডেলটার চেয়ে বেশি সংক্রামক হলেও তা কম প্রাণঘাতী। তবে সম্প্রতি ডব্লিউএইচও-প্রধান সতর্ক করে বলেছেন, করোনার অতিসংক্রামক ধরন ওমিক্রনকে কম ঝুঁকিপূর্ণ মনে করার সুযোগ নেই। সত্যিকার অর্থে এত স্বল্প সময়ে অধিকসংখ্যক মানুষ আক্রান্ত হয়েছেন যে, তা সামাল দিতে বিশ্বের স্বাস্থ্যব্যবস্থা হিমশিম খাচ্ছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা চেয়েছিল, ২০২১ সালের সেপ্টেম্বরের শেষ নাগাদ প্রতিটি দেশ তাদের জনসংখ্যার ১০ শতাংশকে আর ডিসেম্বরের শেষ নাগাদ ৪০ শতাংশকে টিকা দেওয়ার কাজ শেষ করবে। ২০২১ সালের শেষ নাগাদ বেঁধে দেওয়া সে লক্ষ্য অনেক দেশই পূরণ করতে পারেনি। ডব্লিউএইচওর ১৯৪টি সদস্য দেশের মধ্যে ৯২টি দেশই ৪০ শতাংশ মানুষকে টিকা দিতে ব্যর্থ হয়েছে। এমনকি ৩৬টি দেশ ১০ শতাংশ মানুষকেও টিকা দিতে পারেনি। এর বড় কারণ প্রয়োজনীয় সংখ্যক টিকার ডোজ হাতে না পাওয়া।
ইতোপূর্বে করোনা মোকাবিলায় বাংলাদেশ অনেকটা আলোচনা-সমালোচনা সত্ত্বেও ঘুরে দাঁড়িয়েছিল। যদিও সে সময় স্বাস্থ্য বিভাগের অনিয়ম, দুর্নীতি, অব্যবস্থাপনা ও সমন্বয়হীনতা নিয়ে দেশে-বিদেশে ব্যাপক সমালোচনা হয়েছিল। স্বাস্থ্য বিভাগের দুর্নীতি নিয়ে বহির্বিশ্বে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি দারুণভাবে ক্ষুণ্ণ হয়েছিল। ওমিক্রন মোকাবিলায় সরকারের সামনে পুনরায় তাদের সক্ষমতা প্রমাণের সময় এসেছে।
ড. মোহা. হাছানাত আলী : অধ্যাপক, আইবিএ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়
drhasnat77@gmail.com