দেশের একমাত্র প্রবাল দ্বীপ সেন্টমার্টিনের সৈকতে পড়ে থাকা বিভিন্ন প্লাস্টিক বর্জ্য দিয়ে সামুদ্রিক মাছ কোরাল ও কচ্ছপের ম্যুরাল তৈরি করেছে একদল গবেষক।  

গবেষকরা বলছেন, পর্যটকদের সচেতনতার মাধ্যমে সেন্টমার্টিনকে দূষণমুক্ত রাখতে দ্বীপটির পশ্চিম সৈকতের বালুচরে সামুদ্রিক প্রাণী দুটি তৈরি করা হয়েছে। 

কোরাল মাছটির লেজ ও পাখনা ও মাথা তৈরি করা হয়েছে সৈকতে পরে থাকা চিপস-বিস্কুটের মোড়ক দিয়ে। তবে মাছের বাকি অংশগুলোতে আইশ হিসেবে লাগানো হয়েছে পানির বোতল। 

পাশেই শোভা পাচ্ছে কচ্ছপ। সেটি বানাতে ব্যবহার করা হয়েছে পরিত্যক্ত পানির বোতল আর ছেঁড়া জাল। সঙ্গে প্লাষ্টিক দূষণে ক্ষতির মাত্রাসহ একটি নির্দেশিকাও।

কৃষি গবেষণা ফাউন্ডেশনের (কেজিএফ) আর্থিক সহায়তায় সেন্টমার্টিনে একটি গবেষণা করছে শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিশারিজ, অ্যাকুয়াকালচার, মেরিন সায়েন্স অনুষদ ও চ্যানেল টোয়েন্টিফোর। যার অংশ হিসেবে এই ম্যুরালটি তৈরি করা হয়। এটি তৈরিতে সহযোগিতা করে চট্টগ্রাম ভেটেরিনারি অ্যান্ড অ্যানিমেল সায়েন্সেস বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিশারিজ অনুষদ এবং জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা বিভাগের কয়েকজন শিক্ষার্থী।

গবেষণা দলের কো-প্রিন্সিপাল ইনভেস্টিগেটর ও চ্যানেল টোয়েন্টিফোরের জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক সিনিয়র রিপোর্টার ফয়জুল সিদ্দিকী জানান, ২০১৪ সাল থেকে সেন্টমার্টিন দ্বীপকে প্লাস্টিকমুক্ত রাখতে কেওক্রাডং বাংলাদেশের একজন স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে কাজ করছেন তিনি।  দেশের প্লাস্টিক দূষণ নিয়ে গবেষণার জন্য ২০১৯ সালে শ্রীলংকাতে গিয়ে প্রশিক্ষণও নেন ফয়জুল সিদ্দিকী। 

তিনি বলেন, এই প্রশিক্ষনের সময় সেন্টমার্টিনের জলে-স্থলে প্লাস্টিক দূষণ নিয়ে গবেষণা করার বিষয়টি মাথায় আসে। পরে কৃষি গবেষণা ফাউন্ডেশন-কেজিএফকে জানালে, বিধি অনুযায়ী মেরিন বায়োলজিষ্ট শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. কাজী আহসান হাবীব স্যারকে প্রধান করে একটি গবেষণা দলকে অর্থায়ন করে।

বিষয়টি নিয়ে কেজিএফের নির্বাহী পরিচালক ড. জীবন কৃষ্ণ বিশ্বাস বলেন, প্লাস্টিক বর্জ্যের কারণে দূষিত হচ্ছে মাছ। যার প্রভাব পড়ছে মানব শরীরেও। একজন মানুষ তার গড় আয়ুষ্কালে কমপক্ষে ১৮ কেজি প্লাস্টিক বিভিন্নভাবে গ্রহণ করেন। তাই গবেষণার পাশাপাশি সচেতনতা বাড়াতেই এ প্রচেষ্টা।

তিনি আরও বলেন, সেন্টমার্টিন এমন একটি দ্বীপ যাকে রক্ষা করতে হলে, শুধু গবেষণা করলে হবে না, পর্যটকদের সচেতনতাও করতে হবে। গবেষণা ও পর্যটকদের সচেতনতা এই দুটোর মনিকাঞ্চণের জন্য এই অর্থায়ন।  

গবেষণা দলের প্রধান অধ্যাপক ড. কাজী আহসান হাবীব বলেন, প্রথমে আমরা জনসচেতনতা বাড়াতে লিফলেট বিতরণ করতে চেয়েছিলাম। পরে ভাবলাম পর্যটক ও স্থানীয় বাসিন্দারা লিফলেটের লেখা পড়ে কাগজগুলো সমুদ্র সৈকতে ফেলে দেবে, তা আবার সমুদ্রে গিয়ে মিশবে। তাই পরিবেশ সম্পর্কে জনসচেতনতা বাড়াতে পরিত্যক্ত আবর্জনা দিয়েই কোরাল মাছ ও একটি কচ্ছপের ভাস্কর্য তৈরি করা হয়।

তিনি জানান, গবেষণা শেষে, সৈকত ও সমুদ্র তলদেশে প্লাস্টিকের ধরন ও পরিমাণ নিরূপণ করে এর থেকে পরিত্রাণে সম্ভাব্য উপায় সম্বলিত একটি রূপরেখা ও সুপারিশমালা দেয়া হবে সরকারকে। 

চলতি বছরের জানুয়ারির শুরুতে সমুদ্র সম্পদের টেকসই আহরণের লক্ষ্যে বঙ্গোপসাগরের এক হাজার ৭৪৩ বর্গকিলোমিটার এলাকাকে ‘সেন্টমার্টিন মেরিন প্রটেক্টেড এরিয়া’ ঘোষণা করে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ক মন্ত্রণালয়। 

দেশের সর্বদক্ষিণ-পূর্বে মিয়ানমার সীমান্তের কাছে সাগরের বুকে ৮ দশমিক ৩ বর্গকিলোমিটার আয়তনের ছোট্ট প্রবালদ্বীপ সেন্ট মার্টিন। কক্সবাজার জেলা শহর থেকে এর দূরত্ব ১২০ কিলোমিটার।

এ দ্বীপ সামুদ্রিক কাছিমের প্রজনন ক্ষেত্র। এ ছাড়া এখানে ৬৮ প্রজাতির প্রবাল, ১৫১ প্রজাতির শৈবাল, ১৯১ প্রজাতির মোলাস্ট বা কড়ি জাতীয় প্রাণী, ৪০ প্রজাতির কাঁকড়া, ২৩৪ প্রজাতির সামুদ্রিক মাছ, পাঁচ প্রজাতির ডলফিন, চার প্রজাতির উভচর প্রাণী, ২৮ প্রজাতির সরীসৃপ, ১২০ প্রজাতির পাখি, ২০ প্রজাতির স্তন্যপায়ী প্রাণী, ১৭৫ প্রজাতির উদ্ভিদ, দুই প্রজাতির বাদুড়সহ নানা প্রজাতির প্রাণীর বসবাস ছিল এককালে।

এসব প্রজাতির অনেকগুলো এখন বিলুপ্তির পথে। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলেও ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে এসব জীববৈচিত্র্য।

জীববৈচিত্র্য রক্ষায় ১৯৯৯ সালে সেন্ট মার্টিনের ৫৯০ হেক্টর এলাকাকে ‘পরিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা’ ঘোষণা করেছিল সরকার।