চান্দ্র নববর্ষে বসন্তের আগমন উদযাপন করতে যাচ্ছে চীন। চীনা পঞ্জিকা অনুসারে এটি 'বাঘবর্ষ'। চীনা সংস্কৃতিতে বাঘ সাহসিকতা ও শক্তির প্রতীক। চীনা জনগণ প্রায়ই তেজস্বী ড্রাগন ও গতিশীল বাঘ কিংবা উঁচুতে ওড়া ড্রাগন ও লাফানো বাঘের উল্লেখ করে। মানবতা যে গুরুতর চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি, তা মোকাবিলায় আমাদের অবশ্যই 'বাঘের সঙ্গে ডানা যুক্ত করতে হবে'। এগিয়ে যাওয়ার পথে সব বাধা অতিক্রম করতে বাঘের মতো সাহস ও শক্তি নিয়ে কাজ করতে হবে। মহামারির ছায়া মুছে ফেলতে এবং আর্থসামাজিক পুনরুদ্ধার ও উন্নয়ন জোরদারে আমাদের অবশ্যই প্রয়োজনীয় সবকিছু করতে হবে, যাতে আশার সূর্যালোক মানবতার ভবিষ্যৎকে আলোকিত করতে পারে।
এক শতাব্দীতে কখনও দেখা যায়নি, বিশ্ব আজ এমন অনেক বড় পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। এই পরিবর্তনগুলো একটি নির্দিষ্ট সময়, ঘটনা, দেশ বা অঞ্চলে সীমাবদ্ধ নয়; বরং আমাদের সময়ের সুগভীর এবং ব্যাপক পরিবর্তনগুলোর প্রতিনিধিত্ব করে। কীভাবে মহামারিকে পরাস্ত করা যায় এবং কীভাবে কভিড-পরবর্তী বিশ্ব গড়ে তোলা যায়? এখন বিশ্বজুড়ে বড় এই ইস্যুগুলো মানুষের সাধারণ উদ্বেগের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। এ ছাড়া এগুলো প্রধান ও জরুরি প্রশ্ন, যার উত্তর আমাদের অবশ্যই দিতে হবে। 
একটি চীনা প্রবাদে বলা হয়- 'পৃথিবীর গতিবেগ হয় বিকাশ লাভ করে বা হ্রাস পায়; বিশ্বের অবস্থা হয় অগ্রগতি লাভ করে অথবা পশ্চাদপসরণ করে।' বিশ্ব সব সময় বৈপরীত্যের মধ্য দিয়ে বিকশিত হচ্ছে। বৈপরীত্য ছাড়া কিছুই থাকবে না। মানবতার ইতিহাস হলো বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষার মধ্য দিয়ে প্রবৃদ্ধি অর্জনের এবং বিভিন্ন সংকটকে অতিক্রম করে উন্নয়নের ইতিহাস। ঐতিহাসিক অগ্রগতির যুক্তি অনুসরণ করে আমাদের এগিয়ে যেতে হবে এবং উন্নয়ন করতে হবে।
সব উত্থান-পতন সত্ত্বেও মানবতা এগিয়ে যাবে। আমাদের দীর্ঘ ইতিহাসচক্রের তুলনা থেকে শিক্ষা গ্রহণ করতে হবে এবং কোনো কিছুর মধ্যে সূক্ষ্ণ ও ক্ষুদ্র পরিবর্তনও প্রত্যক্ষ করতে হবে। আমাদের সংকটের মধ্যে নতুন সুযোগ তৈরি করতে হবে; পরিবর্তনশীল দৃশ্যপটে নতুন দিগন্ত উন্মোচন করতে হবে এবং অসুবিধা ও চ্যালেঞ্জের মধ্য দিয়ে এগিয়ে যাওয়ার জন্য দুর্দান্ত শক্তি যোগ করতে হবে।
প্রথমত, আমাদের সহযোগিতার পথে যেতে হবে এবং যৌথভাবে মহামারিকে পরাস্ত করতে হবে। এক শতাব্দীতে একবারের মহামারির মুখোমুখি হয়ে, যা মানবতার ভবিষ্যৎকে প্রভাবিত করবে, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় একটি দৃঢ় যুদ্ধ করেছে। বাস্তবিক ঘটনাগুলো আবারও প্রমাণ করেছে- বিশ্বব্যাপী সংকটের প্রবল স্রোতের মধ্যেও দেশগুলো প্রায় ১৯০টি ছোট নৌকায় আলাদাভাবে উঠছে না, বরং সবাই এক বিশাল জাহাজে রয়েছে, যার ওপর আমাদের সমন্বিত ভাগ্য নির্ভর করে। ছোট নৌকাগুলো ঝড় থেকে বাঁচতে পারে না, কিন্তু একটি বিশাল জাহাজ ঝড়কে মোকাবিলা করার জন্য যথেষ্ট শক্তিশালী। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সমন্বিত প্রচেষ্টাগুলোকে ধন্যবাদ, মহামারির বিরুদ্ধে বিশ্বব্যাপী লড়াইয়ে বড় অগ্রগতি সাধিত হয়েছে। তা সত্ত্বেও এটি একটি প্রলম্বিত মহামারি হিসেবে প্রমাণিত হচ্ছে; ভিন্ন ভিন্ন ধরন নিয়ে পুনরুত্থিত হচ্ছে; আগের চেয়ে দ্রুত ছড়িয়ে পড়েছে। এটি মানুষের নিরাপত্তা ও স্বাস্থ্যের জন্য গুরুতর হুমকি সৃষ্টি করছে এবং বিশ্ব অর্থনীতিতে গভীর প্রভাব ফেলছে।
দৃঢ় আত্মবিশ্বাস এবং সহযোগিতা মহামারিকে পরাস্ত করার একমাত্র সঠিক উপায় হিসেবে প্রতিভাত। একে অপরকে পেছনে টেনে ধরা বা দোষারোপ করা এই মহামারি মোকাবিলায় কেবলই অপ্রয়োজনীয় বিলম্বের কারণ হবে এবং সামগ্রিক লক্ষ্যবস্তু থেকে আমাদের মনোযোগ ভিন্নমুখী করবে। কভিড-১৯ এর বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা জোরদার করতে হবে; ওষুধের গবেষণা ও উন্নয়নে সক্রিয় সহযোগিতা চালাতে হবে; করোনাভাইরাসের বিরুদ্ধে যৌথভাবে বহুবিধ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা তৈরি করতে হবে এবং সবার জন্য স্বাস্থ্যের একটি বৈশ্বিক সম্প্রদায় গড়ে তোলার প্রচেষ্টা ত্বরান্বিত করতে হবে। বিশেষ গুরুত্বের বিষয় হলো- লড়াইয়ের হাতিয়ার হিসেবে টিকার পূর্ণ ব্যবহার; এর সুষম বণ্টন নিশ্চিত; দ্রুত টিকা প্রদান এবং বিশ্বব্যাপী টিকাদানের বৈষম্য দূর করা; যাতে সত্যিকার অর্থে মানুষের জীবন, স্বাস্থ্য ও জীবিকা রক্ষা করা যায়।
চীন এমন একটি দেশ, যে তার প্রতিশ্রুতি রক্ষা করে। চীন এরই মধ্যে ১২০টির বেশি দেশে এবং আন্তর্জাতিক সংস্থায় দুই বিলিয়ন ডোজ টিকা পাঠিয়েছে। এর পরও চীন আফ্রিকান দেশগুলোকে আরও এক বিলিয়ন ডোজ দেবে, যার মধ্যে ৬০০ মিলিয়ন ডোজ দেওয়া হবে অনুদান হিসেবে। এ ছাড়া চীন ১৫০ মিলিয়ন ডোজ টিকা আসিয়ানভুক্ত দেশগুলোকে দান করবে।
দ্বিতীয়ত, আমাদের বিভিন্ন ঝুঁকির সমাধান করতে হবে এবং বিশ্ব অর্থনীতির স্থিতিশীল পুনরুদ্ধার কার্যক্রমকে উৎসাহিত করতে হবে। বিশ্ব অর্থনীতি খাদ থেকে উঠে এলেও এখনও অনেক প্রতিবন্ধকতার মুখোমুখি। বিশ্বব্যাপী শিল্প ও সরবরাহ চেইন ব্যাহত হয়েছে। দ্রব্যমূল্য অব্যাহতভাবে বেড়ে চলেছে। জ্বালানি সরবরাহ টানটান। এই ঝুঁকিগুলো একটি অন্যটিকে জটিল করে তোলে এবং অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারে অনিশ্চয়তা বাড়ায়। বিশ্বব্যাপী নিম্ন মুদ্রাস্ম্ফীতির পরিবেশ উল্লেখযোগ্যভাবে পরিবর্তিত হয়েছে এবং একাধিক কারণে মুদ্রাস্ম্ফীতির ঝুঁকি দেখা যাচ্ছে। বৃহৎ অর্থনীতিগুলো যদি তাদের মুদ্রানীতি কঠোর করে কিংবা উল্টো পথে চলে, তাহলে গুরুতর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। তারা বৈশ্বিক অর্থনৈতিক ও আর্থিক স্থিতিশীলতার জন্য চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে এবং উন্নয়নশীল দেশগুলো এর আসল অভিঘাত বহন করবে। চলমান কভিড-১৯ প্রতিক্রিয়ার প্রেক্ষাপটে, আমাদের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির নতুন চালক, সামাজিক জীবনের নতুন পদ্ধতি এবং মানুষে মানুষে বিনিময়ে নতুন পথগুলো অন্বেষণ করতে হবে, যাতে আন্তঃসীমান্ত বাণিজ্য সহজতর করা যায়; শিল্প ও সরবরাহ চেইন সুরক্ষিত ও মসৃণ রাখা যায় এবং বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের স্থির ও দৃঢ় অগ্রগতি বৃদ্ধি করা যায়।
অর্থনৈতিক বিশ্বায়ন সময়ের প্রবণতা। যদিও নদীতে বিপরীত স্রোতের অস্তিত্ব নিশ্চিত, তবে কেউই এটিকে সমুদ্রের দিকে প্রবাহিত হতে বাধা দিতে পারেনি। চালিকাশক্তিগুলো নদীর গতিকে শক্তিশালী করে, অন্যদিকে প্রতিরোধ এর প্রবাহকে বাড়িয়েও তুলতে পারে। ঠিক নদীর মতোই পথের বিপরীত স্রোত এবং বিপজ্জনক মাছের ঝাঁক সত্ত্বেও অর্থনৈতিক বিশ্বায়ন কখনোই পথভ্রষ্ট হয়নি এবং হবেও না। বিশ্বব্যাপী দেশগুলোর উচিত সত্যিকারের বহুপাক্ষিকতাবাদ বহাল রাখা। আমাদের বাধাগুলো অপসারণ করা উচিত; দেয়াল খাড়া করা নয়। আমাদের উচিত উন্মুক্ত করা; বন্ধ করা নয়। আমাদের চাওয়া উচিত সংহতি; বিচ্ছেদ নয়। এটি একটি উন্মুক্ত বিশ্ব অর্থনীতি গড়ে তোলার উপায়। আমাদের উচিত বিশ্বব্যাপী শাসনব্যবস্থার সংস্কারকে ন্যায্যতা ও ন্যায়বিচারের নীতিতে পরিচালিত করা এবং বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থাকে কেন্দ্রে রেখে বহুপক্ষীয় বাণিজ্য ব্যবস্থাকে সমুন্নত রাখা। আমাদের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং ডিজিটাল অর্থনীতির জন্য পূর্ণ পরামর্শের ভিত্তিতে সাধারণভাবে গ্রহণযোগ্য এবং কার্যকর নিয়ম তৈরি করা উচিত এবং বৈজ্ঞানিক ও প্রযুক্তিগত উদ্ভাবনের জন্য একটি উন্মুক্ত, ন্যায়সংগত ও বৈষম্যহীন পরিবেশ তৈরি করা উচিত। এটি অর্থনৈতিক বিশ্বায়নকে আরও উন্মুক্ত, অন্তর্ভুক্তিমূলক, ভারসাম্যপূর্ণ এবং সবার জন্য কল্যাণকর করা এবং বিশ্ব অর্থনীতির প্রাণশক্তিকে সম্পূর্ণরূপে উন্মুক্ত করার উপায়।
আমাদের মধ্যে একটি সাধারণ বোঝাপড়া হলো, বিশ্ব অর্থনীতিকে সংকট থেকে পুনরুদ্ধারের দিকে নিয়ে যেতে সামষ্টিক-নীতি সমন্বয় জোরদার করা অপরিহার্য। প্রধান অর্থনীতিগুলোর উচিত বিশ্বকে এক সম্প্রদায় হিসেবে দেখা; আরও নিয়মতান্ত্রিক উপায়ে চিন্তা করা; নীতির স্বচ্ছতা এবং তথ্য আদান-প্রদান বৃদ্ধি করা এবং আর্থিক ও মুদ্রানীতির উদ্দেশ্য, তীব্রতা এবং গতির সমন্বয় করা, যাতে বিশ্ব অর্থনীতির পুনরায় ধস রোধ করা যায়। প্রধান উন্নত দেশগুলোর উচিত হবে দায়িত্বশীল অর্থনৈতিক নীতি গ্রহণ; নীতির প্রসারণ পরিচালনা এবং উন্নয়নশীল দেশগুলোর ওপর মারাত্মক প্রভাব এড়ানো। আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে তাদের গঠনমূলক ভূমিকা পালন করতে হবে বৈশ্বিক ঐকমত্য তৈরি করতে; নীতিগত সমন্বয় বাড়াতে এবং পদ্ধতিগত ঝুঁকি প্রতিরোধ করতে।
তৃতীয়ত, আমাদের উন্নয়ন বিভাজন দূর এবং বৈশ্বিক উন্নয়ন পুনরুজ্জীবিত করতে হবে। বৈশ্বিক উন্নয়নের প্রক্রিয়া মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত হয়েছে, উত্তর-দক্ষিণ ব্যবধান বাড়ছে, পুনরুদ্ধারের গতিপথ বিচ্ছিন্ন হচ্ছে, উন্নয়ন চ্যুতিরেখা এবং প্রযুক্তিগত বিভাজনের মতো আরও অভিনব সমস্যা তৈরি করছে। গত ৩০ বছরের মধ্যে প্রথমবারের মতো মানব উন্নয়ন সূচক কমেছে। বিশ্বের দরিদ্র জনসংখ্যা ১০০ মিলিয়নেরও বেশি বেড়েছে। প্রায় ৮০০ মিলিয়ন মানুষ ক্ষুধার্ত থাকছে। খাদ্য নিরাপত্তা, শিক্ষা, কর্মসংস্থান, ওষুধ, স্বাস্থ্য এবং জনগণের জীবিকার জন্য গুরুত্বপূর্ণ অন্যান্য ক্ষেত্রে অসুবিধা বাড়ছে। কিছু উন্নয়নশীল দেশ মহামারির কারণে দারিদ্র্য ও অস্থিতিশীলতার মধ্যে পতিত হয়েছে। উন্নত দেশগুলোও অনেক কঠিন সময়ের মধ্য দিয়ে দিনযাপন করছে।
পথে যত বাধাই আসুক না কেন, আমাদের অবশ্যই একটি জনকেন্দ্রিক উন্নয়নের দর্শন মেনে চলতে হবে; বিশ্বব্যাপী সামষ্টিক-নীতিতে উন্নয়ন এবং জীবিকাকে সামনে ও কেন্দ্রে রাখতে হবে; টেকসই উন্নয়নের জন্য জাতিসংঘের ২০৩০ এজেন্ডা বাস্তবায়ন করতে হবে এবং বিশ্বব্যাপী ভারসাম্যপূর্ণ উন্নয়নের জন্য আমাদের উন্নয়ন সহযোগিতার বিদ্যমান প্রক্রিয়াগুলোর মধ্যে বৃহত্তর সমন্বয় গড়ে তুলতে হবে। আমাদের সাধারণ কিন্তু ভিন্নধর্মী দায়িত্বের নীতিকে সমুন্নত রাখতে হবে; উন্নয়নের প্রেক্ষাপটে জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ে আন্তর্জাতিক সহযোগিতাকে উন্নীত করতে হবে এবং জলবায়ু পরিবর্তন-সংক্রান্ত জাতিসংঘের ফ্রেমওয়ার্ক কনভেনশনে কপ২৬-এর ফলাফল বাস্তবায়ন করতে হবে। উন্নত অর্থনীতিগুলোর উচিত তাদের নির্গমন হ্রাসের দায়িত্ব পালনে নেতৃত্ব দেওয়া; তাদের আর্থিক ও প্রযুক্তিগত সহায়তার প্রতিশ্রুতি পূর্ণ করা এবং জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলা ও টেকসই উন্নয়ন অর্জনে উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য প্রয়োজনীয় পরিবেশ সৃষ্টি করা।
গত বছর আমি জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে একটি বৈশ্বিক উন্নয়ন উদ্যোগ পেশ করেছিলাম, যাতে উন্নয়নশীল দেশগুলো যে জরুরি চ্যালেঞ্জগুলোর মুখোমুখি, তার প্রতি আন্তর্জাতিক দৃষ্টি আকর্ষণ করা যায়। উদ্যোগটি সর্বসাধারণের জন্য কল্যাণকর, যা সমগ্র বিশ্বের জন্য উন্মুক্ত। যার লক্ষ্য হলো টেকসই উন্নয়নের জন্য ২০৩০ এজেন্ডার সঙ্গে সমন্বয় সাধন এবং সারাবিশ্বে সাধারণ উন্নয়নকে জোরদার করা। চীন সব অংশীদারের সঙ্গে যৌথভাবে উদ্যোগকে বাস্তব রূপ দিতে এবং এ প্রক্রিয়ায় কোনো দেশ যাতে পিছিয়ে না থাকে, তা নিশ্চিত করতে প্রস্তুত।
চতুর্থত, আমাদের শীতল যুদ্ধের মানসিকতা পরিত্যাগ এবং শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান-সংশ্নিষ্ট সব পক্ষের জন্য লাভজনক ফলাফল অনুসন্ধান করতে হবে। আমাদের পৃথিবী আজ শান্তিপূর্ণ হওয়া থেকে অনেক দূরে; বিদ্বেষ ও পক্ষপাত উদ্রেককারী আড়ম্বরপূর্ণ ভাষার ব্যবহার প্রচুর। নিয়ন্ত্রণ, দমন বা সংঘাতের মতো কাজগুলো বিশ্বশান্তি ও নিরাপত্তার জন্য সর্বৈব ক্ষতি বয়ে আনে, যা সামান্যতম কল্যাণকর নয়। ইতিহাস বারবার প্রমাণ করেছে- সংঘর্ষ সমস্যার সমাধান করে না; এটা কেবল বিপর্যয়কর পরিণতিকে আমন্ত্রণ জানায়। সুরক্ষাবাদ ও একতরফাবাদ কাউকে রক্ষা করতে পারে না; তারা শেষ পর্যন্ত অন্যদের পাশাপাশি নিজের স্বার্থকেও আঘাত করে। আধিপত্য এবং উৎপীড়নের অনুশীলনগুলো আরও খারাপ, যা ইতিহাসের গতিধারার বিপরীতে চলে। স্বভাবতই দেশগুলোর মধ্যে ভিন্নতা ও মতানৈক্য রয়েছে। তবুও একটি শূন্য-সমষ্টি পদ্ধতি, যা অন্যের ব্যয়ে নিজের লাভকে প্রসারিত করে তা সাহায্য করবে না। অন্যান্য দেশের অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগত অগ্রগতি আটকে রাখতে জাতীয় নিরাপত্তার ধারণা প্রসার এবং বিশ্বকে মেরূকরণের মাধ্যমে ছোট বৃত্ত বা ব্লককে উৎসাহের সঙ্গে একত্র করে 'উচ্চ প্রাচীরসহ একচেটিয়া অঙ্গন' বা 'সমান্তরাল ব্যবস্থা' নির্মাণের কাজ; মতাদর্শগত বৈরিতাকে উস্কে দেওয়া এবং অর্থনৈতিক, বৈজ্ঞানিক ও প্রযুক্তিগত বিষয়গুলোর রাজনৈতিকীকরণ সাধারণ চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক প্রচেষ্টাকে গুরুতরভাবে দুর্বল করবে।
মানবতার জন্য এগিয়ে যাওয়ার সঠিক পথ হলো শান্তিপূর্ণ উন্নয়ন এবং সংশ্নিষ্ট সব পক্ষের জন্য সমানভাবে লাভজনক সহযোগিতা। বিভিন্ন দেশ ও সভ্যতা একে অপরের প্রতি শ্রদ্ধার ভিত্তিতে একসঙ্গে সমৃদ্ধ হতে পারে এবং পার্থক্যগুলো দূরে সরিয়ে রেখে সাধারণ ভিত্তি এবং সংশ্নিষ্ট সব পক্ষের জন্য সমান ফলাফলের সন্ধান করতে পারে।
আমাদের উচিত ইতিহাসের ধারা অনুসরণ করা; একটি স্থিতিশীল আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার জন্য কাজ করা; মানবতার সাধারণ মূল্যবোধগুলো সমর্থন করা এবং মানব জাতির সমন্বিত ভবিষ্যতের জন্য একটি সম্প্রদায় গড়ে তোলা। আমাদের উচিত সংঘাতের পরিবর্তে সংলাপ বেছে নেওয়া; বাদ দেওয়ার পরিবর্তে অন্তর্ভুক্তি এবং সব ধরনের একতরফাবাদ, সুরক্ষাবাদ, আধিপত্য বা ক্ষমতার রাজনীতির বিরুদ্ধে দাঁড়ানো।
গত বছর চীনের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিসি) তার প্রতিষ্ঠার ১০০তম বার্ষিকী উদযাপন করেছে। এক শতাব্দীর কঠিন সংগ্রামের মধ্য দিয়ে সিপিসি দেশের অগ্রগতি ও জনগণের জীবনযাত্রার উন্নতিতে সাফল্য অর্জনে চীনা জনগণকে একতাবদ্ধ করেছে এবং নেতৃত্ব দিয়েছে। আমরা পরিকল্পনা অনুযায়ী সব দিক দিয়ে একটি মাঝারি মানের সমৃদ্ধ সমাজ প্রতিষ্ঠা করেছি ও দারিদ্র্যের বিরুদ্ধে যুদ্ধে জয়ী হয়েছি এবং চরম দারিদ্র্য অবসানের ঐতিহাসিক সমাধান খুঁজে পেয়েছি। এখন চীন সর্বক্ষেত্রে একটি আধুনিক সমাজতান্ত্রিক দেশ গড়ার পথে নতুন যাত্রা শুরু করছে।
চীন উচ্চমানের উন্নয়ন অন্বেষণে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ থাকবে। চীনের অর্থনীতি সামগ্রিকভাবে ভালো গতিপথে রয়েছে। গত বছর চমৎকার উচ্চ প্রবৃদ্ধি এবং তুলনামূলক কম মুদ্রাস্ম্ফীতির দ্বৈত লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করে আমাদের জিডিপি প্রায় ৮ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক পরিবেশের পরিবর্তনগুলো প্রচণ্ড চাপ নিয়ে এসেছে, তবে শক্তিশালী স্থিতিস্থাপকতা, বিপুল সম্ভাবনা এবং দীর্ঘমেয়াদি স্থায়িত্বেও বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত চীনা অর্থনীতির মৌলিক বিষয়গুলো অপরিবর্তিত রয়েছে। চীনের অর্থনীতির ভবিষ্যৎ নিয়ে আমরা পূর্ণ আত্মবিশ্বাসী।
'একটি দেশের সম্পদ তার জনগণের প্রাচুর্য দ্বারা পরিমাপ করা হয়।' উচ্চ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে ধন্যবাদ, চীনা জনগণ অনেক উন্নত জীবনযাপন করছে। তা সত্ত্বেও আমরা গভীরভাবে সচেতন যে আরও উন্নত জীবনের জন্য জনগণের আকাঙ্ক্ষা পূরণ করতে দীর্ঘ মেয়াদে আমাদের এখনও অনেক কঠোর পরিশ্রম করতে হবে। চীন স্পষ্ট করেছে- আমরা ব্যক্তিবিশেষের সার্বিক উন্নয়ন এবং সমগ্র জনসংখ্যার সাধারণ সমৃদ্ধির জন্য আরও দৃশ্যমান ও উল্লেখযোগ্য অগ্রগতির চেষ্টা করছি। এ লক্ষ্য পূরণে আমরা সর্বক্ষেত্রে কঠোর পরিশ্রম করছি। আমরা যে সাধারণ সমৃদ্ধি কামনা করি, তা সমতাবাদ নয়। উপমা দিয়ে বলা যায়, আমরা প্রথমে পাইটি বড় করব এবং তার পরে যুক্তিসংগত প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থার মাধ্যমে এটি সঠিকভাবে ভাগ করব। একটি ক্রমবর্ধমান জোয়ার যেমন সমস্ত নৌকাকে ভাসিয়ে তোলে, তেমনি সবাই উন্নয়ন থেকে ন্যায্য অংশ পাবে এবং উন্নয়নের প্রাপ্তি আমাদের জনগণকে আরও উল্লেখযোগ্য এবং ন্যায়সংগত উপায়ে উপকৃত করবে।
চীন সংস্কার ও উন্মুক্তকরণে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ থাকবে। চীনের জন্য সংস্কার ও উন্মুক্তকরণ সব সময় প্রক্রিয়াধীন কাজ। আন্তর্জাতিক দৃশ্যপটে যে পরিবর্তনই হোক না কেন, চীন সর্বদা সংস্কার ও উন্মুক্তকরণের ব্যানার উঁচু করে রাখবে। চীন বাজারকে সম্পদ বরাদ্দের ক্ষেত্রে একটি নির্ধারক ভূমিকা পালন করতে দেবে এবং সরকার যাতে তার ভূমিকা আরও ভালোভাবে পালন করে, সেদিকে লক্ষ্য রাখবে। আমরা সরকারি খাতকে একত্রীকরণ ও উন্নয়নে অবিচল থাকব, ঠিক যেমন আমরা বেসরকারি খাতের উন্নয়নকে উৎসাহিত, সমর্থন এবং পথনির্দেশনায় অবিচল। আমরা একটি একীভূত, উন্মুক্ত, প্রতিযোগিতামূলক এবং সুশৃঙ্খল বাজার ব্যবস্থা গড়ে তুলব, যেখানে সব ব্যবসা আইনের সামনে সমান মর্যাদা ভোগ করবে এবং বাজারে সমান সুযোগ পাবে। চীনে আইন ও প্রবিধান মেনে কাজ করার জন্য এবং দেশের উন্নয়নে ইতিবাচক ভূমিকা পালনের জন্য সব ধরনের পুঁজিকে স্বাগত জানানো হয়। চীন উচ্চমানের উন্মুক্তকরণের সম্প্রসারণ অব্যাহত রাখবে; নিয়ম, ব্যবস্থাপনা এবং মান পূর্ণ করে এমন প্রাতিষ্ঠানিক উন্মুক্তকরণ ক্রমাগতভাবে এগিয়ে নেবে; বিদেশি ব্যবসায়ের প্রতি জাতীয়ের মতো আচরণ করবে এবং উচ্চমানের বেল্ট অ্যান্ড রোড সহযোগিতার প্রচার করবে। এই বছরের ১ জানুয়ারি রিজিওনাল কম্প্রিহেনসিভ ইকোনমিক পার্টনারশিপ (আরসিইপি) চুক্তি কার্যকর হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে চীন বিশ্বস্ততার সঙ্গে তার বাধ্যবাধকতা পূরণ করবে এবং অন্যান্য আরসিইপি পক্ষের সঙ্গে অর্থনৈতিক ও বাণিজ্য সম্পর্ক গভীর করবে। চীন আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক অর্থনীতিতে আরও একীভূতকরণ এবং পারস্পরিক সুবিধা অর্জন ও সংশ্নিষ্ট সব
পক্ষের জন্য লাভজনক ফলাফলের লক্ষ্যে কম্প্রিহেনসিভ অ্যান্ড প্রগ্রেসিভ এগ্রিমেন্ট ফর ট্রান্স-প্যাসিফিক পার্টনারশিপ (সিপিটিপিপি) এবং ডিজিটাল ইকোনমি পার্টনারশিপ এগ্রিমেন্টে (ডিইপিএ) যোগদানের জন্য কাজ চালিয়ে যাবে। 
চীন পরিবেশগত সংরক্ষণের প্রচারে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ থাকবে। যেমনটি বহুবার বলেছি, সম্পদের ক্ষয় এবং পরিবেশগত অবনতির মূল্যে আমাদের কখনোই অর্থনীতির বিকাশ করা উচিত নয়, যা মাছ পাওয়ার জন্য পুকুর নিস্কাশনের মতো বা পরিবেশ রক্ষার জন্য আমাদের প্রবৃদ্ধিকে বিসর্জন দেওয়া উচিত নয়, যা মাছ ধরার জন্য গাছে আরোহণের মতো। আমাদের দর্শন বলে- পরিস্কার পানি এবং সবুজ পর্বতগুলো সোনা ও রৌপ্যের মতোই মূল্যবান। চীন তার পাহাড়, নদী, বন, কৃষিভূমি, হ্রদ, তৃণভূমি ও মরুভূমিগুলোর সামগ্রিক সংরক্ষণ করেছে এবং নিয়মতান্ত্রিক শাসন চালিয়েছে। আমরা বাস্তুসংস্থান ব্যবস্থা সংরক্ষণ, দূষণ প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণকে তীব্রতর করতে এবং আমাদের জনগণের জীবনযাত্রা ও কাজের পরিবেশ উন্নত করতে যা যা করা যায়, তা করি। চীন এখন বিশ্বের বৃহত্তম জাতীয় উদ্যান ব্যবস্থাপনা স্থাপন করছে। গত বছর আমরা সফলভাবে জীববৈচিত্র্য কনভেনশন কপ১৫ আয়োজন করেছি এবং একটি পরিচ্ছন্ন ও সুন্দর বিশ্ব গড়তে চীনের অংশের অবদান রেখেছি।
কার্বন নির্গমন সর্বোচ্চ মাত্রায় পৌঁছানো এবং কার্বন নিরপেক্ষতা চীনের নিজস্ব উচ্চমানের উন্নয়নের অন্তর্নিহিত প্রয়োজনীয়তা ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে একটি আনুষ্ঠানিক অঙ্গীকার। চীন প্রতিশ্রুতিকে সম্মান করবে এবং তার লক্ষ্যে কাজ করে যাবে। আমরা ২০৩০ সালের আগে কার্বন ডাইঅক্সাইড নির্গমনের সর্বোচ্চ মাত্রা সম্পন্ন করতে একটি কর্মপরিকল্পনা উন্মোচন করেছি, যা জ্বালানি, শিল্প এবং নির্মাণের মতো নির্দিষ্ট খাতের জন্য বাস্তবায়ন পরিকল্পনা অনুসরণ করে। চীনে এখন বিশ্বের বৃহত্তম কার্বন বাজার এবং বৃহত্তম পরিবেশবান্ধব বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যবস্থা রয়েছে :চীনের নবায়নযোগ্য জ্বালানির উৎপাদন ক্ষমতা এক বিলিয়ন কিলোওয়াট ছাড়িয়ে গেছে এবং ১০০ মিলিয়ন কিলোওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন বায়ু এবং ফটোভোলটাইক (সৌর) বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের কাজ চলছে। কার্বনের সর্বোচ্চ নির্গমন এবং কার্বন নিরপেক্ষতা রাতারাতি বাস্তবায়ন করা যায় না। দৃঢ় এবং স্থির পদক্ষেপের মাধ্যমে চীন নতুন জ্বালানির নির্ভরযোগ্য প্রতিস্থাপনের জন্য চিরাচরিত জ্বালানির ব্যবহার পর্যায়ক্রমে বন্ধে একটি সুশৃঙ্খল পন্থা অনুসরণ করবে। এই পন্থা, যা পুরাতনকে পর্যায়ক্রমে বিলুপ্ত করে এবং নতুনকে আনার সমন্বয় করে, তা স্থির অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়ন নিশ্চিত করবে। চীন জলবায়ু-সংক্রান্ত আন্তর্জাতিক সহযোগিতায় সক্রিয়ভাবে জড়িত থাকবে এবং একটি সবুজতর অর্থনীতি ও সমাজে সম্পূর্ণ রূপান্তরের জন্য যৌথভাবে কাজ করবে।
বেইজিং অলিম্পিক এবং প্যারা-অলিম্পিক শীতকালীন গেমস শিগগিরই শুরু হবে। আমরা আত্মবিশ্বাসী- চীন বিশ্বকে একটি সুবিন্যস্ত, নিরাপদ এবং জাঁকজমকপূর্ণ গেমস উপহার দেবে। বেইজিং ২০২২-এর দাপ্তরিক স্লোগান- 'একসঙ্গে একটি সমন্বিত ভবিষ্যতের জন্য'। আসুন, আমরা পূর্ণ আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে হাত মেলাই এবং একটি সমন্বিত ভবিষ্যতের জন্য একসঙ্গে কাজ করি।
শি জিনপিং: গণপ্রজাতন্ত্রী চীনের প্রেসিডেন্ট; নিবন্ধটির বঙ্গানুবাদ ঢাকাস্থ চীনা দূতাবাস সূত্রে প্রাপ্ত