শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা দুই সপ্তাহ ধরে যে আন্দোলন করছেন, তা বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষাঙ্গনে নতুন নয়। আমরা দেখেছি, ক্ষমতাসীন সরকারের টানা এক যুগের শাসনামলে বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্তত পাঁচজন উপাচার্য শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের মুখে পদত্যাগ করতে বাধ্য হন। বুধবার শিক্ষাবিদ মুহম্মদ জাফর ইকবাল শাবিপ্রবির আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের অনশন ভাঙালেও উপচার্যের পদত্যাগ দাবিতে আন্দোলন চলছে। ওই দিন সন্ধ্যায় প্রেস ব্রিফিংয়ে শিক্ষার্থীদের দাবি-দাওয়া বাস্তবায়নে শিক্ষামন্ত্রীর আশ্বাস প্রমাণ করেছে- আন্দোলন যথার্থ। বৃহস্পতিবার সমকালের শীর্ষ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যকে সরানো হচ্ছে। প্রশ্ন হচ্ছে- এ আন্দোলন আমলে নিতে প্রশাসনের এত সময় লাগল কেন?

আমরা জানি, শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয়ে আন্দোলন শুরু হয় একটি ছাত্রী হলের আবাসিক সমস্যার সমাধান ও প্রাধ্যক্ষের পদত্যাগসহ তিন দফা দাবিতে। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন চাইলে অভ্যন্তরীণ ওইসব দাবির সুরাহা করতে পারত। কিন্তু তা না করে আমরা বিস্ময়ের সঙ্গে দেখেছি, ক্ষমতাসীন ছাত্র সংগঠন তখন আন্দোলনকারীদের ওপর হামলা চালায়। এর সঙ্গে পুলিশও শিক্ষার্থীদের লাঠিপেটা করে; তখন এটি উপাচার্যের পদত্যাগের আন্দোলনে পরিণত হয়। এর আগেও শিক্ষার্থীদের যৌক্তিক আন্দোলন দমাতে ক্ষমতাসীন ছাত্র সংগঠন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে ব্যবহার করতে আমরা দেখেছি।

উপাচার্যরা কেন ক্ষমতাসীন ছাত্র সংগঠনকে লাঠিয়াল বাহিনী হিসেবে ব্যবহার করছেন? এর কারণও অস্পষ্ট নয়। বস্তুত উপাচার্য হওয়ার ক্ষেত্রে যখন ক্ষমতাসীন দলের আস্থাভাজন হওয়াই মুখ্য বিষয় হয়ে দাঁড়ায়, তখন বিশ্ববিদ্যালয়ের অভিভাবকরা উচ্চশিক্ষালয়কে যে কোনোভাবে ব্যবহার করতে চান। অথচ জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বায়ত্তশাসন দিয়েছিলেন, যাতে প্রশাসন স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নিয়ে উচ্চশিক্ষার প্রতিষ্ঠানগুলোকে বিশ্বমানে উপনীত করতে পারে। তারপরও বিশ্ববিদ্যালয়ে দলীয়করণ হয়েছে। যে সরকার যখন ক্ষমতায় গেছে তাদের আস্থাভাজনরাই প্রশাসনে দায়িত্ব পালন করছেন। এর ফলে যেমন শিক্ষক রাজনীতি ব্যাপকভাবে বেড়েছে, তেমনি ক্ষমতাসীন ছাত্র সংগঠনের দাপটও বেড়েছে। অনেক ক্ষেত্রে তারাই বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে আবাসিক হলের সিট নিয়ন্ত্রণ করছে।


আমরা চাই, অনতিবিলম্বে শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের দাবি মেনে নিয়ে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হোক। বিশ্ববিদ্যালয়টিতে দীর্ঘদিন শিক্ষকতা করছেন এমন যোগ্য কাউকে উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ দিলে তার জন্য সেখানকার সমস্যা চিহ্নিতকরণ এবং সমাধানের পথ বের করা সহজ হবে। দলীয় দৃষ্টিভঙ্গির ঊর্ধ্বে সর্বোচ্চ যোগ্যতার একজন শিক্ষাবিদকেই উপাচার্য করতে হবে। আমরা জানি, বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্যতম কাজ গবেষণা ও নতুন জ্ঞান সৃষ্টি। সেদিক থেকে বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো দিন দিন পিছিয়ে যাচ্ছে। সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো জনপ্রত্যাশা পূরণ করতে পারছে না। একই সঙ্গে অনেক ক্ষেত্রে শিক্ষার পরিবেশ বজায় রাখতেও ব্যর্থ হচ্ছে। এ কারণে বিশ্ব র‌্যাঙ্কিংয়ে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো জায়গা করে নিতে পারছে না।
শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয়ের চলমান আন্দোলনের ব্যাপারে আমরা ইতোমধ্যে এই সম্পাদকীয় স্তম্ভে বলেছি, সৃষ্ট পরিস্থিতির দায় প্রশাসন এড়াতে পারে ন।

আমরা দেখেছি, বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের অযৌক্তিক দীর্ঘসূত্রতা এবং একের পর এক অবিমৃষ্যকারী সিদ্ধান্তের কারণে পরিস্থিতির অবনতি ঘটেছে। আমরা মনে করি, উপাচার্য ও তার প্রশাসনের উচিত হবে অবিলম্বে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের প্রতি সম্মান জানিয়ে বুদ্ধিমত্তার পরিচয় দেওয়া। প্রশাসনের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলোরও যথাযথ তদন্ত হওয়া চাই। বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার পরিবেশ রক্ষার স্বার্থেই সেখানকার শিক্ষার্থীদের ওপর হামলাকারী ছাত্রলীগ নামধারী দুর্বৃত্তদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বার্থেই আবাসন, খাদ্য, সেবা ও পরিবেশ উন্নয়নে ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।

আমরা চাই, নীতিনির্ধারকরা যেমন শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয়ের সংকট কাটাতে ব্যবস্থা নেবেন, তেমনি দেশের অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয় তথা গোটা উচ্চশিক্ষার বিদ্যমান সমস্যা সমাধানেও মনোযোগী হবেন। কিছুদিন পরপর যেভাবে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো নানা কারণে অস্থিতিশীল হয়ে ওঠে, তাতে শিক্ষার্থীরাই ক্ষতিগ্রস্ত হন। করোনা মহামারির কারণে এমনিতেই শিক্ষার্থীরা পিছিয়ে রয়েছেন। তার ওপর এসব আন্দোলনের কারণে যদি শিক্ষার স্বাভাবিক পথ রুদ্ধ হয়, তা দুঃখজনক। আমরা প্রত্যাশা করি, শিক্ষামন্ত্রী যেভাবে আশ্বাস দিয়েছেন, বাস্তবে সেভাবে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করে সরকার আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের পড়ার টেবিলে ফিরিয়ে নেওয়ার পাশাপাশি ব্যবস্থা বদলে পদক্ষেপ নেবে।