সাবেকুন নাহার সনি- নামটির সঙ্গে আমরা সবাই কি পরিচিত? বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) কেমিকৌশল বিভাগের (৯৯ ব্যাচ) মেধাবী ছাত্রী সনিকে আমরা ক'জন মনে রেখেছি? ২০০২ সালের ৮ জুন টেন্ডারবাজিকে কেন্দ্র করে ছাত্রদলের দুই গ্রুপের গোলাগুলির মধ্যে গুলিবিদ্ধ হয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এস এম হলের সামনে মারা যান সনি। তার মৃত্যুতে সেদিন জ্বলে উঠেছিল গোটা দেশ। সনি হত্যাকাণ্ডের দুই দশক পার হচ্ছে। এখন যারা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত, তারা তখন রাজনীতিতে আসেননি।

কিন্তু 'বিশ্বজিৎ' নামটির সঙ্গে এখনকার ছাত্রনেতাদের পরিচিত থাকার কথা। ২০১২ সালের ৯ ডিসেম্বর বিএনপি-জামায়াতের হরতাল কর্মসূচি প্রতিরোধে সকাল থেকেই পুরান ঢাকায় সক্রিয় ছিল ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা। বাহাদুর শাহ পার্কের সামনে ছাত্রলীগ অবরোধবিরোধী মিছিল করে, সেখান থেকে কয়েকটি ককটেলও ছোড়া হয়। লোকজন দৌড়াদৌড়ি করছিল। সকাল সাড়ে ৯টা থেকে ১০টার দিকে বিশ্বজিৎ ওই রাস্তা দিয়ে যাচ্ছিলেন। তখন কেউ একজন তাকে লক্ষ্য করে শিবির বলে ডাক দেয়। এর পরই ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা ধারালো অস্ত্র এবং রড দিয়ে তার ওপর হামলা করে। সে দৌড়ে পাশের একটি ভবনে গিয়ে আত্মরক্ষার চেষ্টা করেও রক্ষা হয়নি। সেখানে গিয়েও তার ওপর হামলা করা হয়। ফলে অকালে প্রাণ হারান বিশ্বজিৎ।

বিশ্বজিৎ হত্যার এক দশক পার হয়ে গেছে। তাও হয়তো অনেকেই ভুলে গেছেন। কারণ নতুন ইস্যু এলে পুরোনো ইস্যু চাপা পড়ে যায়। তবে ২০১৯ সালের ৭ অক্টোবর হত্যাকাণ্ডের শিকার বুয়েটের ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড ইলেকট্রনিক্স ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী আবরার ফাহাদের কথা এত তাড়াতাড়ি অনেকেরই ভুলে যাওয়ার কথা নয়। এ ঘটনা দেশে আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল। উল্লিখিত তিনটি হত্যাকাণ্ডের মধ্যে বিশ্বজিতের খুনটি ক্যাম্পাসের বাইরে। অন্য দুটি বুয়েট ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে। তিনটি হত্যাকাণ্ডের খুনিই বৃহৎ রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগ-বিএনপির সহযোগী ছাত্র সংগঠন ছাত্রলীগ ও ছাত্রদলের নেতাকর্মী। বছর ঘুরে এগুলোও পুরোনো হয়ে গেছে।

গত ২৬ জানুয়ারি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) বিজয় একাত্তর হলে প্রথম বর্ষের এক অসুস্থ শিক্ষার্থীকে ডেকে নিয়ে গালিগালাজ, শারীরিক ও মানসিকভাবে নির্যাতনের অভিযোগ উঠেছে বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের কয়েকজন নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে। সেদিন রাত ১০টার দিকে হলের টিভিরুমে এ ঘটনা ঘটে। ভুক্তভোগী আকতারুল ইসলাম গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের ২০২০-২১ সেশনের শিক্ষার্থী। এ ঘটনায় তিনি হলের প্রাধ্যক্ষ ও কলা অনুষদের ডিন অধ্যাপক ড. আব্দুল বাছির বরাবর একটি লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন। অভিযুক্তরা ছাত্রলীগের হল কমিটির পদপ্রত্যাশী আবু ইউনুস ও রবিউল হাসান রানার অনুসারী বলে সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে। এর আগে ২০১৭ সালের ৩ জুন গায়ে ধাক্কা লাগা নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষার্থীকে বেদম মারধরের অভিযোগে হল থেকে সাময়িক বহিস্কার হন অভিযুক্ত রানা ও ইউনুস। আকতারুল নির্মম নির্যাতনের শিকার হন একই বিশ্ববিদ্যালয়ের বড় ভাইদের। তার অপরাধ বড় ভাইদের ডাকে তিনি টিভিরুমে যাননি। সপ্তাহখানেক আগে বাবা স্ট্রোক করায় মানসিক বিপর্যস্ত আকতার না যাওয়ার কারণ ব্যাখ্যা করলেও মনের বরফ গলেনি অভিযুক্তদের।

টানা দেড় বছর বন্ধ থাকার পর গত বছরের ৫ অক্টোবর খুলে দেওয়া হয় বিশ্ববিদ্যালয়ের হলগুলো। হল খোলার পর গণরুম বিলুপ্তির কথা থাকলেও বাস্তবে তার কোনো প্রতিফলন দেখা যায়নি, বন্ধ হয়নি গেস্টরুম। ক্যাম্পাস খোলার পর বিভিন্ন হলে অন্তত ১৫ শিক্ষার্থী বিভিন্ন সময় গেস্টরুমে নির্যাতনের শিকার হয়েছেন বলে সংবাদমাধ্যমে উঠে এসেছে। অভিযোগের তীর যখন ছাত্রলীগের দিকে যায়, তখন আরও লজ্জা পাই। এই সংগঠনটির রয়েছে বর্ণাঢ্য অতীত। কিন্তু সাম্প্রতিককালে কতিপয় তথাকথিত নেতাকর্মীর কর্মকাণ্ড সংগঠনটির সোনালি অতীতে কালিমা লেপন করছে।

বিশ্ববিদ্যালয়ে গত সাড়ে তিন মাসে ১৫ শিক্ষার্থীকে গেস্টরুমে ডেকে নিয়ে নির্যাতনের খবর নতুন নয়। সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠে এ ধরনের বর্বরতা চলতে থাকলে অন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেও তা ভাইরাসের মতো ছড়িয়ে পড়তে পারে। সনি, বিশ্বজিৎ ও আবরার হত্যাকাণ্ডের রায় হয়েছে। কিন্তু শিক্ষাঙ্গনে শারীরিক ও মানসিক যে নির্যাতন চলছে তা নিরসনের দায় কার? সভ্যতা-মানবতার আর কত কলঙ্কিত হবে?

মিজান শাজাহান: সাংবাদিক
mizanshajahan@gmail.com