বহু আকাঙ্ক্ষিত নির্বাচন কমিশন নিয়োগের আইন জাতীয় সংসদে পাস করা হলো বৃহস্পতিবার, ২৭ জানুয়ারি ২০২২ তারিখে। পঞ্চাশ বছর আগে আমাদের সদ্যস্বাধীন দেশে প্রণীত সংবিধান ১৯৭২ সালের ১৬ ডিসেম্বর থেকে কার্যকর হয়েছিল। ওই বছর ৪ নভেম্বর সংবিধান সংসদে তথা তৎকালীন গণপরিষদে গৃহীত হয়। সংবিধানে একটি অনুচ্ছেদে বলা আছে যে, নির্বাচন কমিশন গঠিত হবে এতদ্বিষয়ে প্রণীত কোনো আইনের বিধানাবলি সাপেক্ষে। এটা আইনটি করতে সংসদকে সংবিধানের সুস্পষ্ট আজ্ঞা, যা গত অর্ধশতাব্দীতে অনুসরণ করতে রাজনীতিবিদরা ইচ্ছুক ছিলেন না। সংবিধান অনুযায়ী প্রধান নির্বাচন কমিশনার ও নির্বাচন কমিশনারদের নিয়োগের ক্ষমতা রাষ্ট্রপতির। রাষ্ট্রপতির এই ক্ষমতাকে সরকারের নির্বাহী অংশ তথা নির্বাচিত সরকারের প্রধানমন্ত্রীরা যথেচ্ছভাবে ব্যবহার করে তৃপ্তি পেয়েছেন। কারণ সংবিধান অনুসারেই দুটি ক্ষেত্র (প্রধানমন্ত্রী ও প্রধান বিচারপতি নিয়োগ) বাদে রাষ্ট্রপতির সব কাজ করতে হয় প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে পরামর্শক্রমে। দেশে বারবার প্রধান নির্বাচন কমিশনার নিয়োগ নিয়ে রাজনৈতিক বিতণ্ডা ও সংঘাত হয়েছে। নির্বাচনের নিরপেক্ষতা ও বিশ্বাসযোগ্যতা বিনষ্ট হয়েছে। নির্বাচন কমিশন নিন্দিত হয়েছে। আওয়ামী লীগ ২০১২ সাল থেকে নির্বাচন কমিশন গঠনের আইন প্রণয়নের প্রতিশ্রুতি দিয়েও তা করেনি। অবশেষে নির্বাচন কমিশন নিয়োগকে রাজনৈতিক আলোচনার আওতায় আনা দেখানোর জন্য গত দু'দফা নিয়োগের আগে বিভিন্ন দলের সঙ্গে রাষ্ট্রপতির উদ্যোগে পৃথক সংলাপ ও অনুসন্ধান বা সার্চ কমিটি গঠন করা হয়। তবু পুরো প্রক্রিয়াটি ক্ষমতাসীন সরকারের নিয়ন্ত্রণে থাকায় গ্রহণযোগ্য ও জনগণের কাছে বিশ্বাসযোগ্য হয়নি। নির্বাচন কমিশনও বিতর্কেও ঊর্ধ্বে উঠতে পারেনি।

এইবার সে রকম তৃতীয় উদ্যোগ শুরু হলে এবং অনেকগুলো রাজনৈতিক দল সংলাপ বর্জন করার আভাস দিলে আমরা গত ডিসেম্বরে সম্পাদকীয় লিখে সংবিধান নির্দেশিত আইনটি প্রণয়নে সরকারকে তাগিদ দিই। আবার গত ১৭ জানুয়ারি মন্ত্রিসভা আইন করার সিদ্ধান্ত নিয়ে খসড়া আইনে নীতিগত অনুমোদন দিলে আমরা সরকারি পদক্ষেপকে এক ধাপ অগ্রগতি বলে অকুণ্ঠ সাধুবাদ জানাই। এক্ষণে বৃহস্পতিবার 'প্রধান নির্বাচন কমিশনার এবং অন্যান্য নির্বাচন কমিশনার নিয়োগ বিল-২০২২' সংসদে পাস হওয়ায় আমাদের আহদ্মাদিত হওয়ার কথা। নাই মামার চেয়ে কানা মামা ভালো বা একেবারে না-হওয়ার চেয়ে বিলম্বে হওয়া ভালো প্রবাদ মেনে আমরা সরকারকে ধন্যবাদ জানাতেই পারি। কিন্তু দুঃখের সঙ্গে বলতে হচ্ছে, পরিপূর্ণ হূষ্টচিত্তে সরকারকে ধন্যবাদ জানাতে পারছি না। সংসদের ভেতরে ও বাইরের নাগরিক সমাজে প্রচণ্ড সমালোচনার মধ্যে আইনটি পাস হয়েছে। আইনটি পাসের আগের প্রক্রিয়ার ধাপগুলোতে ছোট ছোট সংশোধন এনে দণ্ডপ্রাপ্ত ব্যক্তিকে নির্বাচন কমিশনার পদে অযোগ্য করা ও সার্চ কমিটিতে রাষ্ট্রপতির মনোনীত দুই সদস্যের একজন নারী হওয়ার বিধান করা হয়েছে। এটি সরকারের সুমতি। কিন্তু আইনটির মৌলিক চরিত্র সর্বাধিক অংশগ্রহণমূলক করা তথা সার্চ কমিটিতে ও নির্বাচন কমিশন গঠন প্রক্রিয়ায় সম্ভাব্য ব্যাপকতম রাজনৈতিক সংশ্নিষ্টতা, ক্ষমতাসীন ও বিরোধী দলের প্রতিনিধিত্ব থাকার সুযোগ রাখা হয়নি। সাংবিধানিক পদের অধিকারীদের সার্চ কমিটিতে থাকা যুক্তিযুক্ত, যদিও তারা সরকারের নিযুক্ত, উন্নত দেশেও তাই আছে, কিন্তু রাষ্ট্রপতির, প্রকারান্তরে প্রধানমন্ত্রীর দু'জন নাগরিক প্রতিনিধি রাখা, আইনটিকে একান্তভাবে সার্চ কমিটির প্রাধান্যপূর্ণ রাখা ও আগের দুটি সার্চ কমিটিকে ভূতাপেক্ষ আইনি হেফাজত দেওয়ায় আইনটি অত্যন্ত সংকীর্ণ দৃষ্টিপ্রসূত ও স্বচ্ছ উদ্দেশ্যের নয় বলে প্রতীয়মান হয়। আইনের প্রতি ব্যাপক রাজনৈতিক সমর্থন এবং জনগণের আস্থা ও বিশ্বাস না থাকলে আইনের কার্যকরতা দুর্বল হতে বাধ্য। আইনের ঘোষিত লক্ষ্য পূরণেও তা সক্ষম হতে পারে না।

দীর্ঘদিন গণতন্ত্রের জন্য লাড়াকু দল ও স্বাধীনতার লক্ষ্যে মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্বদানকারী দল আওয়ামী লীগের কাছে নিবর্তনমূলক ও অস্বচ্ছ আইনের ওপর নির্ভরশীল না হয়ে অধিকতর গণতান্ত্রিক ও প্রগতিশীল উদার আইনের দ্বারা দেশ শাসন জনগণের কাম্য। এর বিপরীতটা নয়।