বাবাকে প্রতিনিয়ত মনে পড়ে। বাবাকে নিয়ে অনেক স্মৃতি। এই প্রৌঢ়কালেও বাবাকে নিয়ে সেই স্মৃতি জ্বলজ্বল করে মানসপটে। তাকে হারিয়েছি আজ থেকে ৬৮ বছর আগে, ৪ ফেব্রুয়ারি ১৯৫৪ সালে। তাকে শেষ দেখা দেখতে পারিনি। এ বেদনা আমাকে আমৃত্যু বয়ে বেড়াতে হবে। আমার বাবা রমেশ চন্দ্র মৈত্র জন্মেছিলেন ১৯০০ সালে। ১৯২০ সালে পাবনা এডওয়ার্ড কলেজে পড়াকালে আমার পিতামহ (ঠাকুরদা) মৃত্যুবরণ করেন। বাবা তখন সংসারের হাল ধরতে আমাদের পৈতৃক গ্রাম পাবনা জেলার সাঁথিয়া থানার ভুলবাড়িয়া গ্রামে চলে আসতে বাধ্য হন। শুরু হয় জীবনের আরেক নতুন অধ্যায়। গ্রামে এসে ভুলবাড়িয়া প্রাইমারি স্কুলে সহকারী শিক্ষকের পদে চাকরি গ্রহণ করেন। তখন ম্যাট্রিকুলেট হলেই প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক হওয়া যেত। তবে অবশ্যই তাকে জিটি পাস হতে হতো। জিটি মানে গুরু ট্রেইনিং, যাকে এখন পিটিআই পাস বলা হয়। বাবা জিটি না পড়ায় আজীবন সহকারী শিক্ষক পদেই থেকে যান।
১৯৪৩ সালে দেখা দেয় দুর্ভিক্ষ, পঞ্চাশের মন্বন্তর বলে যা ইতিহাসে পরিচিত। তখন এই ভূখণ্ডের মানুষের করুণ চেহারা দেখেছি; শুনেছি তাদের আর্তস্বর। ওই অধ্যায় এখনও মনে দাগ কাটে। ওই সময় প্রথম দফায় এক দিন সন্ধ্যায় খেলার মাঠ থেকে বাড়ি ফিরে দেখি, বাবা গালে হাত দিয়ে আমাদের শোয়ার ঘরের বারান্দায় চেয়ার পেতে নির্বাক বসে আছেন। ছুটে গেলাম রান্নাঘরে মায়ের কাছে। জিজ্ঞেস করলাম, বাবা গালে হাত দিয়ে বসে আছেন কেন! মা বললেন, হঠাৎ চালের দাম বেড়ে ১০ টাকা মণ হওয়ায় কী করে পরিবারের সবাইকে বাঁচাবেন, সেই দুশ্চিন্তায় তিনি বসে আছেন। বস্তুত বাবা তো ছিলেন প্রাইমারি স্কুলের শিক্ষক; বেতন মাসে পাঁচ টাকা মাত্র। কোনো বাড়তি উপার্জনও নেই; তাই এমন উদ্বেগ। বাজারে অন্যান্য পণ্যের মূল্যও বাড়ছে হুহু করে। তখন আর্থসামাজিক প্রেক্ষাপটে যে পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছিল, তা এক কথায় ভয়াবহ।
অবিভক্ত বাংলার তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী শেরেবাংলা একে ফজলুল হক কৃষক দরদি হিসেবে ছিলেন জনপ্রিয়। পঞ্চাশের মন্বন্তরে দুর্ভিক্ষের কবলে পড়ে যে কৃষকরা পেটের দায়ে জলের দামে জমি বিক্রি করে দিয়ে সর্বস্বান্ত হন; তাদের জমি উদ্ধার করে ফিরিয়ে দেওয়ার জন্য ঋণ সালিশি বোর্ড নামক এক সংস্থা সরকারিভাবে গঠন করা হয়। সিদ্ধান্ত হয়, বিধি অনুযায়ী প্রতি ইউনিয়নে বোর্ড গঠন হবে অধিবাসীদের মধ্য থেকে ভোটে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের নিয়ে। আমার খুব মনে পড়ছে, ওই খবরে উল্লসিত হলেও ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক সমাজ দুর্নীতির আশঙ্কায় সৎ লোকদের চেয়ারম্যান-মেম্বার হিসেবে নির্বাচিত করতে আগ্রহী হন। আশপাশের গ্রাম থেকে লোকজন এলেন বাবার কাছে বোর্ডের চেয়ারম্যান পদে দাঁড়ানোর জন্য। বাবা অসম্মতি জানিয়ে বললেন, 'আমি তো রাজনীতি করি না; ভোটেও কোনোদিন দাঁড়াইনি। তবে তোমরা কাউকে দাঁড় করাও; আমি প্রকাশ্যে সমর্থন দেব। আমিও ওই দুর্ভিক্ষের একজন ভুক্তভোগী।' কৃষকরা তাতে রাজি না হয়ে বাবাকে দাঁড় করাতে বাধ্য করলেন। তখন জানতাম না, সৎ মানুষ হিসেবে স্কুলের বাইরেও তার এত জনপ্রিয়তা।
নির্বাচনে বাবা দাঁড়ালেন- এটা দেখে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় ইচ্ছুক অন্য সবাই সরে দাঁড়ালেন। বাবা হলেন বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত চেয়ারম্যান। বাবার কৃষক দরদি রূপটি এতদিন আমাদের অজানা ছিল। অজানা ছিল এলাকায় তার আকাশচুম্বী জনপ্রিয়তার কথাও। এর পর এলো পাকিস্তানের জোয়ার। নানা স্থান থেকে আসতে থাকল সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার ভয়ংকর সব খবর। গ্রামে থাকা নিরাপদ মনে না করে অজানা উদ্দেশে সপরিবারে বাবা প্রথমে চলে এলেন পাবনা শহরে এক ভাড়া নেওয়া কাঁচা বাসায়। ইতোমধ্যে আমি এন্ট্রান্স পাস করে এডওয়ার্ড কলেজে পড়াশোনা শুরু করেছি। ছাত্র রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়ি তখন পাবনায়। এলো ১৯৫৪ সালের নির্বাচন। মুসলিম লীগকে পরাজিত করার লক্ষ্যে হক-ভাসানী-সোহরাওয়ার্দীর নেতৃত্বে গঠিত হলো যুক্তফ্রন্ট। যুক্তফ্রন্ট গঠনের দাবি ছাত্র ইউনিয়নও উত্থাপন করেছিল। যুক্তফ্রন্টের প্রার্থীদের পক্ষে বিভিন্ন এলাকায় গিয়ে কাজ করার জন্য গঠিত হয়েছিল সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ। নির্বাচনে অংশ নেওয়া প্রার্থীদের তালিকা ঘোষণার পরপরই তাদের এলাকায় নির্বাচনী অভিযান পরিচালনায় ৮-১০ জন করে ছাত্র নিয়ে টিম গঠন করা হয়। একটি টিম নিয়ে আমি গেলাম সুজানগর এলাকায়। সুজানগর থানা হেডকোয়ার্টারে ৪ ফেব্রুয়ারি জনসভা। আমি প্রধান বক্তা। অপরাহেপ্ত শুরু হওয়া ওই জনসভায় কথা বলতে শুরু করি দুই প্রার্থীর পক্ষে। একজন যুক্তফ্রন্ট মনোনীত, অপরজন সাধারণ আসন থেকে মনোনীত কমিউনিস্ট পার্টির কৃষক নেতা কমরেড অমূল্য লাহিড়ী। স্বাভাবিক কারণেই দীর্ঘ হয়ে যায় বক্তৃতা। ঘণ্টাখানেক ধরে বক্তৃতা করে যখন মঞ্চ থেকে নামছি, তখন সভাপতি একটি স্লিপ হাতে ধরিয়ে দিলে তা খুলে দেখি, ছাত্র ইউনিয়নের নেতা নূরুদ্দিনের চিঠি। তিনি লিখেছেন চিঠি পাওয়ামাত্র পাবনা ফিরে আসতে। শেষে বাসে পাবনা ফিরতে রাত প্রায় ১০টা। দেখা হলো নূরুদ্দিন ভাই ও সাজাহান মাহমুদের সঙ্গে। উভয়েই নির্বাক। কিছুই বুঝতে না পেরে জিজ্ঞেস করলাম, কী ব্যাপার! ডেকেছেন কেন? বেশ কিছুক্ষণ চুপ থেকে উভয়েই বললেন- বাবা নেই। মাথায় যেন আকাশ ভেঙে পড়ল। জিজ্ঞেস করলাম, বাবা সকালে মারা গেছেন, আর আমি খবর পেলাম এত বিলম্বে! বাবাকে শ্মশানে নিয়ে যাওয়া হয়েছে ততক্ষণে। কী দুর্ভাগ্য আমার! রাজনীতির টানে বাবার সঙ্গে শেষ দেখাটাও হলো না। গভীর শ্রদ্ধায় স্মরণ করছি বাবাকে।
রণেশ মৈত্র: রাজনীতিক ও জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক