যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক প্রতিষ্ঠান 'লেমকিন ইনস্টিটিউট ফর জেনোসাইড প্রিভেনশন' দ্বারা একাত্তরের গণহত্যার স্বীকৃতির ঠিক এক মাস পর গত ৩ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক আরেক গবেষণা প্রতিষ্ঠান 'জেনোসাইড ওয়াচ' 'বাংলাদেশে গণহত্যার ৫০তম বার্ষিকীর স্মরণে ঘোষণাপত্র' শিরোনামে এক বিবৃতিতে একাত্তরের গণহত্যাকে স্বীকৃতি দিল। প্রকাশিত বিবৃতিতে উল্লেখ ছিল, 'জেনোসাইড ওয়াচ এই স্বীকৃতি দিচ্ছে যে, পাকিস্তানি সেনাবাহিনী ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় বাঙালিদের ওপর যেসব অপরাধ করেছে, তার মধ্যে ছিল 'গণহত্যা, মানবতাবিরোধী অপরাধ এবং যুদ্ধাপরাধ'।

এখানে একটি বিষয় লক্ষণীয়, একাত্তর সালে বাংলাদেশের ভূখণ্ডে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী এবং তাদের এদেশীয় সহযোগীদের মাধ্যমে সংঘটিত হত্যা, ধর্ষণ, নির্যাতনসহ নানা অমানবিক কর্মকাণ্ডকে গণহত্যার সঙ্গে মানবতাবিরোধী অপরাধ এবং যুদ্ধাপরাধ হিসেবেও উল্লেখ করা হয়েছে। বাংলাদেশের সুবর্ণজয়ন্তীতে বাংলাদেশে গণহত্যার এটা দ্বিতীয় আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি। এতদিন বিভিন্ন ব্যক্তি পর্যায়ে বিভিন্ন দেশের গবেষক, বুদ্ধিজীবী, রাজনৈতিক বা সামাজিক কর্মে নিয়োজিত ব্যক্তিরা একাত্তরের গণহত্যার বিষয়ে আন্তর্জাতিক মহলের সোচ্চার হওয়ার দাবি তুলে আসছেন। কিন্তু প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায় থেকে মেলেনি একাত্তরের গণহত্যার স্বীকৃতি। পাঁচ দশকের প্রান্তে এসে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে গণহত্যা, যুদ্ধাপরাধ, মানবতাবিরোধী অপরাধ নিয়ে কাজ করা যুক্তরাষ্ট্রের দুটি গবেষণা প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে এলো একাত্তরে গণহত্যার স্বীকৃতি। ২০২১ সালের ডিসেম্বর মাসে শহীদ সাংবাদিক সিরাজুদ্দীন হোসেনের ছেলে তৌহীদ রেজা নূরের জেনোসাইড ওয়াচের কাছে একাত্তরের গণহত্যার স্বীকৃতির আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে এ স্বীকৃতি এলো। এটি বাংলাদেশের জন্য একটি বিরাট অর্জনের বিষয়।

'জেনোসাইড ওয়াচ' ১০টি বিষয়কে পর্যবেক্ষণপূর্বক গণহত্যা, যুদ্ধাপরাধ বা মানবতাবিরোধী অপরাধের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকে। একটি দেশ বা জাতির গণহত্যার স্বীকৃতির জন্য একটা প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে অবশ্যই যেতে হয়। সংস্থাটির সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখা, বিভিন্ন ধরনের গবেষণাপত্র, সর্বোপরি একাডেমিক এবং গবেষণাধর্মী ম্যাটারিয়াল, ডকুমেন্ট দিতে হয়। বাংলাদেশের পক্ষ থেকে এই ধরনের উপাত্ত সঠিকভাবে উপস্থাপিত হয়েছে বিধায় 'জেনোসাইড ওয়াচ' একাত্তরের গণহত্যাকে স্বীকৃতি দিয়েছে। এই স্বীকৃতির বিষয়ে কী ধরনের পর্যবেক্ষণ এসেছে সেটা আলোচনার দাবি রাখে।

প্রথমত, শ্রেণীবিন্যাস, যার আলোচনায় পূর্ব পাকিস্তান এবং পশ্চিম পাকিস্তানিদের মাঝে একটা বিভেদ, বিশেষত বাঙালি বলে বিভক্ত করার বিষয়টি দেখানো হয়েছে। দ্বিতীয়ত, প্রতীকীকরণে উঠে এসেছে পরিচয়পত্র এবং সরকারের তথ্য, বিভিন্ন পোশাক, ভাষা এমনকি সংস্কৃতির ভিন্নতার বিষয়গুলো, যা জেনোসাইড সংগঠনের ভূমিকা রেখেছে। তৃতীয়ত, বৈষম্য অংশে স্পষ্টত বলা হয়েছে, বাঙালির ওপর পাকিস্তান সরকার এবং সেনাবাহিনীর সদস্যরা অমোচনীয় বৈষম্যমূলক আচরণ করেছে। চতুর্থ বিষয় অমানবিকীকরণ, যেখানে পাকিস্তানিদের দ্বারা বাঙালির বিরুদ্ধে জাতিগত অপবাদ, বাঙালি ইসলামকে কলুষিত বিশেষত-হিন্দু ধর্ম দ্বারা কলুষিত মিথ্যা ইসলাম- বলে অবজ্ঞা এবং এমনকি গায়ের রঙের কারণে বর্ণবৈষম্য চিত্র উঠে এসেছে। পঞ্চমত, সংস্থা অংশে উঠে এসেছে, পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীর প্রত্যক্ষ তৎপরতায় বাংলাদেশে গণহত্যা সংঘটিত হয়েছে। এরপর, মেরূকরণ অংশে স্থান পেয়েছে বাংলা এবং উর্দু ভাষান মধ্যকার তুলনা এবং ভৌগোলিক বিষয়গুলো। 'প্রস্তুতি' পর্বে এই গণহত্যা সংঘটন যে পূর্বপরিকল্পিত ছিল সেটার আলোচনায় স্থান করে নিয়েছে ইয়াহিয়া খান এবং পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীর 'অপারেশন সার্চলাইট' বিবরণীটি।

১৯৭১ সালে এই ভূখণ্ডে পাকিস্তানি বাহিনী এবং তাদের দোসরদের দ্বারা সংঘটিত হত্যা, ধর্ষণ, নির্যাতন, সম্পত্তি ধ্বংসকরণ এবং জোর করে বাস্তুচ্যুতকরণের দিকগুলো বিশ্নেষণ করা হয়েছে 'নিপীড়ন' অংশে। বাঙালিকে পুরোপুরি নির্মূলের লক্ষ্যে তিন লাখ থেকে ত্রিশ লাখ বাঙালিকে গণহারে হত্যা করা হয়েছে। এটির উদ্দেশ্যই ছিল বাঙালি পুরোপুরি নির্মূলকরণ। সর্বশেষ, জেনোসাইড ওয়াচ দেখার চেষ্টা করেছে, এ ঘটনায় যারা অভিযুক্ত তাদের মধ্যে অস্বীকারের প্রবণতা রয়েছে কিনা? সেই বিষয়টিও খুঁজে পেয়েছে পর্যবেক্ষণে। শুধু যে পাকিস্তান অস্বীকার করে আসছে এমনটি নয়, সঙ্গে সঙ্গে আজ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য এমনকি জাতিসংঘ একাত্তরের গণহত্যার বিষয়কে স্বীকার করছে না। সার্বিক বিষয়ে 'জেনোসাইড ওয়াচ' এই মর্মে উপনীত হয়েছে যে, পাকিস্তানি রাষ্ট্র কর্তৃক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত, সুপরিকল্পিত, সমন্বিত, একযোগে হত্যার পরিকল্পনা এবং সামরিক বাহিনীর ভূমিকাকে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ের 'গণহত্যা' অপরাধকে নির্দেশ করে।

এই স্বীকৃতিতে কয়েকটি বিষয় স্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছে। এই ঘোষণাপত্রে পাকিস্তান বাহিনী এবং তাদের এদেশীয় দোসরদের ভূমিকাকে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে, যারা একাত্তরে গণহত্যার স্বীকৃতির বিষয়ে সন্দিহান প্রকাশ করেন, তাদের বিপক্ষে একটা ভালো জবাব। বর্তমানে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বিভিন্ন ফোরামেও আলোচনা হচ্ছে 'একাত্তরে গণহত্যা'র বিষয়টি। ২৫ জানুয়ারি জাতিসংঘে-সশস্ত্র সংঘর্ষে বেসামরিক নাগরিকদের সুরক্ষা :শহরগুলোতে যুদ্ধ, শহুরে জায়গায় বেসামরিক নাগরিকদের সুরক্ষা-শীর্ষক বিতর্কে অংশ হিসেবে ভারতের স্থায়ী দূত টিএস ত্রিমূর্তি পূর্ব পাকিস্তানে ১৯৭১ সালে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী কতৃক সংঘটিত গণহত্যার জন্য বিচারের এবং বাংলাদেশের অনেক প্রচেষ্টা সত্ত্বেও পাকিস্তান সেনাবাহিনীর কর্মকর্তাদের এখনও আন্তর্জাতিক আদালতে বিচারের আওতায় আনা হয়নি, সে বিষয়টি উল্লখ করেন। বাংলাদেশে গণহত্যা পঞ্চাশ বছর অতিক্রম করলেও এর ভয়াবহতা বিশ্বের কাছে এখনও স্মরণীয় হয়ে আছে। দীর্ঘদিন অতিক্রান্ত হয়েছে বলে বাংলাদেশে গণহত্যার স্বীকৃতি মিলবে না, এই ধারণা সম্পূর্ণ ভুল প্রমাণিত হয়েছে পরপর দুটি আন্তর্জাতিক সংগঠনের 'একাত্তরে গণত্যার স্বীকৃতি'। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় অটোমান সাম্রাজ্যের ১৫ লাখের বেশি আর্মেনীয়কে হত্যা করা হয়, যা ইতিহাসে আর্মেনিয়ান গণহত্যা হিসেবে পরিচিত। এই আর্মেনিয়ান গণহত্যার স্বীকৃতির জন্য অপেক্ষা করতে হয়েছে শত বছর। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এই ধরনের উদাহরণ থেকে শিক্ষা নিয়ে এগিয়ে যেতে হবে।

একাত্তরে গণহত্যার আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি অর্জন আমাদের জাতির জন্য অত্যন্ত প্রয়োজন। যারা এদেশের মানুষের ওপর নির্বিচারে হত্যাযজ্ঞ, ধর্ষণ, শিশু নির্যাতন, ভূমি দখল, অঙ্গহানি, দেশ ছাড়তে বাধ্য করার মতো ন্যক্কারজনক কর্মকাণ্ড ঘটিয়েছে তাদের বিচার, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে মুখোশ উন্মোচন এবং ভবিষ্যতে যেন এ ধরনের 'জেনোসাইড' বা অপরাধ সংঘটিত না হয়, সেই দিকে লক্ষ্য রাখা জরুরি। একাত্তরে গণহত্যার স্বীকৃতির জন্য বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় পর্যায় থেকে জাতিসংঘে জোরালোভাবে দাবি উপস্থাপন করতে হবে। মুক্তিযুদ্ধ, গণহত্যাভিত্তিক গবেষণা এবং একাডেমিক কার্যক্রমকে ত্বরান্বিত করতে হবে। স্মৃতি ও অবকাঠামো সংরক্ষণসহ বিভিন্ন ধরনের প্রামাণ্যচিত্র, গবেষণাপত্র, সচিত্র প্রতিবেদনের ওপর জোর দিতে হবে। স্বাধীনতার চার দশকের মাথায় বাংলাদেশের মাটিতে পাকিস্তানিদের এদেশীয় দোসরদের বিচার সংঘটিত হয়েছে। জেনোসাইড ওয়াচের এই স্বীকৃতি একাত্তরের গণহত্যার জাতিসংঘের স্বীকৃতির পথকে অনেক বেশি সুগম করে তুলবে। আমাদের প্রত্যাশায়, সেদিন আর খুব বেশি দূরে নয়, যেদিন একাত্তরে গণহত্যা সংঘটনে পাকিস্তানি সামরিক এবং বেসামরিক লোকেরা যারা যুক্ত ছিল, তাদের বিচারের আওতায় আনা সম্ভবপর হবে।