মজলুম জননেতা মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী প্রথম বাঙালি জাতিসত্তার অনুকূলে পৃথক একটি জাতিরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার স্বপ্নবীজ বপন করেছিলেন। ১৯৪০ সালের লাহোর প্রস্তাবের 'স্টেটস' শব্দটি তাকে আশাবাদীও করে তোলে। অন্নদাশঙ্কর রায় মওলানা ভাসানীকে নিয়ে লিখেছেন, 'তাকে পরিচয় করিয়ে দিতে অন্য কোনো নেতার তুলনা আনতে হয় না। তার সময়ে কিংবা তার আগে-পরে যত নেতা এসেছেন, মওলানা ভাসানী সবার থেকে আলাদা এক চরিত্র। কিংবা বলা যেতে পারে তিনি সম্পূর্ণ ভিন্ন এক আদর্শিক জগৎ, যেখানে মিলবে না মহাত্মা গান্ধী, শেরেবাংলা একে ফজলুল হক, সুভাষচন্দ্র বসু অথবা জয়প্রকাশ নারায়ণের মতো কোনো চরিত্র।' আর তাই তিনি পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার আন্দোলনের সঙ্গে জুড়ে দিয়েছিলেন জমিদারি প্রথা উচ্ছেদ আন্দোলন, কৃষক প্রজা মুক্তির আন্দোলন ইত্যাদি। কংগ্রেস, মুসলিম লীগের জমিদার শ্রেণির অনেক নেতাকেই তিনি তার আন্দোলনে শামিল করতে পেরেছিলেন। অন্যদিকে কৃষক-মেহনতি শ্রেণিকেও তাদের মুক্তিসংগ্রামে সোচ্চার করে তুলেছেন। ভারত-পাকিস্তান বিভক্তির শেষ সময়েও তিনি সিলেটের সফল গণভোট আর আসামে গণভোটের প্রস্তাব পেশের মধ্য দিয়ে বাঙালি জাতিসত্তার সঙ্গে নিজেকে আঁকড়ে ধরে রেখেছিলেন। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, ১৯৪৭ সালের দেশভাগ তার সেই আশা পরিপূর্ণ মেটাতে পারেনি।
মওলানা ভাসানী ১৯৪৮ সালের শুরুতেই উচ্চারণ করতে বাধ্য হলেন- 'আমরা কি সেন্ট্রাল গভর্নমেন্টের গোলাম?' ১৯৪৯ সালের ২৩ জুন আওয়ামী লীগ গঠন করলেন। ১৯৫৪ সালে শেরেবাংলা একে ফজলুল হক, হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীকে সঙ্গে নিয়ে ২১ দফার ভিত্তিতে যুক্তফ্রন্টের বিজয় নিশ্চিত করলেন। কিন্তু ক্ষমতা লাভের পর আওয়ামী লীগকে পুরোনো পথে হাঁটতে দেখে তিনি বিস্মিত হলেন। আয়োজন শুরু করলেন কাগমারী সম্মেলনের। ১৯৫৭ সালের ৭, ৮ ও ৯ ফেব্রুয়ারি টাঙ্গাইলের অজপাড়াগাঁ কাগমারীতেই তিনি ডাক দেন আন্তর্জাতিক এক সম্মেলনের। তৎকালীন প্রেক্ষাপটে আওয়ামী লীগপ্রধান হিসেবে নয়, বরং সম্পূর্ণরূপে ব্যক্তি উদ্যোগে আয়োজিত ও অনুষ্ঠিত কাগমারী সাংস্কৃতিক সম্মেলন বাংলাদেশের প্রথম আন্তর্জাতিক সাংস্কৃতিক-যুক্ত রাজনৈতিক সম্মেলন। এই সম্মেলনে তিনি বাঙালি জাতীয়তাবাদ আর তার সাংস্কৃতিক চৈতন্যোদয়ের ডাক দেন। কাগমারী সম্মেলনের মধ্য দিয়ে মওলানা ভাসানী বস্তুত স্বাধীন জাতিরূপে বাঙালি আর স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার সাংস্কৃতিক ভিত-ভূমি নির্মাণ করেছিলেন। এই সম্মেলনে তিনি পশ্চিম পাকিস্তানকে 'আসসালামু আলাইকুম' জানিয়ে শুধু স্বাধীনতার আগাম ঘোষণাই দেননি; একটি স্বাধীন দেশের আর্থসামাজিক-রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক দর্শনও উন্মোচন করে দিয়েছিলেন। আসলে সম্মেলনটি নামে সাংস্কৃতিক সম্মেলন হলেও সেখানে ভাষা, শিক্ষা, শিল্প, সাহিত্য, অর্থনীতি, ভূমিব্যবস্থা, কৃষি, রাসায়নিক শিক্ষা, নারীসহ বিশদ বিষয় ছিল আলোচনার বিষয়বস্তু। মওলানা ভাসানী কাগমারী সম্মেলনের এক ফাঁকে গ্রামের পথে হাঁটতে হাঁটতে ঔপন্যাসিক তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়কে বলেছিলেন, 'পূর্ববাংলা এক দিন স্বাধীন হবেই। ১২ বছরের মধ্যে পূর্ববাংলা পাকিস্তান থেকে বিচ্ছিন্ন হবে।' তাই এদেশের কৃষক, শ্রমিক, মেহনতি জনতার জন্য শোষণহীন, সাম্যভিত্তিক রাষ্ট্রব্যবস্থার একটি প্রতিচ্ছবি তিনি আঁকতে চেয়েছিলেন এই কাগমারীতে বসে।
আর কী হবে সেই স্বাধীন দেশের মানচিত্র, চিন্তা আর বোধের ধারণা? কাগমারী সম্মেলনের মধ্য দিয়ে তিনি একটি অসাম্প্রদায়িক বাঙালি জাতীয়তাবাদী চেতনার প্রবল প্রকাশ ঘটিয়েছিলেন। রাজনীতি আর সংস্কৃতির স্রোতধারাকে এক মোহনায় টেনে এনেছিলেন। যে পথ ধরে হেঁটে হেঁটেই আমরা স্বাধিকার থেকে স্বাধীনতা এবং স্বাধীন বাংলাদেশ পেয়েছি। কিন্তু দুঃখের বিষয়, কাগমারী সম্মেলন থেকে প্রাপ্ত সেই আর্থসামাজিক-রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক পরিচয় আমরা বহন করতে পারিনি। তাই ঘুণে খাচ্ছে আমাদের স্বাধীনতার ফসল। আমরা ভঙ্গুর হতে হতে ফতুর হতে চলেছি। কাগমারী সম্মেলনের চেতনা আমাদের গড়ার পথ দেখাতে পারে। কেননা, কাগমারী সাংস্কৃতিক সম্মেলন বাংলাদেশের রাজনীতির ইতিহাসে এক অনন্য মাইলফলক। এই মাইলফলক এড়িয়ে অন্য কোনো পথে স্বাধীন বাংলাদেশের ইতিহাস সঠিক পূর্ণতা পায় না।
সভাপতি, মওলানা ভাসানী কৃষক সমিতি ও সদস্য সচিব, ভাসানী পরিষদ

বিষয় : কাগমারী সম্মেলন এম এ আজাদ খান ভাসানী

মন্তব্য করুন