জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ছিলেন আজীবনের ক্রীড়াপিপাসু। ক্রীড়াঙ্গনের প্রতি ছিল তার বিশেষ দুর্বলতা। স্কুলজীবনে নিয়মিত খেলেছেন; খেলার আয়োজনে দায়িত্ব পালন করেছেন। তার প্রিয় খেলা ছিল ফুটবল। এ ছাড়াও তিনি ভলিবল, হকি খেলতেন। স্কুলজীবনের পর রাজনীতিতে ব্যস্ত এবং বছরের পর বছর কারাগারে থাকা সত্ত্বেও ক্রীড়াঙ্গনের সব খবর রাখতেন। তিনি জানতেন, '৪৭-এর পর পাকিস্তানের ক্রীড়াঙ্গনে পশ্চিমারা কীভাবে পূর্ববাংলার ক্রীড়াঙ্গনকে মুঠোর মধ্যে নিয়ে নিয়ন্ত্রণ করেছে। ক্রীড়াঙ্গনে বাঙালির প্রতি অবিচার, বৈষম্য ও বঞ্চনার বিরুদ্ধে তিনি সব সময় সোচ্চার ছিলেন।
স্বাধীনতা অন্যান্য ক্ষেত্রের মতো ক্রীড়াঙ্গনেও লুক্কায়িত প্রতিভা বিকাশের সুযোগ করে দিয়েছে। সামর্থ্য ও সম্ভাবনাকে জানান দিয়েছে। জাতির পিতা ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি পাকিস্তানের কারাগার থেকে মুক্ত হয়ে দেশে ফিরে আসেন। ১২ জানুয়ারি প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন। ১৯৭২ সালের ৯ ফেব্রুয়ারি 'বাংলাদেশ ক্রীড়া নিয়ন্ত্রণ সংস্থা' গঠন করেন (এই বিল ১৯৭৪ সালের ৩০ জুলাই সংসদে পাস হয়) যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশের ক্রীড়াঙ্গনকে সচল করার লক্ষ্যে। আহ্বায়ক হিসেবে দায়িত্ব দেন বিশিষ্ট ক্রীড়া সংগঠক কাজী আনিসুর রহমানকে। নতুন দেশে বৈদেশিক মুদ্রার টানাপোড়েনের মধ্যেও অলিম্পিক আন্দোলনের সঙ্গে সম্পৃক্ত হওয়ার জন্য ১৯৭২ সালের মিউনিখ অলিম্পিকে বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশ থেকে কাজী আনিসুর রহমানকে পর্যবেক্ষক হিসেবে পাঠিয়েছিলেন। দূরদৃষ্টিসম্পন্ন বঙ্গবন্ধু বুঝতে পেরেছিলেন, বিশ্ব ক্রীড়াঙ্গনের সবচেয়ে বড় ফোরামে বাংলাদেশকে পরিচিতি করার এটাই বড় সুযোগ।
আগেই উল্লেখ করেছি, বঙ্গবন্ধুর প্রিয় খেলা ফুটবল। ১৩ ফেব্রুয়ারি ১৯৭২ স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশে প্রথম ফুটবল ম্যাচ অনুষ্ঠিত হয় রাষ্ট্রপতি একাদশ ও মুজিবনগর একাদশের মধ্যে ঢাকা স্টেডিয়ামে। প্রদর্শনী ম্যাচ উদ্বোধনের জন্য বঙ্গবন্ধু ঢাকা স্টেডিয়ামে এসেছিলেন। সঙ্গে ছিলেন রাষ্ট্রপতি আবু সাঈদ চৌধুরী। বঙ্গবন্ধুর ছোট ছেলে শেখ রাসেলও খেলা দেখতে এসেছিলেন। বঙ্গবন্ধু ম্যাচ উদ্বোধন করেন এবং খেলোয়াড় ও কর্মকর্তাদের সঙ্গে ফটোসেশনে অংশ নেন। মাঠে বসে পুরো খেলা উপভোগ করেন। খেলোয়াড় ও সংগঠকদের উদ্দেশে তার বক্তব্যে যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ গঠনের পাশাপাশি খেলাধুলার প্রতি বিশেষ গুরুত্ব দেওয়ার আহ্বান জানান। তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশের ক্রীড়াঙ্গন হবে বৈষম্যহীন এবং সমতার। এখানে মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে ধারণ করতে হবে।
খেলায় রাষ্ট্রপতি একাদশ ২-০ গোলে (আব্দুল গফুর ও গোলাম সারওয়ার টিপু) মুজিবনগর একাদশকে পরাজিত করে। বিজয়ী এবং বিজেতা দলের অধিনায়কের দায়িত্ব পালন করেন যথাক্রমে কিউএম রফিক উদ্দিন দিপু ও মোহাম্মদ জাকারিয়া পিন্টু।
এর পর বঙ্গবন্ধু ঢাকা স্টেডিয়াম এসেছেন ১৯৭২ সালের ১৩ মে; ঢাকা স্টেডিয়ামে কলকাতা মোহনবাগান ও বাংলাদেশ নির্বাচিত একাদশের মধ্যে অনুষ্ঠিত ফুটবল ম্যাচ দেখতে। বাংলাদেশ নির্বাচিত একাদশের অধিনায়ক ছিলেন মোহাম্মদ জাকারিয়া পিন্টু। খেলায় বাংলাদেশ নির্বাচিত একাদশ সফরকারী দলকে ১-০ গোলে পরাজিত করে। একমাত্র গোলটি করেন কাজী সালাহউদ্দিন, বর্তমানে যিনি বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনের প্রেসিডেন্ট। এর পর ১৯৭২ সালের ৪ ও ১১ নভেম্বর ঢাকা স্টেডিয়ামে কলকাতা ইস্টবেঙ্গল ক্লাবের বিপক্ষে বাংলাদেশ নির্বাচিত একাদশ দুটি প্রদর্শনী ম্যাচ খেলে। প্রদর্শনী ম্যাচে বাংলাদেশ নির্বাচিত একাদশের অধিনায়কত্বের দায়িত্ব পালন করেন মেজর হাফিজ উদ্দিন বীরবিক্রম। দুটি ম্যাচই গোলশূন্যভাবে শেষ হয়। ১৯৭২ সালের আগস্ট মাসের তৃতীয় সপ্তাহে আসামের গুয়াহাটিতে সর্বভারতীয় লোকপ্রিয় বরদুলাই শিল্ড ফুটবলে মোহাম্মদ জাকারিয়া পিন্টুর নেতৃত্বে ঢাকা একাদশ নামে (আন্তর্জাতিক ফুটবল বডি তখন বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনকে স্বীকৃতি দেয়নি) অংশ নিয়েছিল। দেশের বাইরে ফুটবল দলের প্রথম অংশগ্রহণ স্বাধীনতার পর। ঢাকা একাদশ ফাইনালে কলকাতা ইস্টবেঙ্গল ক্লাবের কাছে ৫-১ গোলে পরাজিত হয়ে রানার্সআপ হয়। ১৯৭৩ সালের ৩০ জুন বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনের প্রথম নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। কার্যকরী পরিষদে সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন গাজী গোলাম মোস্তফা এমপি ও আবুল হাশেম। আন্তর্জাতিক ফুটবল সংস্থার স্বীকৃতি পাওয়ার পর ১৯৭৩ সালের জুলাই মাসের শেষ সপ্তাহে প্রথম বাংলাদেশ জাতীয় ফুটবল দল মোহাম্মদ জাকারিয়া পিন্টুর নেতৃত্বে আন্তর্জাতিক ফুটবল টুর্নামেন্টে (১৯তম মারদেকা ফুটবল) অংশ নেয়।
শুধু ফুটবল নয়; অন্য খেলার দল ও ক্রীড়াবিদরা যখন দেশের বাইরে গেছেন এবং বিদেশ থেকে যখনই খেলোয়াড়ি দল বাংলাদেশে এসেছে; সবাই বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে সাক্ষাতের সুযোগ পেয়েছে। ভীষণ ব্যস্ততার মধ্যেও তিনি সময় দিয়েছেন। এটি তার মহানুভবতা এবং খেলোয়াড় ও ক্রীড়াবিদদের প্রতি ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ।
বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশের ক্রীড়াঙ্গনের ভিত তৈরি করেছেন। বাস্তববাদী স্বাপ্নিক এই ব্যক্তিত্ব অল্প সময়ের মধ্যে উদ্যোগ এবং চিন্তার মূর্ত প্রতীক হতে পেরেছেন। ক্রীড়াঙ্গন ঘিরে তার নির্দিষ্ট লক্ষ্য এবং ভিশন ছিল। তিনি বাংলাদেশের ক্রীড়াঙ্গনের বাতিঘর ও ধ্রুবতারা।
১৯৭৫ সালের ৭ আগস্ট ২১তম মারদেকা ফুটবল টুর্নামেন্টে অংশগ্রহণকারী জাতীয় দলের খেলোয়াড়রা অধিনায়ক কাজী সালাহউদ্দিনের নেতৃত্বে দেশ ছাড়ার আগে বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে দেখা করেন। তিনি খেলোয়াড়দের দেশের সম্মান রক্ষার জন্য ভালো ফুটবল খেলার আবেদন জানান। এটাই ছিল কোনো খেলোয়াড় দলের সঙ্গে তার শেষ সাক্ষাৎকার। জাতির দুর্ভাগ্য, ১৫ আগস্ট তাকে সপরিবারে হত্যা করা হয়।
বঙ্গবন্ধু অল্প সময়ের মধ্যে ক্রীড়াঙ্গনকে নিয়ে যেভাবে ভেবেছেন, উদ্যোগ নিয়েছেন; এত বছর পর সেগুলোর বিশ্নেষণ করতে গিয়ে অবাক হচ্ছি। ক্রীড়াঙ্গনকে তিনি প্রথম পথের দিশা দেখিয়েছেন। ক্রীড়াঙ্গনে বঙ্গবন্ধুর ভূমিকা ও চিন্তা-ভাবনা নিয়ে বুদ্ধিবৃত্তিক এবং বৈজ্ঞানিক গবেষণা হলে এ চত্বর উপকৃত হবে।
ইকরামউজ্জমান: কলামিস্ট ও বিশ্নেষক