উত্তরপ্রদেশ নির্বাচনে আপনার আকাঙ্ক্ষা কী? মুখ্যমন্ত্রী হওয়া?
আমার লক্ষ্য কংগ্রেসের নির্বাচনী অভিযান যতক্ষণ না পরিবর্তনের স্বয়ংক্রিয় গতিতে পরিণত হচ্ছে, ততক্ষণ এটাকে শক্তিশালী করতে থাকা। আমরা একটি সমস্যাসংকুল পথে নেমেছি। লক্ষ্য পূরণে যা কিছু প্রয়োজন আমি করব। যদিও ব্যক্তিগতভাবে আমি মনে করি, সামনে দীর্ঘপথ পড়ে রয়েছে এবং আমরা সবেমাত্র যাত্রা শুরু করেছি।
আপনার 'লাড়কি হু, লড় সাকতি হু' প্রচারণার নেপথ্যের প্রধান ধারণাটি কী?
এই ধারণা উঠে এসেছে উত্তরপ্রদেশের নারীদের কাছ থেকেই। যেসব তরুণী ভয়ংকর সহিংসতার শিকার হয়েছে, আমি তাদের বাড়িতে গেছি। এই সত্য আমাকে স্তম্ভিত করেছে যে, তরুণীদের বেশিরভাগই তাদের 'ভিকটিমহুড' প্রত্যাখ্যান করেছে। অকল্পনীয় যন্ত্রণা সত্ত্বেও তারা নিজেদের জন্য লড়াই করে গেছে। প্রায় প্রতিটি ঘটনায় তিনটি অভিন্ন দিক ছিল। প্রথমত, ওই নারী ও তার পরিবার সম্পর্কে কুৎসা রটানো হয়েছে। দ্বিতীয়ত, প্রশাসন ও পুলিশ তাদের রক্ষায় কোনো কিছুই করেনি, বরং রটনাকারীদের সুরক্ষা দিয়েছে। তৃতীয়ত, রটনাকারীরা অনিবার্যভাবেই ছিল রাজনৈতিক শক্তির সঙ্গে সম্পর্কিত। আমি সত্যিই মনে করেছি যে, রাজনীতিতে নারীর ক্ষমতায়নে এগিয়ে আসার এটাই সময়। আমি মনে করেছি, রাজনীতিতে অংশ নেওয়ার যথেষ্ট কারণ রয়েছে নারীদের সামনে। আর সেটা উত্তরপ্রদেশের চেয়ে উপযুক্ত এলাকা আর কোনোটি হতে পারে না। বিশ্বের মধ্যে সবচেয়ে নৃশংস পুরুষতন্ত্র সম্ভবত এই প্রদেশে রয়েছে এবং এটাকে ভেতর থেকে চ্যালেঞ্জ করতে হলে নারীরাই সবচেয়ে উপযুক্ত শক্তি।
বিজেপির বিরুদ্ধে আপনার লড়াই কি ধর্মনিরপেক্ষতার আদর্শ সম্পর্কিত, না প্রতিদিনের রুটি-রুজির প্রশ্ন?
দুটোই। বছরের পর বছর ধরে চলছে- গভীর আদর্শিক বিষয় এবং প্রতিদিনের রুটি-রুজির প্রশ্ন। আদর্শের প্রশ্নে আমরা চাই সমতা এবং গঠনমূলক ও প্রগতিশীল রাজনীতি। আর তারা চায় বিভক্তি ও ধর্মীয় পরিচয়ের শ্রেষ্ঠত্ব। প্রতিদিনের রুটি-রুজি ও সুশাসন প্রশ্নে উত্তরপ্রদেশের বর্তমান সরকার স্পষ্টতই কংগ্রেস সরকার থেকে পিছিয়ে। তারা কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে ব্যর্থ হয়েছে; কৃষকের সুরক্ষা ও কৃষির বিকাশে ব্যর্থ হয়েছে। তারা মূল্যস্ম্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করতে পারেনি। তারা উপযুক্ত একটি অবকাঠামোও নির্মাণ করতে পারেনি। বরং তারা এমন ব্যবস্থা করেছে, যাতে জনসাধারণের মূল্যবান সম্পদ জোচ্চোর পুঁজিপতিদের হাতে চলে যায়। গত সাত বছরে বিজেপি শাসনে আমাদের দেশ পেছনের দিকে চলে গেছে। আছে কেবল বিচিত্র ধরনের প্রপাগান্ডা, চোখ কপালে তোলা অনুষ্ঠানাদি এবং সামান্য বা অধর্তব্য অগ্রগতি।
উত্তরপ্রদেশ নির্বাচনে বিজেপির প্রচারাভিযানের মূলে রয়েছে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি। এটাকে কীভাবে দেখছেন?
এটা তাদের সৃজনশীলতা দিয়ে তৈরি বিভ্রম। উত্তরপ্রদেশে এসে আমি প্রতিদিনই এমন কিছু মানুষের দেখা পাই যারা ভয়ংকর সব অপরাধের শিকার। আর কর্তৃপক্ষ তাদের ব্যাপারে নির্লিপ্ত। শাসন ব্যবস্থার চেয়ে তারা বেশি সময় ব্যয় করে প্রপাগান্ডায়। মাঠের চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। যেসব রাজ্যে নারীর বিরুদ্ধে অপরাধ সংঘটনের সবচেয়ে বেশি অভিযোগ পাওয়া যায়, উত্তরপ্রদেশ তার একটি। এসব রোধে কর্তৃপক্ষ কী করেছে? প্রতিটি অঘটনে দেখা যায়, প্রশাসন ও পুলিশ হামলাকারীদের রক্ষা করছে এবং হামলার শিকার পরিবারগুলোকে হয়রানি করছে। বন্দুকযুদ্ধ বা বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড বেড়ে যাওয়া আইনশৃঙ্খলার প্রমাণ হতে পারে না। একটি গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় আইনশৃঙ্খলার বিষয়টি সুশাসনের সঙ্গে জড়িত। এর অর্থ জনসাধারণকে সন্ত্রস্ত করা হতে পারে না।
কংগ্রেস কি এবার ধর্মীয় বিভাজন থেকে দূরে থাকতে মুসলিম সম্প্রদায়ের কাছে কম যাচ্ছে? তাহলে মুসলিম ভোট সমাজবাদী পার্টির বদলে কংগ্রেসে কেন যাবে?
কংগ্রেসের অবস্থান খুবই স্পষ্ট। যারাই বিজেপি শাসকদের অধীনে ভোগান্তির মধ্যে আছে, তাদের পাশে গিয়ে দাঁড়ানো। এ ক্ষেত্রে জাত বা ধর্ম কোনো বিষয় নয়। আমরাই একমাত্র দল, যারা গোটা দেশেই সিএএ বা এনআরসি নিয়ে ধারাবাহিকভাবে প্রতিবাদ জানিয়ে গেছি। তখন যেসব নিরীহ নাগরিক পুলিশের হাতে প্রাণ হারিয়েছে বা কারাগারে গেছে, আমরা তাদের পাশে গিয়ে দাঁড়িয়েছি। আমি কার্যত সব পরিবারের কাছে গেছি। আমরা তাদের জন্য আর্থিক ও আইনগত সহায়তার ব্যবস্থা করেছি। তাদের পরিস্থিতি জানাতে আমরা কার্যকরভাবে মানবাধিকার কমিশনে গিয়েছি। সমাজবাদী পার্টি কিছুই করেনি। তাদের নেতারা বাড়িতে বসে ছিলেন। কোনো ক্ষেত্রেই আমাদের কর্মসূচি ধর্মীয় বিশ্বাস বা জাত-পাতভিত্তিক ছিল না। আমাদের কর্মসূচি ছিল গোটা উত্তরপ্রদেশের জনসাধারণের জন্য। আমাদের কর্মসূচি ছিল প্রগতিভিত্তিক। আমরা জনগণের কাছে সুশাসন, প্রগতি ও জবাবদিহি নিয়ে যেতে চাইছি। আমরা সব ধর্ম ও জাতের মানুষের কাছে গিয়ে বলছি- বিভাজনের রাজনীতি প্রত্যাখ্যান করার এটাই সময়। উন্নয়ন, শিক্ষা ও সচ্ছলতা, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পে সহায়তা; সর্বোপরি সব ধরনের কর্মসংস্থানের বিকল্প দাবি করার এটাই সময়।
অনেকে মনে করেন, আপনার প্রাদেশিক ভাবমূর্তির অভাব রয়েছে। যোগীর পূর্বাঞ্চলীয় পরিচয় রয়েছে, অখিলেশের নামের পেছনে যাদব পরিচয় রয়েছে। এটাকে আপনি কীভাবে দেখেন?
আমার নিজের বাড়ি উত্তরপ্রদেশে। আমার পূর্বপুরুষের বাড়ি এলাহাবাদে। ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে সংগ্রামের কেন্দ্রভূমি ছিল ওই বাড়ি। আমার পরিবারের সব সদস্য সে সময় স্বাধীনতা সংগ্রামে নিবেদিত ছিলেন। আমার পরিবারের সদস্যরা প্রজন্মের পর প্রজন্ম উত্তরপ্রদেশ থেকে এমপি নির্বাচিত হয়েছেন। আমার পরিবারের প্রত্যেক সদস্যের চিতাভস্ম এলাহাবাদের নদীসঙ্গমে বিসর্জিত হয়েছে। আমি যে প্রত্যন্ত গ্রামেই যাচ্ছি, ব্যতিক্রমহীনভাবে কেউ না কেউ এসে বলছে- আমার দাদি ও আমার পিতা ওই গ্রামে আমার অনেক আগে গিয়েছিলেন। উত্তরপ্রদেশের সঙ্গে আমার সম্পর্ক প্রজন্মের পর প্রজন্মের; আবহমানকালের।
সর্বভারতীয় কংগ্রেস পার্টির উত্তরপ্রদেশের দায়িত্বপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক; ভারতীয় সংবাদপত্র ইকোনমিক টাইমসের বসুধা বেণুগোপালের নেওয়া সাক্ষাৎকারের সংক্ষেপিত ভাষান্তর শেখ রোকন