দেশের রাজনীতি কি বিদেশমুখী হয়ে পড়ল? সাম্প্রতিক কিছু ঘটনা সচেতন ব্যক্তিদের মনে এমনতর প্রশ্নেরই উদ্রেক করেছে। বিশেষ করে বিদেশে লবিস্ট নিয়োগ নিয়ে সরকার ও তাদের প্রধান প্রতিপক্ষ বিএনপির বাগ্‌যুদ্ধ দেশবাসীর মনোযোগ আকর্ষণে সক্ষম হয়েছে। সেইসঙ্গে প্রশ্ন উঠেছে- দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বিষয়কে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নিয়ে যাওয়া কতটা যৌক্তিক? তারা বলছেন, এ ধরনের তৎপরতা নেতিবাচক এবং তা স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশের জন্য সম্মানজনক নয়।

বিদেশে লবিস্ট নিয়োগের এই বিতর্ক শুরু হয় মূলত ১৮ জানুয়ারি জাতীয় সংসদের অধিবেশনে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলমের মন্তব্যের পর। তিনি অভিযোগ করেন, সরকারের বিরুদ্ধে বিএনপি যুক্তরাষ্ট্রে লবিংফার্ম ভাড়া করে ৩৭ লাখ ডলার ব্যয় করেছে। বিদেশে লবিং ফার্ম নিয়োগ বা ভাড়া করা বেআইনি কোনো কাজ নয়। বিষয়টি যুক্তরাষ্ট্রে যেমন আইনসিদ্ধ, তেমনি আমাদের দেশের আইনেও এ বিষয়ে স্পষ্ট কিছু বলা নেই। যুক্তরাষ্ট্রে এ ধরনের অনুমোদিত প্রতিষ্ঠান রয়েছে। মোটা অঙ্কের অর্থের বিনিময়ে এসব প্রতিষ্ঠান মক্কেলদের চাহিদা অনুযায়ী প্রয়োজনীয় তদবির করে থাকে। জাতীয় স্বার্থে এসব লবিস্ট নিয়োগকে ইতিবাচক দৃষ্টিতেই দেখা হয়ে থাকে। অতীতে সব সরকারই জাতীয় নানান ইস্যুতে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তদবিরের জন্য লবিস্ট নিয়োগ করেছে। শুধু সরকার কেন, আওয়ামী লীগ ও বিএনপি যখন যে দল সরকারের বাইরে থেকেছে, তখন তারা সরকারকে বেকায়দায় ফেলতে বা চাপে রাখতে শক্তিধর দেশগুলোর আনুকূল্য পেতে বিদেশি লবিং ফার্মের সাহায্য নেওয়ার চেষ্টা করেছে। এ বিষয়ে বিএনপি বা আওয়ামী লীগ কোনো দলই নিজেদের 'দুধে ধোয়া তুলসীপাতা' দাবি করতে পারবে না। তবে দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বিষয়ে বিদেশি লবিস্ট নিয়োগকে সহজভাবে নেওয়ার উপায় নেই। তা ছাড়া লবিস্ট নিয়োগ করার অর্থের উৎস এবং বিদেশে সে অর্থ পাঠানো কীভাবে সম্পন্ন হয়েছে, সেটাও একটি প্রশ্ন। এ বিষয়ে গত ২৩ জানুয়ারি সমকালের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশের বিশিষ্টজন মনে করেন, কে কী স্বার্থে ও উদ্দেশ্যে লবিস্ট নিয়োগ করেছে; কীভাবে কত টাকা লবিস্ট ফার্মকে দিয়েছে- স্বচ্ছতা রক্ষায় তা প্রকাশ করা উচিত।

লবিস্ট নিয়োগ-সংক্রান্ত বিষয়ে সরকার স্পষ্ট কিছু না বললেও সরকারের মন্ত্রীরা বিএনপির লবিস্ট নিয়োগের অর্থ কোথা থেকে এলো এবং কীভাবে তা যুক্তরাষ্ট্রের ফার্মগুলোর কাছে স্থানান্তর হলো তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। সদ্য সমাপ্ত জাতীয় সংসদ অধিবেশনের ২৭ জানুয়ারির বৈঠকে সরকারদলীয় সদস্যরা মন্তব্য করেছেন, বিএনপি বিদেশে লবিস্ট নিয়োগ দিয়ে রাষ্ট্র, জনগণ আর সরকারের বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালিয়ে রাষ্ট্রদ্রোহের অপরাধ করেছে। এর আগে ২৩ জানুয়ারি সংসদের অধিবেশনে জাতীয় পার্টির মহাসচিব মুজিবুল হক চুন্নু পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর উদ্ধৃতি দিয়ে বলেছেন, বিএনপি তিন বছরে যুক্তরাষ্ট্রে লবিস্ট নিয়োগ দিয়ে যে ৩২ কোটি টাকা খরচ করেছে, তা কী কারণে? এটা কি দেশের জনগণের স্বার্থে? রাষ্ট্রের স্বার্থে? নাকি জনগণের স্বার্থের বিরুদ্ধে? তবে পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ সম্পর্কে কোনো মন্তব্য করেননি, সরকারও কোনো ব্যাখ্যা দেয়নি। দৃশ্যত লবিস্ট নিয়োগের বিষয়টি এখন পর্যন্ত দু'পক্ষের বাক্যবাণ নিক্ষেপের মধ্যেই সীমাবদ্ধ আছে। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকগণ মনে করছেন, বিএনপিকে চাপে রাখার উদ্দেশ্যে সরকার লবিং ফার্ম ইস্যুকে সামনে নিয়ে এসেছে।

অন্যদিকে বিএনপি সে চাপ কাটানোর উপায় হিসেবে সরকারের বিরুদ্ধে তাদের ভাষায় 'জনগণের অর্থের অপচয় করে' লবিং ফার্ম নিয়োগের অভিযোগ এনেছে। এই বাহাসের সুরাহা আদৌ হবে কিনা, জনগণ আসল সত্য জানতে পারবে কিনা তা অনিশ্চিত। হয়তো এটাও আমাদের রাজনীতির অন্যতম অনুষঙ্গ 'ব্লেমগেম' হয়েই থাকবে। এদিকে আলোচনায় নতুন মাত্রা যোগ করেছে একটি চিঠি। সরকারের একজন মন্ত্রী চিঠিটি সাংবাদিকদের দেখিয়ে দাবি করেছেন, ওটা বিএনপির লবিস্ট নিয়োগের প্রমাণ। উল্লেখ্য, ওই চিঠিতে স্বাক্ষর করেছেন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর; যা আন্তর্জাতিক দাতা সংস্থাগুলোর কাছে পাঠানো হয়েছিল। তবে বিএনপি মহাসচিব দাবি করেছেন, ওই চিঠি লবিস্ট নিয়োগের জন্য নয়, বরং দেশে মানবাধিকার রক্ষায় আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহযোগীদের প্রতি আহ্বান মাত্র। ১ ফেব্রুয়ারি এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি ওই চিঠি দেখিয়ে বলেন, বিএনপি আন্দোলন-সংগ্রামের অংশ হিসেবেই দেশের ডেভেলপমেন্ট পার্টনারদের সমর্থন চায়, মানবাধিকার লঙ্ঘন বন্ধ চায়, গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের সংগ্রামে দেশি-বিদেশি সব অংশীদারকে এই সরকারের সব অপকর্ম সম্পর্কে অবগত রাখতে চায়।

দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বিষয়ে বিদেশিদের কাছে প্রকারান্তরে নালিশ জানানো কতটা নৈতিকতাসম্পন্ন কাজ? একটি জাতীয়তাবাদী আদর্শের দল হিসেবে বিএনপি এ রকম একটি কাজ করতে পারে কিনা, সংগত কারণেই প্রশ্ন উঠবে। বিএনপি কি তাহলে দেশের জনগণের ওপর আস্থা হারিয়ে ফেলেছে, যেজন্য তারা এখন বিদেশিদের মুখাপেক্ষী হয়ে পড়েছে? তা না হলে এই চিঠি দেওয়ার উদ্দেশ্য কী? দ্বিতীয়ত, একজন প্রবাসীর লবিস্ট নিয়োগের প্রতি তাদের 'নৈতিক সমর্থন' থাকার কথা বলে বিএনপি মহাসচিব নিজের অজান্তেই এর দায়দায়িত্ব অনেকটা কাঁধে তুলে নিয়েছেন। কেননা, নিজেরা লবিস্ট নিয়োগ করা আর সে কাজে অন্য কাউকে সমর্থন দেওয়ার মধ্যে কোনো পার্থক্য আছে বলে মনে হয় না। যেমন কেউ যদি নিজে খুন না করেও কোনো খুনিকে সমর্থন দেন, তাহলে সে খুনের দায় তার ওপরও বর্তায়। এদিকে প্রভাবশালী মার্কিন কংগ্রেসম্যান গ্রেগরি মিকস ফাটিয়েছেন আরেক বোমা। সম্প্রতি তিনি বলেছেন, 'বাংলাদেশের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের চমৎকার সম্পর্ক রয়েছে এবং তারা সে সম্পর্ককে আরও জোরদার করতে চান। কয়েকজন ব্যক্তির ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হলেও বাংলাদেশের ওপর যুক্তরাষ্ট্র কোনো নিষেধাজ্ঞা দেয়নি, দিতে চায়ও না। তবে, বাংলাদেশের বহু কর্মকর্তাকে যুক্তরাষ্ট্রে নিষিদ্ধ করা এবং সে দেশের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপের জন্য একটি মহলের জোর তৎপরতা রয়েছে। যদিও যুক্তরাষ্ট্র তাদের কথায় কিছু করবে না'। মার্কিন কংগ্রেসম্যান গ্রেগরি মিকসের এই মন্তব্যের পর পর্যবেক্ষক মহলে প্রশ্ন উঠেছে, বাংলাদেশ বা এর কর্মকর্তাদের যুক্তরাষ্ট্রে নিষিদ্ধ করতে তদবিরকারী কে বা কারা? যারা এ ধরনের তৎপরতায় লিপ্ত, তারা কি আদৌ দায়িত্বশীল বা দেশপ্রেমিক নাগরিক? তাদের পরিচয় বা স্বরূপ উন্মোচন অতীব জরুরি।

মহিউদ্দিন খান মোহন: সাংবাদিক ও রাজনীতি বিশ্নেষক