গত ২৮ জানুয়ারি ঢাকা শহরে একটি নির্বাচন হয়েছে। সে নির্বাচন ঘিরে ছিল নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা, বিপুল উত্তেজনা ও প্রবল বিতর্ক। নির্বাচনের আগে ও পরে প্রায় এক মাসজুড়েই গণমাধ্যম এবং সামাজিক মাধ্যমের আলোচনার শীর্ষবিন্দু ছিল এই নির্বাচন। এটি 'বাংলাদেশ চলচ্চিত্র শিল্পী সমিতি' নির্বাচন। এবারই প্রথম এত আলোড়ন সৃষ্টি হলেও এটি নতুন কোনো সমিতি নয়। নির্বাচনও এটি প্রথম নয়। ১৭তম নির্বাচন। ১৯৪৭ সালে দেশ বিভাগের পর পূর্ববঙ্গের ঢাকায় ১৯৫২ সালে 'পূর্ববঙ্গ চলচ্চিত্র সমিতি' নামে একটি সংগঠন প্রতিষ্ঠিত হয়। স্বাধীনতার পর তার নাম হয় 'বাংলাদেশ চলচ্চিত্র শিল্পী সমিতি'। বাংলাদেশ চলচ্চিত্র শিল্পী সমিতির প্রথম সভাপতি ছিলেন প্রয়াত কিংবদন্তি নায়করাজ রাজ্জাক। সাধারণ সম্পাদক ছিলেন খলনায়ক আহমেদ শরীফ।
বাংলাদেশ চলচ্চিত্র শিল্পী সমিতির ২০২২-২৪ মেয়াদের দ্বিবার্ষিক নির্বাচনে মোট ভোটার ছিল ৪২৮। এর মধ্যে ভোট দিয়েছেন ৩৬৫ জন। শতকরা হিসেবে ভোট পড়েছে ৮৫ দশমিক ২৮ শতাংশ। কিন্তু এই নির্বাচন নিয়ে গণমাধ্যমে যে পরিমাণ ডামাডোল বেজেছে, তাতে একজন পর্যবেক্ষক হিসেবে বিস্মিত হয়েছি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে শুরু করে সব জায়গায় এই শিল্পী সমিতির নির্বাচন বিষয়ক সংবাদ ও আলাপ অনিবার্য অনুষঙ্গ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, এই যে শিল্পী সমিতির নির্বাচন এবং সেই নির্বাচনকে কেন্দ্র করে সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের সমন্বয়ে পূর্ণ প্যানেল গঠন, তাতে কি আমরা আশা করতে পারি যে, এই গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার নির্বাচনের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের চলচ্চিত্র জগতে এক বিপ্লব সূচিত হবে, যে বিপ্লবে বাঙালির মনন তথা মনোজগতে সত্যিকার অর্থে প্রাণচাঞ্চল্য নিয়ে আসবে, কল্পনাকে উৎসাহিত করা এবং স্বপ্ন দেখার যে শক্তি বা স্পৃহা তাকে ত্বরান্বিত করবে।
শিল্পী সমিতির এই নির্বাচনের পূর্বাপরে নেতৃস্থানীয় কোনো শিল্পীকে দেখলাম না শিল্প ও শিল্পীর গুণগত উন্নয়নের লক্ষ্যে পরিকল্পনা বা ভাবনার কথা বলতে, শুনলাম না কারও মুখে এফডিসিকে কেন্দ্র করে একটি অত্যাধুনিক ফিল্ম ইনস্টিটিউট নির্মাণের কথা। কেউ বলল না, তারা একটি ফিল্ম সিটি করবে। সবার মূল লক্ষ্য শুধু শিল্পীর অর্থনৈতিক উন্নয়ন, গুণগত উন্নয়নের দিক নয়। নতুন প্রজন্মের যারা আসবে তাদের গুণগত মান বিকাশের সহায়ক কোনো প্রতিশ্রুতি বা কর্মপরিকল্পনা এই নির্বাচনে নেই। নেই ইনস্টিটিউট অব ফিল্ম অ্যান্ড আর্টসের কথা, স্কুল অব সিনেমাটোগ্রাফি, ল্যাঙ্গুয়েজ ল্যাবরেটরি, ডিজিটাল ত্রিমাত্রিক ল্যাবরেটরি, অ্যানিমেশন এবং ভিএফএক্স প্রযুক্তির বিকাশের কথা।
জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান যে স্বপ্নে বিএফডিসি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, যেসব উদ্যোগের সুফল হিসেবে 'আবার তোরা মানুষ হ', 'ওরা এগারো জন', 'চাপাডাঙ্গার বৌ' অথবা 'ছুটির ঘণ্টা'র মতো সোনালি যুগের সোনালি সিনেমা আমরা পেয়েছিলাম, সেই সুদিন কোথায় যেন হারিয়ে গেছে, সেই সৃজনশীল এফডিসি কোথায় যেন পথ হারিয়ে থমকে গেছে! প্রযুক্তি ও প্রকৌশলের উৎকর্ষের যুগে এসেও আমাদের চলচ্চিত্র শিল্প যেন সময়ের সঙ্গে খুবই বেমানান, বাঙালির কৃষ্টি ও কালচারের সঙ্গে সমূহ অসামঞ্জস্য। এমনকি শুধু চলচ্চিত্র নির্মাণ নয়, এই শিল্পী সমিতির নির্বাচনটা দেখেও মনে হলো- কতটা পিছিয়ে আছি আমরা!
আমরা যদি হলিউড অথবা প্রতিবেশী বলিউডের দিকে তাকাই, আমরা দেখব একজন শিল্পীর নিজস্ব কিছু বিশ্বাসের জায়গা থাকে, একজন শিল্পীর সমাজকে কিছু দেওয়ার গুণগত সম্পদ থাকে, হলিউডের আর্নল্ড শোয়ার্জনেগার, মরগান ফ্রিম্যান, অ্যাঞ্জেলিনা জোলি, এল পাচিনো, হফম্যান, সুসান সারান্ডন থেকে শুরু করে আবার বলিউডের অমিতাভ বচ্চন, শাহরুখ খান, সালমান খানরা স্ব স্ব সমাজের সামাজিক যে ব্যাধিগুলো আছে, সেগুলো থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য সামাজিক ও নৈতিক আন্দোলন এবং প্রতিরোধ সৃষ্টি করছেন বা করেছেন। অধিকাংশ ক্ষেত্রে তারা সফলও হয়েছেন। সেটা এই সমাজে একেবারেই অনুপস্থিত। এখানে শুধু নেওয়ার ব্যাপারই উপস্থিত, দেওয়ার ব্যাপারটা অনুপস্থিত।
বাংলাদেশে এমন ব্যক্তিত্ব একেবারেই যে নেই সে কথা বলতে চাই না। আমি অভিনন্দন জানাই, ইলিয়াস কাঞ্চনের প্রতি তিনি শিল্পী সমিতির নির্বাচনে সভাপতি হিসেবে নির্বাচিত হয়েছেন। যিনি বাংলাদেশের সড়ককে নিরাপদ করার জন্য নিরন্তর সামাজিক আন্দোলন করে চলেছেন। ক'জন শিল্পীর নাম আমরা এভাবে উল্লেখ করতে পারব? যারা সত্যিকার অর্থে বাংলাদেশের সব সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ব্যাধিগুলোর বিনাশে কাজ করছেন বা করবেন। আরেকটি বিষয়, আমার দীর্ঘদিনের দৃষ্টিভঙ্গি ও বিশ্বাসকে তীব্রভাবে নাড়া দিয়েছে। সেটা হলো- শিল্পী হওয়ার ক্রাইটেরিয়া। এ দেশে শিল্পী হতে গেলে বা শিল্পী সমিতির সদস্য হতে গেলে নাকি অভিনীত সিনেমার নির্দিষ্ট সংখ্যা লাগে, সিনেমায় অভিনয়ের নির্দিষ্ট ব্যপ্তি লাগে আরও কত কি! অথচ আমার আশির দশকের রিচার্ড এটেনবোরার 'গান্ধী' সিনেমার কথা মনে আছে। সেখানে দেখা যায়, টিকিট চেকার এবং কন্ডাক্টর হিসেবে মারিয়াস ওয়েয়ার্স, ইউরোপীয় যাত্রী হিসেবে পিটার কার্টরাইট, পোর্টার বা কুলি হিসেবে উইনস্টন এনটশোনা মহাত্মা গান্ধীকে শ্যামল বর্ণের লোক হিসেবে ট্রেনের ফার্স্ট ক্লাস কেবিন থেকে ধাক্কা মেরে স্টেশনে ফেলে দিয়েছে বা বের করে দিয়েছে। টিকিট চেকারের অভিনয় করতে গিয়ে তিনি বর্ণবিদ্বেষী যে বিষবাষ্প তার চোখে, মুখে ও চরিত্রে ধারণ করেছিলেন, সেই স্বল্প সময়ের অভিনয়েই তিনি খ্যাতি অর্জন করতে পেরেছিলেন শিল্পী হিসেবে। কাজেই শিল্প বা শিল্পীর পরিমাপ হয় গুণে, পরিমাণে নয়।
চলচ্চিত্র পরিচালক বা প্রযোজকদের অধিকাংশের গুণগত মান, সৃষ্টিশীলতা ও কর্মের প্রতি আন্তরিকতার অভাবও স্পষ্ট। সম্প্রতি স্থানীয় সরকার নির্বাচনে নৌকা প্রতীকের প্রচারণায় অংশগ্রহণের জন্য ঢাকা থেকে একটি বেসরকারি বিমান সংস্থার বিমানযোগে রংপুরের মিঠাপুকুর যাচ্ছিলাম। তখন আমার মোবাইল ফোনে বিবিসি নির্মিত কিছু ডকুফিল্ম দেখছিলাম। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের কিছু ঘটনাকে ধারণ করে ধারাভাষ্যের মাধ্যমে তারা তুলে ধরেছে এবং সেসব সংরক্ষণ করছে। এ দেশের বর্তমান সময়ের কয়জন নির্মাতা বাংলাদেশের মুক্তি সংগ্রামের গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাসকে ধরে রাখার উদ্যোগ গ্রহণ করেছেন বা ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন? এ বিষয়ক অসংখ্য কনটেন্ট আমাদের চারপাশে আছে। বাংলাদেশ আর্কাইভসও কিন্তু অযত্নে-অবহেলায় পড়ে আছে। এখানে সংরক্ষিত অমূল্য প্রামাণ্যগুলো যে এভাবেই চিরকাল সুরক্ষিত থাকবে তা নিশ্চিতভাবে বলা যায় না। সময় থাকতে এসব অমূল্য রিসোর্স নিয়ে নতুন করে কাজ করার সুযোগ আছে বা আমাদের কাজ করার দায় আছে। এ দায় পূর্ব-প্রজন্মের কাছে নব প্রজন্মের।
আমাদের দেশের শিল্পী সমাজ যারা সমিতির মধ্যে আছেন এবং যারা বাইরে আছেন সবার কাছে নিবেদন, একটি দেশ, একটি সমাজ কিংবা একটি পরিবার কোনোটাই একা এগিয়ে নেওয়া যায় না। প্রয়োজন হয় সম্মিলিত প্রয়াস ও অংশীদারিত্ব। একটা শিল্পী সমিতি থাকবে, সেই শিল্পী সমিতির নির্বাচনও হবে প্রতি দুই বছর পরপর। কিন্তু এর মাঝে স্বপ্ন কোথায়?
রাশেক রহমান: সদস্য, প্রচার ও প্রকাশনা বিষয়ক উপকমিটি, আওয়ামী লীগ