কয়েকদিন ধরেই অমঙ্গল আশঙ্কায় বুক কাঁপছিল। প্রিয় কবি কাজী রোজী আপার কন্যা সুমী সিকান্দার কান্না করতে করতে নিজেকে শক্ত করে ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিচ্ছিল, মা রেসপন্স করছে কিন্তু আজ ছয় দিন ধরে চোখ খুলছে না। আপনারা সবাই মায়ের জন্য দোয়া করবেন। আপার হাজারো ভক্তকুল দু'হাত তুলেছেন। কিন্তু কভিডসহ বিভিন্ন অঙ্গের নানা সমস্যা ও কিডনির ইনফেকশনের কারণে তিনি ইহজাগতিক মায়া কাটিয়ে অনন্তলোকের পথে যাত্রা করলেন ২০ ফেব্রুয়ারির প্রথম প্রহরে। শনিবার দিবাগত রাত ২টা ৩০ মিনিটে, ৭৩ বছর বয়সে সব কষ্টের, লড়াইয়ের অবসান ঘটিয়ে, একমাত্র প্রাণপ্রিয় সন্তান সুমী, আরও অধিক প্রিয় নাতি-নাতনি, জামাতাকে শোক সাগরে ভাসিয়ে তিনি চলে গেলেন পরলোকে কিংবা অন্য কোনো খানে। আমি জানি না মৃত্যুর পরে মানুষ কোথায় যায়!
কবি কাজী রোজী একমাত্র নারী সংসদ সদস্য, যাকে মানুষ সাংসদ হওয়ার পরেও দেখা হলে আবেগে গলা জড়িয়ে ধরে নির্দি্বধায় কথা বলেছে। প্রাণের কথা। অভিযোগ করেছে দেখা হয় না, কাছে পায় না বলে। রোজী আপা শুধু হেসেছেন। এমন সহজ-সরল প্রাণের মানুষ ছিলেন তিনি। ছাত্রজীবন থেকেই রাজনীতিতে জড়িত। ছাত্রলীগ করতেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগ থেকে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। পরবর্তী সময়ে আওয়ামী লীগ। বাঙালির মুক্তি সংগ্রামের একজন যোদ্ধা রোজী আপা ছিলেন বঙ্গবন্ধু অন্তঃপ্রাণ, উনসত্তরের গণআন্দোলনে, মুক্তিযুদ্ধে সক্রিয় ছিলেন।

সমকালীন বাংলা কবিতার বিশিষ্ট কবি কাজী রোজী ষাটের দশকে কবিতা লেখা শুরু করেন। কবিতায় বিশেষ অবদানের জন্য তিনি ২০১৮ সালে বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার এবং ২০২১ সালে একুশে পদকে ভূষিত হন। তিনি বেতার ও টেলিভিশনে, বিভিন্ন অনুষ্ঠানে কবিতা পাঠ করতেন। বাংলাদেশের প্রায় সব প্রধান পত্রিকায় তার লেখা প্রকাশিত হয়েছে। তিনি সরকারের তথ্য অধিদপ্তরের কর্মকর্তা ছিলেন।

সাংবাদিক বেবী মওদুদের মাধ্যমে রোজী আপার সঙ্গে আমার পরিচয় হয় আশির দশকে। বরাবরই সাদাসিধে, নিরহংকারী ছিলেন। সাধারণ মানুষের সঙ্গে মিশতে পছন্দ করতেন। দশম জাতীয় সংসদে (২০১৪ সালের ১৯ মার্চ অনুষ্ঠিত নির্বাচন) তিনি মহিলা সংরক্ষিত আসনে সাতক্ষীরা আসন নং-৪১-এ 'সংসদ সদস্য' নির্বাচিত হন। এই সময়ে তিনি স্ব-এলাকায় সাধারণ মানুষের উন্নয়নের পাশাপাশি পার্বত্য চট্টগ্রামের আদিবাসীদের ভাষা ও সাহিত্য এবং আদিবাসী কবিদের কবিতা নিয়ে বেশ কিছু কাজ করেছেন; যা তার ইতিবাচক ভাবমূর্তি, মন-মানসিকতার স্বাক্ষর বহন করে।

নতুন কবিদের বইয়ের প্রকাশনা উৎসবে তিনি যেতেন। বক্তব্য রাখতেন। বড় কবির অহমিকা তার মধ্যে ক্রিয়াশীল ছিল বলে মনে হয়নি। কবি শিশিরবিন্দুর বইয়ের প্রকাশনা উৎসবে আমি এটা লক্ষ্য করেছি। 'পারি'র মতো ত্রৈমাসিক পত্রিকার এক যুগ পূর্তিতে তিনি সানন্দে উপস্থিত থাকার সম্মতি জানিয়ে ছিলেন।

তিনি অত্যন্ত সাহসী নারী ছিলেন। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে তিনি কাদের মোল্লার বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিয়েছিলেন অকুণ্ঠিত চিত্তে। একমাত্র সন্তানকে নিয়ে সমাজ সংসারের সঙ্গে সারাজীবন লড়াই করে নিজে প্রতিষ্ঠিত হয়েছেন, প্রিয় কন্যাকে সুশিক্ষিত ও প্রতিষ্ঠিত করেছেন। তার কন্যা সুমী সিকান্দার ভালো গল্প ও কবিতা লেখেন।

কবি কাজী রোজী একজন পরোপকারী, বন্ধুবৎসল, মানবতাবাদী সফল মানুষ। কাজী রোজী ১৯৪৯ সালের ১ জানুয়ারি সাতক্ষীরায় জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবার নাম কাজী শহিদুল ইসলাম। অনন্তলোকে তিনি শান্তিতে থাকুন। তার মৃত্যু নেই। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের সঙ্গে তিনি ওতপ্রোতভাবে জড়িত। তার মৃত্যু নেই। তিনি চির জীবিত থাকবেন ইতিহাসের পাতায়, কবিতার অগ্রগতি যাত্রায়। তাকে সশ্রদ্ধ সালাম।

কাজী সুফিয়া আখ্‌তার: নারীনেত্রী