মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন যে সময়ে ইউক্রেনের বিষয়ে বক্তব্য দিয়েছেন, সংখ্যাজ্যোতিষরা তাতে আশ্চর্যই হবেন। তিনি মঙ্গলবার ফেব্রুয়ারির বাইশ তারিখ (২২.২.২২) ঠিক দুইটা বাইশ (২.২২) মিনিটে বক্তব্য শুরু করেন। তবে বাইডেন সময়ের চেয়েও অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশে বেশি মনোযোগী হন। রাশিয়ার উস্কানির বিপরীতে বাইডেনের প্রতিক্রিয়ার মাত্রা বেশি বা কমের হিসাবও তার বাইরে নয়।

জো বাইডেন অবশ্য চিন্তা করছেন মহামারি প্রেসিডেন্ট হিসেবে তিনি বেশি স্মরণীয় থাকবেন। তবে তিনি তাকে অস্ত্রাগারের শাসক হিসেবে নিজেকে দেখছেন, তিনি যদি সেভাবে পদক্ষেপ নেন, সেটি হবে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ইউরোপে সবচেয়ে বড় সামরিক আক্রমণ। বলাবাহুল্য, সংকট দ্রুত ঘনীভূত হয় সোমবার রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভদ্মাদিমির পুতিন কর্তৃক পূর্ব ইউক্রেনের দুটি অঞ্চলের স্বাধীন হিসেবে স্বীকৃতির মাধ্যমে। সেখানে পূর্ব ইউক্রেনের দুটি অঞ্চলকে স্বাধীন রাষ্ট্রের ঘোষণা দিয়ে সেনা পাঠিয়েছেন রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভদ্মাদিমির পুতিন।

বিষয়টি মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন ভালোভাবে নেননি। তার মতে, পুতিনকে তার প্রতিবেশী দুটি অঞ্চলের স্বাধীনতা দেওয়ার ঘোষণার অধিকার কে দিয়েছে? বাইডেন বলেছেন, এটি আন্তর্জাতিক আইনের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। এ ব্যাপারে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দৃঢ় অবস্থান জরুরি। কিন্তু তিনি যে বক্তব্য দিয়েছেন তার পুরোটা যে ওয়াশিংটন ভালোভাবে গ্রহণ করবে এমনটি ভাবার কারণ নেই। তার দল ডেমোক্র্যাটরা বিষয়টিকে সতর্কতার সঙ্গে স্বাগত জানিয়েছে। এ বক্তব্য রিপাবলিকানদের সন্তুষ্ট করতে পারেনি; উপরন্তু তারা প্রশমিতকরণে বাইডেনকে দোষী সাব্যস্ত করছেন। এটি পুতিনের পদক্ষেপের বিপরীতে প্রশাসনের সতর্ক অবস্থান। প্রথম ধাপে জো বাইডেন রাশিয়ার ব্যাংক ও অভিজাতদের ওপর নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে। তিনি বলেছেন, রাশিয়ার আগ্রাসন বাড়লে মার্কিন নিষেধাজ্ঞার মাত্রাও আরও বাড়বে। বাইডেন মঙ্গলবার হোয়াইট হাউসে সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের জানান, রাশিয়ার দুটি বড় আর্থিক প্রতিষ্ঠান এবং সার্বভৌম ঋণের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করবে যুক্তরাষ্ট্র। প্রশাসনের কর্মকর্তারা বলেছেন, নিষেধাজ্ঞার তালিকায় রাশিয়ার 'এলিট' বা অভিজাত শ্রেণির লোকজন ও তাদের পরিবারের সদস্যরাও রয়েছেন। অর্থাৎ রুশ উদ্যোক্তা ও শিল্পতিদের জন্যও বন্ধ হয়ে যাচ্ছে মার্কিন বাজার।

বাইডেনের যুক্তি, অভিজাতরা যেহেতু ক্রেমলিনের নীতির সমর্থক সেহেতু তারাও কষ্ট সহ্য করুক। এসব অভিজাতরা ধনকুবের অলিগার্ক নামে পরিচিত। যারা লন্ডন কিংবা অন্য শহরে উচ্চাভিলাষী জীবনযাপন করেন এবং যাদের কাছে পুতিন দুর্বল। এখনকার জন্য বাইডেন কঠিন পদক্ষেপের হুমকি দিয়েছেন। রাশিয়া যদি তার আগ্রাসন অব্যাহত রাখে তবে এই নিষেধাজ্ঞার পরিধি আরও বাড়ানোর কথা বলেছেন। যুক্তরাজ্যও রাশিয়া কর্তৃক দুটি অঞ্চলে স্বীকৃতির ঘটনায় পাঁচটি ব্যাংক ও তিন ব্যক্তির ওপর নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে। এরা তিনজন রাশিয়ার ধনাঢ্য ব্যক্তি।

ইউরোপীয় ইউনিয়নের পদক্ষেপের যে প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে ওয়াশিংটনের নিষেধাজ্ঞায়, সে রকম অবস্থা দেখা যায়নি। বিশেষ করে ইউক্রেনের বিচ্ছিন্ন দুটি অঞ্চলকে স্বাধীন দেশ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার প্রতিক্রিয়ায় জার্মানির চ্যান্সেলর ওলাফ শোলজ রাশিয়ার বিতর্কিত গ্যাস পাইপলাইন 'নর্ড স্ট্রিম-২'-এর অনুমোদন বন্ধের যে ঘোষণা দিয়েছেন, সেটি আরও বেশি আলোচনার সৃষ্টি করেছে। কারণ নর্ড স্ট্রিম-২ মস্কোর জন্য গুরুত্বপূর্ণ। দীর্ঘদিন ধরেই তারা এ বিষয়ে কাজ করে আসছিল। ইউরোপে রাশিয়ার অর্থনৈতিক ও সামরিক প্রভাবকে ঘিরে যে রাজনীতি চলছে, তাতে এই নর্ড স্ট্রিম গ্যাস পাইপলাইনকে দাবার ঘুঁটি হিসেবে ব্যবহার করা হয়।

বলাবাহুল্য, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সুইফট ব্যাংকিং পদ্ধতি থেকে রাশিয়াকে বিচ্ছিন্ন করেনি। সুইফট পদ্ধতির মাধ্যমে বিশ্বব্যাপী অর্থের লেনদেন হয়ে থাকে। যুক্তরাষ্ট্র এমনকি রপ্তানি নিয়ন্ত্রণের ওপরও নিষেধাজ্ঞা দেয়নি। এমনটি হলে রাশিয়ার ফার্মগুলো উচ্চ প্রযুক্তির যন্ত্রপাতি ও সফটওয়্যার আমদানি করতে পারত না। অবশ্য ডেমাক্র্যাট নেতা ও সিনেটে বৈদেশিক সম্পর্ক বিষয়ক কমিটির চেয়ারম্যান বব মেনেনদেজ এমএসএনবিসি নেটওয়ার্কের সঙ্গে বলেছেন, বাইডেনের এ পদক্ষেপ নিষেধাজ্ঞার প্রথম ধাপ, তবে এটিই শেষ নয়। এর আগে আমরা দেখেছি, রিপাবলিকান আইন প্রণেতারা পুতিনের নেওয়া পদক্ষেপের বিরুদ্ধে শক্ত অবস্থান নিতে ব্যর্থ হওয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের কঠোর সমালোচনা করছেন। যদিও রিপাবলিকান দলীয় সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প স্বভাবতই দুটি অঞ্চলের স্বাধীনতাকে স্বীকৃতি দিয়ে ভদ্মাদিমির পুতিনের সেখানে রুশ সেনা পাঠানোর ঘোষণাকে 'জিনিয়াস' হিসেবে অ্যাখ্যা দিয়েছেন।

কেভিন ম্যাককার্থি ও রিপাবলিকান দলীয় অন্য সদস্যরা মঙ্গলবার এক যৌথ বিবৃতিতে বলেন, দুঃখজনক হলেও সত্য, প্রেসিডেন্ট বাইডেন কঠোর অবস্থানের কথা বললেও বাস্তবে রাশিয়ার বিষয়ে সেভাবে পদক্ষেপ নিচ্ছেন না। সিনেটে রিপাবলিকান নেতা মিচ ম্যাককানেল অবশ্য আফগানিস্তান থেকে সৈন্য প্রত্যাহারের বিষয়টি নিয়ে এসেছেন। তার মতে, আমি মনে করি না ইউক্রেনের সীমান্তে রাশিয়ার অনেক বেশি সৈন্য রয়েছে। তবে অগ্রপশ্চাৎ চিন্তা না করে আফগানিস্তান থেকে যেভাবে আমরা সৈন্য প্রত্যহার করেছি, সেটা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দুর্বলতারই প্রমাণ।

বলাবাহুল্য, বাইডেনের অনুমতির মাধ্যমে আফগানিস্তানে পরাজয়ের সেই ঘা এখনও শুকায়নি। এখন বাইডেনের উচিত হবে সেই ব্যর্থতা থেকে শিক্ষা নেওয়া। সে অনুযায়ী তিনি গোয়েন্দাদের ব্যাপারে যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণ করেছেন এবং অন্য সব ক্ষেত্রে যথাযথ ভূমিকা রাখছেন। বৈদেশিক নীতির ক্ষেত্রে সময়োপযোগী ভূমিকা রাখার মাধ্যমে বৈশ্বিক রাজনীতির খেলায় তিনি সফলভাবে নিজেকে জিইয়ে রাখছেন। বাইডেন বলছেন, ওয়াশিংটন ইউক্রেনে প্রতিরক্ষামূলক অস্ত্র সরবরাহ অব্যাহত রাখবে এবং পূর্ব ইউরোপে ন্যাটো মিত্রদের শক্তিশালী করতে আরও মার্কিন সেনা মোতায়েন করবে।

তবে এই সংকটের প্রভাবে বিশ্ববাজারে তেল ও গ্যাসের মূল্য বৃদ্ধি পাচ্ছে। বৈশ্বিক শেয়ারবাজারেও সূচক পড়েছে। অন্য ক্ষেত্রেও এ প্রভাব আমরা দেখব। বাইডেন বলছেন, স্বাধীনতা সুরক্ষার মূল্য আমাদের সবাইকে দিতে হবে। তবে এ ক্ষেত্রে আমাদের সৎ হতে হবে। বলাবাহুল্য, কেবল সততাই বিভক্ত ভোটারদের ওপর জয়ী হওয়ার জন্য যথেষ্ট নয়।

ডেভিড স্মিথ: গার্ডিয়ানের ওয়াশিংটন ডিসি ব্যুরো প্রধান; ইংরেজি থেকে ঈষৎ সংক্ষেপিত ভাষান্তর মাহফুজুর রহমান মানিক