বাংলাদেশের জাতি গঠন প্রক্রিয়ায় ২০২২ সাল একটি ভিত্তি বছর হিসেবে দাঁড়াবে বলে ধারণা করি। ইংরেজিতে একে আমরা বলি 'বেঞ্চমার্ক ইয়ার' অর্থাৎ যে বছরের নিরিখে আমরা অনেক কিছু বিবেচনা করি। বাংলাদেশের ইতিহাসে মন্দ-ভালো মিলিয়ে কিছু ভিত্তি বছর আছে। যেমন ১৯৭৫ সালে সপরিবারে বঙ্গবন্ধু হত্যা ও ১৯৯০ সালে স্বৈরশাসকের পতন। আশা করা যায়, পরবর্তী জাতীয় নির্বাচন সামনে রেখে ২০২২ সাল বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক উত্তরণের ভিত্তি বছর হবে। 

২০২১ সাল ছিল বাংলাদেশের জন্য গৌরবের বছর। ৫০ বছরের অর্জন মূল্যায়নের বছর। উদাহরণস্বরূপ বলি, এই মুহূর্তে বাংলাদেশে আমরা ৭৩ বছর গড় আয়ু নিয়ে চলছি, যখন বিশ্বে গড় আয়ু হলো ৭২ বছর। বাংলাদেশ যখন স্বাধীন হয়, তখন এ এলাকার মানুষের গড় আয়ু ছিল ৪৭ বছর। ৫০ বছরে আমরা দেড় গুণ জীবৎকাল পেয়েছি, কারণ শিশুমৃত্যু এবং মাতৃমৃত্যুর হারকে আমরা কমাতে পেরেছি, জীবনমানকে উন্নত করতে পেরেছি। 

আরেকটি অর্জন হচ্ছে, যখন দেশ স্বাধীন হয়, ধারণা ছিল সাড়ে সাত কোটি মানুষ যারা একবেলা খেতে পায় না, তারা কীভাবে দেশ-রাষ্ট্র পরিচালনা করবে? গত ৫০ বছরে আমরা একবেলা নয়, তিনবেলা খাওয়ার শক্তি অর্জন করেছি, যখন জনসংখ্যা সাড়ে সাত কোটি থেকে ১৬ কোটিতে পৌঁছেছে। ৫০ বছরের অর্জনকে সামনে আনতে আরেকটা উদাহরণ, আমরা যখন স্বাধীনতা লাভ করি তখন আমরা প্রভূতভাবে বৈদেশিক সাহায্যনির্ভর দেশ ছিলাম। আজ বাংলাদেশ বৈদেশিক বাণিজ্যনির্ভর এবং বৈদেশিক বিনিয়োগের আকাঙ্ক্ষার দেশে পরিণত হয়েছে। 

বাংলাদেশের এক কোটির বেশি মানুষ এখন বিদেশে অবস্থান করে এবং আমরা রেমিট্যান্স আয়ের দিক থেকে অষ্টম রাষ্ট্র হিসেবে জায়গা করে নিয়েছি। এই রেমিট্যান্স আয় রপ্তানির নিট হিসাবের চেয়ে বেশি। অন্যদিকে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বাংলাদেশের বড় অবদান হলো শান্তিরক্ষী বাহিনী। প্রায় ১০ হাজারের মতো শান্তিরক্ষী বাহিনীর মাধ্যমে বাংলাদেশ বিশ্ব পরিসরে অবদান রাখছে, তা একটি বড় বিষয়।

তবে প্রশ্ন হচ্ছে, আগামীতে বাংলাদেশ অগ্রগতির ধারা অব্যাহত রেখে এসব অর্জনকে টেকসই করতে পারবে কিনা?

সুষম টেকসই উন্নয়ন

দেশের মূল্যায়নকে কেন্দ্র করে সাম্প্রতিককালে যত সমালোচনা হয়েছে, তার মধ্যে তিনটি সমালোচনামূলক বিষয় খুব পরিস্কারভাবে এসেছে। দেশের আর্থসামাজিক অর্জনের সুফল সবাই সমানভাবে ভোগ করতে পারছে না, বৈষম্যের চেহারাটি সবার সামনে উৎকটভাবে প্রকাশ পাচ্ছে। বিশেষ করে অতিমারির সময়কালে তা আরও প্রকটভাবে প্রকাশ পেয়েছে। উপরন্তু বৈষম্য একটি কাঠামোগত রূপ পেয়েছে। আগে ঘটনাক্রমে তা একটি উপসর্গ হিসেবে আসত, এখন বৈষম্য একটি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ নিয়ে গভীরতর হচ্ছে। অর্থাৎ যে কারণে বৈষম্য সৃষ্টি হয়- দায়বদ্ধতাহীনতা ও ক্ষমতার অপব্যবহার সেই সুশাসনের অভাব বৈষম্যকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিচ্ছে। অর্থনৈতিক উন্নয়নের ক্ষেত্রে প্রতিটি বিনিয়োগ যৌক্তিক ও সাশ্রয়ীভাবে হচ্ছে না। উন্নয়নের ফলাফল সবচেয়ে প্রয়োজনীয় ও লক্ষ্যনির্দিষ্ট মানুষের কাছে পূর্ণভাবে পৌঁছাচ্ছে না। লক্ষণীয়, বৈষম্যের তীব্রতা এবং সুশাসনের অভাব একে অপরকে যেন আরও জোরদার করে দিচ্ছে। কারণ যারা বৈষম্যের শিকার এবং যারা সরকারি পরিষেবার সুফল থেকে বঞ্চিত, তাদের কণ্ঠস্বরটি যেন খুবই স্তিমিত, দুর্বল। তাদের কণ্ঠস্বর প্রকাশ করার জন্য একটি বহুস্তরবিশিষ্ট প্রতিনিধিত্বশীল গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র দরকার। একটি আধুনিক মধ্য আয়ের সমাজের ভেতরে যেসব ক্রিয়া-প্রক্রিয়া হয়, যেসব চাহিদা অপূর্ণ থাকে, সেগুলো প্রকাশ ও সুরাহা করার মতো অনুকূল পরিবেশ ও কার্যকর প্রক্রিয়ার অভাব বোধ করছি। সুতরাং বড় বড় সাফল্যের পাশপাশি তিনটি অস্বস্তির জায়গা আছে- বৈষম্য বৃদ্ধি, সুশাসনের অভাব এবং জনমানুষের ক্ষীণ কণ্ঠস্বর। 

সাধারণ অর্জন এবং টেকসই অর্জন- এই দুটির ভেতর তফাৎ আছে। পৃথিবীর নতুন উপলব্ধি হলো, প্রথমটি থেকে দ্বিতীয়টিতে যাওয়ার যোগসূত্র হচ্ছে বৈষম্য কমানো, প্রাতিষ্ঠানিক সুশাসন বৃদ্ধি এবং গণমানুষের কণ্ঠস্বরের সোচ্চার প্রকাশের মাধ্যমে জবাবদিহিতা সৃষ্টি। এই উপলব্ধি থেকেই সম্প্রতি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে রাষ্ট্রপ্রধানের পরিবর্তন হয়েছে। অন্যদিকে চীনের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, গণতন্ত্রের কোনো চূড়ান্ত মডেল নেই। তবে সবাই একমত হবে যে, গণতন্ত্রের কতগুলো নূ্যনতম দৃশ্যমান চিহ্ন আছে। সর্বজনীন মানবাধিকার লঙ্ঘিত হতে পারবে না এবং জনগণ শঙ্কামুক্তভাবে মতামত প্রকাশ করতে পারবে। এবং এই দুই-এর ভিত্তিতে রাষ্ট্র পরিচালিত হতে হবে। এই জায়গাতে কোনো ছাড় দেওয়ার বা 'ট্রেড অফ'-এর সুযোগ নেই। এই দুই পূর্বশর্ত পূরণ না হলে রাষ্ট্রের কার্যকারিতা হ্রাস পেতে থাকে। 

রাষ্ট্রের কার্যকারিতা

বাংলাদেশে আমরা দেখতে পাচ্ছি, রাজনীতির জায়গায় প্রশাসন বড় ভূমিকায় এসেছে। প্রশাসনের ভেতরে দ্বন্দ্ব ক্রমান্বয়ে প্রকাশ্য হচ্ছে। রাষ্ট্রের বিভিন্ন অঙ্গ প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তি একটি অখণ্ড ও সংযুক্ত রাজনৈতিক সরকারের অধীনে আছে বলে প্রায়শই মনে হয় না। অন্যদিকে রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান রাজনৈতিক দল তার অবস্থান হারাচ্ছে। রাজনীতি অনেক ক্ষেত্রেই জনমানুষের আকাঙ্ক্ষা প্রকাশের জায়গার বদলে বাণিজ্যিক সুবিধা আদায়ের স্থানে পরিণত হয়েছে। এরই অপর নাম বিরাজনীতিকরণ। জনমানুষের আস্থাহীনতার জায়গায় চলে গেছে। আগে আমরা রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের কাছে দৌড়ে যেতাম সমস্যা সমাধানের আশায়, এখন জানি সমাধানের ক্ষমতা তাদের কাছে আর নেই। মনে হয় তারাও অর্পিত ও প্রচলিত দায়িত্বগুলোকে পরিত্যাগ করেছে। এর ফলে স্থানীয় সরকার, বিচার বিভাগ ইত্যাদি যে ক্রমান্বয়ে বিকল হয়ে পড়ছে। 


আমি এখানে বিরাজনীতিকরণ প্রত্যয়টি প্রয়োগ করেছি বিভিন্ন কারণে। প্রশ্ন উঠছে, মানুষ শুধু রাজনীতি নয়, ভোট দিতে কেন আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছে? ৪ শতাংশ ভোটের ভিত্তিতে কেন এমপি নির্বাচন হলো?  ৯৬ শতাংশ মানুষ ওখানে ভোট দিতেই যায়নি। স্থানীয় সরকারের নির্বাচন নিয়ে যে মনোনয়ন বাণিজ্য হলো, ভোটের আগে-পরে যে সহিংসতা হলো, তা তো রাজনীতি নয়। দেশ রাজনীতিবিদদের নেতৃত্বে থাকার পরও রাজনীতির প্রতি যে নিস্পৃহতা- এটাই বিরাজনীতিকরণ। এ অবস্থায় বাংলাদেশের ৫০ বছরের অর্জনকে আরও সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া, টেকসই করার জন্য মানুষের ওপর আস্থা রাখতে হবে। মানুষ যাকে যেভাবে ভোট দিতে চায়, সেই সুযোগটি করে দিতে হবে। আর ভোট পাওয়ার জন্য দলীয় আদর্শ ও কর্মসূচি নিয়ে রাজনৈতিক আন্দোলন করতে হবে। তারপর বিনম্র চিত্তে, অবনত মস্তকে জনগণের রায় মেনে নিতে হবে। এটিই হলো সুষম টেকসই উন্নয়নের মূল ভিত্তি। 

সম্প্রতি যে বিদেশি নিষেধাজ্ঞা আমাদের ওপর আরোপ করা হয়েছে, মনে রাখতে হবে এগুলো অনেক ক্ষেত্রে সংকেত, যা এখানেই শেষ হবে- এমন কোনো নিশ্চয়তা নেই। আগামী বছরগুলোতে বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক উত্তরণ প্রক্রিয়া বহুভাবে আন্তর্জাতিক এবং আঞ্চলিক ভূ-রাজনীতি দ্বারা প্রভাবিত হবে। আগে নির্বাচন-পূর্বকালে ভারতের ভূমিকা নিয়ে আলোচনা হতো। এবার শুধু ভারত নয়, চীন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও রাশিয়ার বিষয় আসবে। বলতে পারি, এটি আমাদের এক ধরনের সাফল্য, আমরা সবাইকে আকর্ষণ করতে পেরেছি। আমাদের অন্তস্থিত যে মূল্য, তাকে আমরা উন্মোচন করতে পেরেছি। কিন্তু জাতীয় স্বার্থের পরিপূরক করে এই মূল্যটি ধরে রাখা যেন সহজ কাজ নয়। এর অন্যতম পূর্বশর্ত হলো জনগণের ম্যান্ডেট নিয়ে বহির্বিশ্বের প্রতিকূল চাপকে মোকাবিলা করা।

২০২২ সালে এসে দেশে জাতীয় নির্বাচনী প্রক্রিয়া শুরু হয়ে গেছে। নির্বাচনী প্রক্রিয়ার কার্যকারিতার জন্য সহায়ক পরিবেশটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। মুক্ত মনে ও নির্ভীক চিত্তে মিডিয়া এবং নাগরিক সমাজের অংশগ্রহণ এটির পরিচায়ক। আমরা বলি, বাংলাদেশের ডিএনএর ভেতরে তর্কবিতর্ক আছে, নির্বাচন আছে, গণতন্ত্র আছে। এটিই হলো বাংলাদেশের অন্যতম আত্মশক্তি। এটিকে কার্যকর প্রকাশ করার সুযোগ করে দিতে হবে।

অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন

গুরুত্বপূর্ণ আরেকটি বিষয়, স্থানীয় সরকার নির্বাচনে আমরা দেখলাম, সবাই এখন শাসক দলে যোগ দিতে চাইছে। সবাই এখন চৌবাচ্চা থেকে পানি নিতে চাইছে, যে পানি হচ্ছে রাষ্ট্রীয় সম্পদ। এটি পেতে হলে যোগ্যতা, মেধা ও প্রতিযোগিতার চেয়ে ক্ষমতা ও সংযোগটাই বড় বিষয়। এ কারণে বিরোধী রাজনীতির সমর্থকরা সাময়িক সময়ের জন্য হলেও শাসক দলে ঢুকতে চাইছে। সবাই এখন সরকারি সম্পদে অভিগম্যতা চাইছে।

বর্তমানে দেশে একটি নিরপেক্ষ, দক্ষ ও সাহসী নির্বাচন কমিশন গঠনের প্রক্রিয়া চলছে। মনে রাখা দরকার, নতুন নির্বাচন কমিশনকে জনমানুষের চোখে বিশ্বাসযোগ্য হতে হবে। তার চেয়েও বড় বিষয় হলো,  তাকে কাজ করার সুযোগ করে দিতে হবে। তাই অবধারিতভাবে নির্বাচনকালীন সরকারের অবয়ব ও চরিত্র তথা কার্যপরিধি নিয়ে একটি জাতীয় ঐকমত্য প্রয়োজন হবে। ২০১৪ ও ২০১৮ সালের নির্বাচনের ক্ষেত্রে আমাদের হতাশাজনক অভিজ্ঞতা থেকে আগামী জাতীয় নির্বাচনকে সুরক্ষা দিতে হবে। 

বাংলাদেশে এখন বেশ কিছু নতুন টেনশনের জায়গা তৈরি হয়েছে। প্রথমত, রোহিঙ্গা সমস্যা যা ক্রমেই জাতীয় সমস্যায় পরিণত হয়েছে। দ্বিতীয়ত, পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তিচুক্তির ২০ বছর পরও আমরা ভূমি সমস্যার সমাধান করতে পারিনি। এখনও সেখানে গোলাগুলি হচ্ছে। তৃতীয়ত, এতদিন পর্যন্ত বলে এসেছি আমরা সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির দেশ। হিন্দু, মুসলমান আমরা যুগ যুগ ধরে একত্রে বসবাস করেছি। এই ধারণাকে চ্যালেঞ্জ করেছে গত দুর্গাপূজার সময় ঘটে যাওয়া সাম্প্রদায়িক আক্রমণ। আগামী জাতীয় নির্বাচনের প্রেক্ষিতে এই বিষয়গুলোও থাকবে। 

আমরা যদি টেকসইভাবে এলডিসি থেকে বের  হতে চাই, নিম্ন মধ্যম আয়ের দেশ থেকে উচ্চ মধ্যম আয়ের দেশ হতে চাই, তাহলে সর্বজনীন আর্থসামাজিক সুরক্ষা এবং কার্যকর মানবাধিকার নিশ্চিত করতে হবে। তা না হলে আমাদের যে ত্বরণটা আছে, সেটা শ্নথ হয়ে যাবে। বাংলাদেশের রাজনৈতিক নেতৃত্ব বিভিন্ন সময়ে আলোকিত চিন্তা নিয়ে এসেছে। তারা জনগণের কণ্ঠস্বর ধারণ করেছেন। সম্প্রতি একটি অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন নিশ্চিত করার দাবিটি উচ্চস্বরে আসছে। আশা করছি, ২০২২ ও ২০২৩-এ এই কণ্ঠস্বরকে সামনে এগিয়ে নিয়ে আমাদের ৫০ বছরের অর্জনকে টেকসই করব, বৈষম্য দূর করব এবং সুশাসন গভীর করব। 
আমাদের বাংলাদেশের নাগরিকদের বেঁচে থাকার যে সক্ষমতা, যুদ্ধ করার যে স্পৃহা এবং অর্জনকে ধারণ করার যে উপলব্ধি- এটিই হলো ৫০ বছরের অন্যতম বড় অনুধাবন। একে পুঁজি করেই আগামীতে বাংলাদেশ নতুন অর্জন নিশ্চিত করবে। নিশ্চিত করবে গণতান্ত্রিক উত্তরণ। 

ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য: অর্থনীতিবিদ ও সম্মাননীয় ফেলো, সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)