সরকারি সংস্থা ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশ তথা টিসিবি ট্রাকে করে বাজারের তুলনায় কম মূল্যে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য বিক্রির যে ব্যবস্থা করেছে, একসময় সেগুলোর ক্রেতা ছিল নিম্নবিত্ত মানুষ। বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনে আমরা দেখছি যে, সেখানে ক্রমেই মধ্যবিত্তের ভিড়ও বাড়ছে। ক্যামেরা দেখলে এই শ্রেণির মানুষের মুখ লুকানোর চিত্রও সংবাদমাধ্যম ও সামাজিক মাধ্যমে উঠে এসেছে। কিন্তু এতকিছু করেও শেষ পর্যন্ত যে খুব বেশি লাভ হচ্ছে না, বুধবার সমকালে প্রকাশিত শীর্ষ প্রতিবেদনে তা স্পষ্ট। ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে- পণ্য পেতে দীর্ঘ ৭-৮ ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থেকেও ৪০-৫০ শতাংশ সম্ভাব্য ক্রেতাকে ফিরে যেতে হচ্ছে খালি হাতে। কারণ ক্রেতার দীর্ঘ সারি শেষ হতে না হতেই ফুরিয়ে যায় ট্রাকের মজুদ। এই চিত্র কেবল নিরাশ ক্রেতার ব্যক্তিগত বেদনা ও আক্ষেপের বিষয় হতে পারে না।

আমরা মনে করি, এভাবে 'ট্রাকসেল' আগ্রহী ক্রেতার চাহিদা মেটাতে 'ব্যর্থ' হওয়ার মধ্য দিয়ে বাজারের অব্যবস্থাপনাও স্পষ্ট হয়। বস্তুত সমকালের আলোচ্য প্রতিবেদনেই দেখা যাচ্ছে- টিসিবির পণ্য যেসব এলাকায় নিয়মিত বিক্রি হয়, সেখানকার 'প্রভাবশালী' বিভিন্ন পক্ষ ট্রাক থেকে মাত্রাতিরিক্ত পণ্য কিনে নেয়। ফলে যাদের জন্য এই ব্যবস্থা, সেই নিম্নবিত্ত বা মধ্যবিত্ত পরিবারগুলো বঞ্চিত হয়। খোদ ডিলার ও বিক্রয়কর্মীরাও নির্ধারিত স্থানে যাওয়ার আগে পথেই কিছু পণ্য পরিচিত ব্যক্তি ও ব্যবসায়ঢর কাছে বিক্রি করে দেয়- সমকালেরই আরেকটি প্রতিবেদনে উঠে আসা এই অভিযোগ আরও উদ্বেগজনক। আমরা দেখতে চাইব, অবিলম্বে এসব অনিয়ম রোধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। বর্ধিত চাহিদা বিবেচনায় ট্রাকে পণ্যের সরবরাহও নিশ্চয়ই বাড়াতে হবে। কিন্তু সাধারণ বাজারে যদি দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে আনা না যায়, তাহলে শুধু ট্রাক নামিয়ে দিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা কঠিন হবে। আর বাজারে চাল, ডাল, তেল, সবজির মতো নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যসহ জ্বালানির দামও যেভাবে বাড়ছে, তাতে বাজার নিয়ন্ত্রণে আনার বিকল্পও নেই।

মনে রাখতে হবে- করোনার আঘাতে এমনিতেই জেরবার নাগরিকরা যখন অর্থনৈতিকভাবে ঘুর দাঁড়ানোর প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে; তখন বোঝার ওপর শাকের আঁটি হয়ে আসছে বাজার পরিস্থিতি। অর্থনৈতিক তৎপরতা প্রায় সম্পূর্ণ স্থবির হওয়ার পর যেখানে মানুষের আয় সীমিত বা কোনো কোনো ক্ষেত্রে বন্ধ হয়ে পড়েছে, সেখানে বাজারের চড়া মূল্য তাদের আরও নাজুক পরিস্থিতির মুখোমুখি করছে। সামান্য সঞ্চয় ও উপার্জন দিয়ে দুঃসময় পাড়ি দেওয়ার যে কাচের দেয়ালের ভরসা, তাও চূর্ণ-বিচুর্ণ হয়ে যেতে পারে বাজার যদি নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে পড়ে।

অস্বীকার করা যাবে না- আমাদের দেশে বাজার ব্যবস্থা এমনিতেই সদা চঞ্চল; স্থিতিশীল রাখতে কর্তৃপক্ষকে হিমশিম খেতে হয়। এ নিয়ে নাগরিকদের থাকে বাড়তি অথচ প্রায় সাংবাৎসরিক উদ্বেগ। আজ পেঁয়াজ তো কাল লবণ, পরশু চাল তো তরশু চিনির দাম হঠাৎ করেই বেড়ে যায়। মুক্তবাজার অর্থনীতিতে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দর ওঠা-নামা করতেই পারে; তার পেছনে চাহিদা ও সরবরাহের ধ্রুপদী কারণও থাকে সাধারণত। কিন্তু আমাদের দেশে এমন নজির কম নেই যে, দৃশ্যমান কোনো কারণ ছাড়াই বাজার অস্থিতিশীল হয়ে পড়ে। এর অদৃশ্য কারণগুলোও আমাদের অজানা নয়। এর নেপথ্যের কুশীলবরাও আমাদের অচেনা নয়। প্রয়োজন কেবল সতর্কতা, নজরদারি ও সদিচ্ছা।

আমরা চাই, বাজার ব্যবস্থা সচল রাখতে এবং নিত্যপণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণে রাখতে সরকার এখনই সর্বাত্মক ব্যবস্থা গ্রহণ করুক। এও ভুলে যাওয়া চলবে না, সামনে রমজান মাস। এই মাসে নিত্যপণ্যের চাহিদা বৃদ্ধি উপলক্ষ করে একটি শ্রেণি কৃত্রিম সংকট তৈরি করে প্রতিবছর। এবার তার পুনরাবৃত্তি যেন না হয়। করোনা সংকট মোকাবিলায় বরং থাকতে হবে দ্বিগুণ সতর্কতা ও ত্রিগুণ সক্রিয়তা। আমরা জানি, রমজান মাসে পরিবহন খরচ ও চাঁদাবাজির হারও বেড়ে যায়। ফলে অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধির হ্রাস টানতে হলে বাজারে অভিযানের পাশাপাশি চাঁদাবাজিও নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। শৃঙ্খলা আনতে হবে পরিবহন ব্যবস্থায়ও। কিন্তু আইনের প্রয়োগ করতে গিয়ে বেআইনি কর্মকাণ্ডের অভিজ্ঞতা আমাদের কম নেই। যখন বাজারে নিয়ন্ত্রণের অভাব; তখন বাড়তি বিপদ হিসেবে অস্থিতিশীলতাও চাই না।