আজ থেকে ৭০ বছর আগে ২১ ফেব্রুয়ারি ইতিহাস সৃষ্টি করেছিল বিশ্বব্যাপী। এটি জীবন দিয়ে মায়ের ভাষার মান বাঁচানোর ইতিহাস। মাতৃভাষায় কথা বলার অধিকার আদায় করে নেওয়ার সে ইতিহাস বিশ্ববাসী স্মরণে রেখেছে আজও। ভাষাশহীদদের সেই আত্মত্যাগ শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করতে তাই তো মাসজুড়ে সর্বত্র চলে কত প্রস্তুতি, শত আয়োজন। দেশজুড়ে মাতৃভাষা নিয়ে আলোচনা সভা, শহীদদের স্মৃতি নিয়ে স্মরণসভা আর বইমেলার মতো বিভিন্ন আয়োজনের মাধ্যমে অতিবাহিত হয় ভাষার এই মাস। 

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস উপলক্ষে ২১ ফেব্রুয়ারির প্রথম প্রহরে শহীদ মিনারে পুষ্পস্তবক অর্পণের মধ্য দিয়ে শুরু হয় বাংলা ভাষার প্রতি শ্রদ্ধা আর শহীদদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশের আনুষ্ঠানিকতা। শিশু-কিশোর, যুবক-বৃদ্ধ, শিক্ষার্থী-শিক্ষক, রাজনীতিবিদ থেকে শুরু করে সব ধর্মের, সব বর্ণের, সব শ্রেণি-পেশার মানুষ প্রভাতফেরির মিছিলে নগ্ন পায়ে শহীদ মিনারের রাস্তা ধরে ফুল হাতে এগিয়ে যায়। শহীদ বেদিতে সেই ফুল অর্পণের মধ্য দিয়ে যেন শহীদদের প্রতি তাদের ঋণ একটু হলেও শোধ হবে- এমন আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন তাদের চেহারায় দৃশ্যমান হয়। 

দুপুর গড়িয়ে বিকেল হয়, সন্ধ্যা হয়, রাত হয়, কালেন্ডারে নতুন তারিখ আসে। বদলে যায় ২১ ফেব্রুয়ারির প্রতি মানুষের সেই আবেগ। কখনোওবা ওই দিনেই সন্ধ্যেবেলায় শহীদ দিবসের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে উচ্চ শব্দে বাজে অন্য ভাষার গান। তাছাড়া, এখনকার সময়ে নবজাতক জন্ম নিলে পিতামাতা বা অভিভাবকরা সেই সন্তানের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে উঠে পড়ে লেগে যান। সন্তান বড় হয়ে কী হবে, কোথায় পড়বে, কোন স্কুল ভালো ইত্যাদি চিন্তায় স্বদেশী সংস্কৃতিতে শিশুর বিকাশ নিয়ে অনেকেই ভাবেন না। সন্তানকে স্কুলে ভর্তির ব্যাপারে তাদের কাছে তাই প্রতিযোগিতার বাজারে শ্রেষ্ঠত্বের বিচারে স্থান পায় ইংরেজি মাধ্যম বিদ্যালয়। আর তাই তো সন্তানের মুখে একটু আধটু বোল শুরু হতে না হতেই তাদের মুখে শোনা যায় ভিন দেশের কঠিন উচ্চারণের সব শব্দ। স্কুলের পাঠ্যবইয়ে শিক্ষার পাশাপাশি বিনোদনের মাধ্যম হিসেবে বাসায় ‌টিভি সিরিয়াল আর ভিডিও গেমসের বদৌলতে ওই সব ভাষাতেই যেন পটু হয়ে ওঠে শিশু। ভবানী প্রসাদ মজুমদারের কবিতার লাইনের মতো হিন্দি আর ইংরেজির ভিড়ে বাংলা ভাষা ‘থার্ড ল্যাংগুয়েজ’ হিসেবে অনেক শিশুর কাছে দুর্বোধ্যই থেকে যায়। বয়স বাড়তে বাড়তে হিন্দি-ইংলিশ মুভি-গানের ভিড়ে বাংলাটা যে কখন হারিয়ে যায়, সে খবর কে রাখে!

অথচ এই বাংলা ভাষায় কথা বলতে পারবে না, উর্দু হবে একমাত্র রাষ্ট্রভাষা; তৎকালীন শাসকগোষ্ঠীর এমন ঘোষণায় ক্ষোভে ফেটে পড়েছিল এই বাংলারই মানুষ। এক সময় ক্ষোভ রূপ নিয়েছিল আন্দোলনে। মায়ের ভাষা রক্ষার দাবিতে সে আন্দোলনে অকাতরে শামিল হয়েছিল শিশু-তরুণ-বৃদ্ধ সব বয়সী ভাষাপ্রেমী। রক্ত দিয়ে জীবন দিয়ে বাঁচিয়েছিল মায়ের ভাষার সম্মান। ভাষার জন্য এমন আত্মত্যাগের স্বীকৃতিও পেয়েছিল তারা। বাংলাই পৃথিবীর একমাত্র ভাষা ‘বাংলা’ রক্ষার্থে জীবন দেওয়ার যে ইতিহাস রচিত হয়েছিল, তার স্মরণে আজও বিশ্বব্যাপী পালিত হয় আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস। আর সেই ভাষার উত্তরসূরি হয়েও আমাদের কাছে ২১ ফেব্রুয়ারি যেন আজ শুধু একটি উৎসবের উপলক্ষ মাত্র। আনুষ্ঠানিকতার চাদরে ঢাকা পড়ে আজ মাতৃভাষার এমন মুমূর্ষু অবস্থা জাতির জন্য লজ্জাজনক নয় কি? 

ভাষাকে বিকৃতি থেকে রক্ষার জন্য সেই ভাষাকে রাষ্ট্রভাষার যথাযোগ্য মর্যাদা ফিরিয়ে দেওয়ার জন্য আরেকটি আন্দোলন এখন সময়ের দাবি। তাই আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসে শুধু সভা-সমাবেশ-সেমিনার আর পুষ্প অর্পণের মাধ্যমে ভাষার প্রতি দায়িত্ব সমাপ্ত না করে বরং বাংলা ভাষাভাষী হিসেবে সর্বত্র মায়ের ভাষার অবিকৃত চর্চার। আর পরবর্তী প্রজন্মের কাছে বাংলা ভাষার ইতিহাস-ঐতিহ্য, মিষ্টতা তুলে ধরে তাদের ধার করা সংস্কৃতি থেকে ভিনগ্রহের ভাষা চর্চা থেকে ফিরে এসে নিজের মায়ের ভাষার মিষ্টতা উপলব্ধি করার, মনে-প্রাণে গ্রহণ করার, চর্চা করার ব্যাপারে উদ্যোগ নেওয়াটাও বড়দেরই দায়িত্ব। নতুবা আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো ২১ ফেব্রুয়ারি শুধু একটি বিশেষ দিনের ক্ষণস্থায়ী আবেগ হিসেবেই দিনশেষে হয়তো লাশঘরে নিথর হয়ে পড়ে থাকবে। 

বিষয় : ভাষা আন্দোলন বাংলার গৌরব বাংলা ভাষার অবহেলা

মন্তব্য করুন