‘জয় বাংলা’ মানে বাংলার জয়। দেশের জয়। মানুষের জয়। আনন্দের বিষয়, সেই ‘জয় বাংলা’ হতে যাচ্ছে জাতীয় স্লোগান। সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে ভার্চুয়ালি মন্ত্রিসভার বৈঠকে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। ২০১৭ সালে ‘জয় বাংলা’কে জাতীয় স্লোগান হিসেবে ঘোষণার জন্য সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ড. বশির আহমেদ হাইকোর্টে রিট করেন। ২০২০ সালের ১০ মার্চ হাইকোর্টের রায়ে ‘জয় বাংলা’কে জাতীয় স্লোগান হিসেবে বিবেচনার কথা বলা হয়। আরও বলা হয়, সিদ্ধান্ত কার্যকর করার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে। এর ফলে ‘জয় বাংলা’ জাতীয় স্লোগান ঘোষণার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। 

‘জয় বাংলা’র উৎপত্তি সম্পর্কে জানা যায়, ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের নেতা মাদারীপুরের এক স্কুলশিক্ষক পূর্ণচন্দ্র দাস জেল-জুলুম-নির্যাতনের শিকার হন। তার আÍত্যাগের স্বীকৃতি স্বরূপ এবং কারামুক্তি উপলক্ষে কালিপদ রায় চৌধুরীর অনুরোধে কবি কাজী নজরুল ইসলাম রচনা করেন ‘ভাঙার গান’ কাব্যগ্রন্থের ‘পূর্ণ-অভিনন্দন’ (১৯২২) কবিতাটি। এই কবিতায় কাজী নজরুল ইসলাম প্রথম ‘জয় বাংলা’ শব্দটি ব্যবহার করেন। তার রচিত ‘বাঙালির বাঙলা’ প্রবন্ধেও ‘জয় বাংলা’ পাওয়া যায়। ‘পূর্ণ-অভিনন্দন’ কাব্যটি ছিল এমন-  

“জয় বাঙলা’র পূর্ণচন্দ্র, জয় জয় আদি অন্তরীণ,

জয় যুগে যুগে আসা সেনাপতি, জয় প্রাণ অন্তহীন।”

এরপর ১৯৬৯ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মধুর ক্যান্টিনে ১৭ মার্চ শিক্ষা দিবস যৌথভাবে পালনের জন্য কর্মসূচি প্রণয়নের সময় সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের এক সভায় তৎকালীন রাষ্ট্র্রবিজ্ঞান বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র আফতাব আহমেদ ও চিশতী হেলালুর রহমান সর্বপ্রথম ‘জয় বাংলা’ স্লোগানটি উচ্চারণ করেন। তবে ১৯ জানুয়ারি ১৯৭০ ঢাকার পল্টনের এক জনসভায় ছাত্রনেতা সিরাজুল আলম খান তার ভাষণে সর্বপ্রথম ‘জয় বাংলা’ স্লোগানটি উচ্চারণ করেছেন বলেও জনশ্রুতি আছে। আর জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে ঐতিহাসিক ভাষণে উচ্চারণ করেন ‘জয় বাংলা’ স্লোগানটি। এর পরপরই ‘জয় বাংলা’ স্লোগানটি বেশ জনপ্রিয়তা লাভ করে। 

৭ জুনের সমাবেশে শেখ মুজিবকে গার্ড অব অনার দিতে ছাত্রলীগ গঠন করে ‘জয় বাংলা বাহিনী’। বাহিনী তৈরি করে লাল-সবুজ একটি পতাকা। সিরাজুল আলম খানের নির্দেশে ও যৌথ পরিকল্পনায় পতাকা তৈরি করেন আ স ম আবদুর রব, শাজাহান সিরাজ, কাজী আরেফ আহমেদ, মার্শাল মনি ও হাসানুল হক ইনু। বাহিনীর অধিনায়ক করা হয় আ স ম আবদুর রবকে, উপপ্রধান হন কামরুল আলম খান খসরু ও হাসানুল হক ইনু। সমাবেশে ‘জয়বাংলা বাহিনী’র কুচকাওয়াজ ও গার্ড অব অনার শেষে রব শেখ মুজিবের হাতে পতাকা তুলে দেন। 

১৯৭১ সালের মার্চ থেকে জনসভা, মিছিলে ও প্রচারণায় ‘জয় বাংলা’ স্লোগানটি ব্যবহার হতে শুরু করে। ২৭ মার্চ ১৯৭১ কালুর ঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে মেজর জিয়াউর রহমান যখন স্বাধীনতার ঘোষণা পাঠ করেন, তিনিও শেষে ‘জয় বাংলা’ স্লোগানটি উচ্চারণ করেন। মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে ‘জয় বাংলা’ স্লোগানটি বারবার প্রচারিত হয়। এই বেতার কেন্দ্রের স্বাক্ষর সংগীত ছিল ‘জয় বাংলা বাংলার জয়’। 

১১ এপ্রিল ১৯৭১ স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ প্রথম যে বেতার ভাষণ দেন, সেখানে ‘জয় বাংলা, জয় স্বাধীন বাংলাদেশ’ স্লোগান দিয়ে বক্তব্য শেষ করেন। ‘জয় বাংলা’ স্লোগানটি মুক্তিযুদ্ধকালীন বাঙালির প্রেরণার উৎস। যেকোনো যুদ্ধ জয়ের পর মুক্তিযোদ্ধারা ‘জয় বাংলা’ স্লোগানটি উচ্চারণ করে তারা বিজয় উদযাপন করতেন। 

২০১১ সালে ‘বিদ্রোহী’ কবিতা রচনার ৯০ বছর পূর্তি উপলক্ষে আন্তর্জাতিক নজরুল সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, ‘স্বাধীনতা যুদ্ধের জয় বাংলা স্লোগান নজরুলের কবিতা থেকে নেওয়া’। ২০১৫ সালে নজরুলের ১১৬তম জন্মবার্ষিকীতে প্রধানমন্ত্রী আবারও বলেন, ‘আমরা মুক্তিযুদ্ধের সময় যে জয় বাংলা স্লোগান দিতাম, সেটি কবি নজরুলের একটি কবিতা থেকে বঙ্গবন্ধু নিয়েছিলেন।’ ‘জয় বাংলা’ বাঙালির এক চিরন্তন স্লোগান। মেহেরপুরে মুজিবনগর মুক্তিযুদ্ধ স্মৃতি কমপ্লেক্সে জয় বাংলা ভাস্কর্য রয়েছে।

‘জয় বাংলা’ স্লোগানটি জাতীয় স্লোগান হলে সাংবিধানিক পদাধিকারী ব্যক্তি, রাষ্ট্রের সব কর্মকর্তা-কর্মচারী রাষ্ট্রীয় বা সরকারি অনুষ্ঠান শেষে ‘জয় বাংলা’ স্লোগানটি উচ্চারণ করবে। এ ছাড়া সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অ্যাসেম্বলি বা সমাবেশ, সভা-সেমিনারে ‘জয় বাংলা’ স্লোগানটি উচ্চারণ করতে হবে।