কে এম নূরুল হুদার নেতৃত্বাধীন নির্বাচন কমিশন মেয়াদ পূর্ণ করে বিদায় নিয়েছে ১৪ ফেব্রুয়ারি। তারা চলে গেছেন, তবে পেছনে রেখে গেছেন কালিমালিপ্ত ইতিহাস। এ নিয়ে আরও দেশে তর্ক-বিতর্ক, আলোচনা-সমালোচনা চলবে। এটা ঠিক, আমাদের দেশের নির্বাচন ও নির্বাচন কমিশন কখনোই বিতর্কমুক্ত ছিল না। বলা যায়, প্রায় সব কমিশনই কোনো না কোনো কারণে সমালোচিত হয়েছে। ২৬ ফেব্রুয়ারি এবারই প্রথম নির্বাচন কমিশন গঠিত হয়েছে আইন অনুযায়ী। রাষ্ট্রপতি মোঃ আবদুল হামিদ সিইসি ও অন্য চার কমিশনার নিয়োগ দেন। সিইসি কাজী হাবিবুল আউয়ালের নেতৃত্বাধীন ইসি নির্বাচন কমিশনের হূত আস্থা পুনরুদ্ধারে কতটা সক্ষম হবে, এ নিয়ে এরই মধ্যে কথা উঠেছে।

কথায় আছে, শেষ ভালো যার, সব ভালো তার। সে হিসেবে নূরুল হুদা কমিশনের শেষটা মোটেই ভালো হয়নি। তাদের সর্বশেষ কাজ ছিল ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন অনুষ্ঠান। সহিংসতার দিক দিয়ে সে নির্বাচন সর্বকালের রেকর্ড ভঙ্গ করেছে। সমাজের সব স্তর থেকেই নির্বাচনে অনিয়ম-বিশৃঙ্খলা-সহিংসতা নিয়ে কথা বলা হয়েছে, কিন্তু সিইসি ছিলেন নির্বিকার। বোধ করি, 'কানে দিয়েছি তুলো, আর পিঠে বেঁধেছি কুলো' নীতিই তিনি অবলম্বন করেছিলেন। সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ঘটনা হলো, যাওয়ার বেলায় সিইসি তার এক সহকর্মী এবং দেশের বিশিষ্টজন সম্বন্ধে এমন ভাষায় বিষোদ্গার করেছেন, যা বিবেকবান ব্যক্তিমাত্রকেই বিস্ময়ে হতভম্ব করে দিয়েছে। ২৭ জানুয়ারি সিইসি নূরুল হুদা আরএফইডির সংলাপ অনুষ্ঠানে হামলে পড়েছিলেন তার সমালোচকদের ওপর। নূরুল হুদার আক্রমণের শিকার হয়েছেন তার সহকর্মী নির্বাচন কমিশনার মাহবুব তালুকদার, সাবেক সিইসি এটিএম শামসুল হুদা, সুশাসনের জন্য নাগরিক-সুজন সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার প্রমুখ। ২৯ জানুয়ারি সুজন আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, যৌক্তিক সমালোচনার জুতসই জবাব না পেয়ে সমালোচনাকারীদের চরিত্র হননের অপচেষ্টায় লিপ্ত হয়েছেন সিইসি নূরুল হুদা। সংবাদমাধ্যমে প্রেরিত এক বিবৃতিতে দেশের ৩৭ বিশিষ্ট নাগরিক নূরুল হুদার বক্তব্যে ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেছেন, তিনি সুজনের বিরুদ্ধে এক কোটি টাকার অনিয়মের যে অভিযোগ এনেছেন, তা প্রমাণে ব্যর্থ হলে তাকে জাতির কাছে প্রকাশ্যে ক্ষমা চাইতে হবে। উল্লেখ্য, এসব নিন্দা ও সমালোচনার কোনো জবাব সাবেক সিইসি নূরুল হুদা এখন পর্যন্ত দেননি।

বাংলাদেশে এ পর্যন্ত ১৩টি নির্বাচন কমিশন গঠিত হয়েছে। এগুলোর অধিকাংশের বিষয়ে নানা সমালোচনা রয়েছে। নির্বাচন সুষ্ঠু করতে না পারা, ক্ষমতাসীনদের নির্দেশ অনুযায়ী কাজ করা, নির্বাচনে পক্ষপাতিত্ব ইত্যাদি অভিযোগ করা হয়েছে ওইসব নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে। কিন্তু কোনো নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ ওঠেনি। ব্যতিক্রম সদ্য বিদায়ী কে এম নূরুল হুদার কমিশন। ১০ ফেব্রুয়ারি সমকালে 'দুর্নীতির অভিযোগের তিলক এঁকে বিদায়ের পথে ইসি' শীর্ষক এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও পঞ্চম উপজেলা নির্বাচনের আগে বিভিন্ন পর্যায়ের সরকারি-বেসরকারি কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণের জন্য বিশেষ বক্তা, কোর্স উপদেষ্টাসহ কয়েকটি পদ সৃষ্টি করে সারাদেশে সাড়ে তিন কোটি টাকা সম্মানী ভাতা দেওয়া হয়। রাজস্ব অধিদপ্তরের অডিটে বলা হয়, এসব পদ অনুমোদিত নয়। ফলে এই খাতে রাষ্ট্রের আর্থিক ক্ষতি হয়েছে। অথচ মেয়াদের শেষ কার্যদিবসে এক সংবাদ সম্মেলনে বিদায়ী সিইসি নূরুল হুদা তৃপ্তির ঢেকুর তুলেছেন। বলেছেন, দায়িত্ব পালনে তিনি ব্যর্থ নন, সফলভাবে তারা দায়িত্ব পালন করেছেন। ভবিষ্যতে এ নিয়ে তিনি বিব্রত বোধও করবেন না। সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেছেন, 'নির্বাচনে আইনকানুন ও নিরপেক্ষ দৃষ্টিভঙ্গির কোনো অভাব রাখিনি। আমরা নিরপেক্ষ থেকে কাজ করার সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছি। কাজেই কোনো বিব্রত বোধ নেই, কোনো দুর্বলতাও নেই।' একই দিনে নির্বাচন কমিশনার মাহবুব তালুকদার নির্বাচন ভবনে তার অফিস কক্ষে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে বলেছেন, 'সদ্য সমাপ্ত ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে, ওই নির্বাচনে গণতন্ত্র নেই, গণতন্ত্রের লাশ পড়ে আছে। এই লাশ সৎকারের দায়িত্ব কে নেবে?'

সাবেক নির্বাচন কমিশনার মাহবুব তালুকদার বিভিল্প ম্নসময়ে সিইসির বিপরীত কথা বলে জনদৃষ্টি আকর্ষণে সক্ষম হন। এর আগে দেশের গণতন্ত্র জটিল রোগে আক্রান্ত এবং তাকে বাঁচাতে মেডিকেল বোর্ড গঠনের প্রয়োজনীয়তার কথা বলে আলোড়ন তুলেছিলেন। নির্বাচন কমিশনের বিভিন্ন সভায় উপস্থিত থেকে কোনো কোনো বিষয়ে আপত্তি তুলে 'নোট অব ডিসেন্ট' দিয়েও তিনি জনপ্রশংসা কুড়িয়েছেন। দায়িত্বের শেষ দিনে তার ওই মন্তব্য এখনও আলোচনার বিষয়বস্তু। রাজনৈতিক বিশ্নেষকরা বলছেন, মাহবুব তালুকদার গণতন্ত্রের লাশ পড়ে আছে বললেও বাস্তবে দেশে এখন পর্যন্ত লাশ হয়নি, তবে মৃতপ্রায় অবস্থায় উপনীত হয়েছে। এখনও গণতন্ত্রের দেহে যেটুকু শ্বাস-প্রশ্বাস চলছে, তা স্বাভাবিক করতে 'হাই ফ্লো অক্সিজেন' সরবরাহের কোনো বিকল্প নেই। এই মৃতপ্রায় গণতন্ত্রের দেহে প্রাণ সঞ্চারের জন্য যে সঞ্জীবনী সংগীত দরকার, তা কারা গাইবে সেটাই এখন বড় প্রশ্ন। যে কোনো দেশে গণতন্ত্রকে প্রতিষ্ঠিত করতে সবার দায়িত্বশীল ভূমিকা অপরিহার্য। সরকার, সরকারি দল, বিরোধী দল সবার মিলিত প্রচেষ্টায় গণতন্ত্র তার স্বাভাবিক অবয়ব নিয়ে দাঁড়াতে পারে। পাশাপাশি নির্বাচন কমিশন এবং প্রশাসনেরও দায়িত্বশীল ভূমিকা জরুরি। বিশেষ করে নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা একটি দেশে গণতন্ত্রের শক্তিমত্তা অর্জনের ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নির্বাচন কমিশনের ভূমিকার ওপর গণতন্ত্র কার্যকর হওয়ার বিষয় বহুলাংশে নির্ভর করে; যা সদ্যগত নির্বাচন কমিশন রাখতে ব্যর্থ হয়েছে।

দুঃখজনক বিষয় হলো, পাঁচ বছর দায়িত্ব পালন করে নূরুল হুদা কমিশন ভবিষ্যতের জন্য ইতিবাচক কোনো দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে পারেনি। নতুন দায়িত্বপ্রাপ্ত নির্বাচন কমিশন পুরাতন ক্ষতের উপশমে কতটা সক্ষম হবে, এর জন্য তাকিয়ে থাকতে হবে আমাদের সামনের দিকে। পুরোনো ধাঁচে গঠিত নতুন নির্বাচন কমিশনকে প্রমাণ দিতে হবে তারা ব্যতিক্রম। নতুন প্রধান নির্বাচন কমিশনার যে প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন, তা বাস্তবায়নে কতটা কী হয় তাও দেখার বিষয়। কমিশনে যারা এসেছেন তাদের দায়িত্ব মৃতপ্রায় গণতন্ত্রকে সুস্থ করে তোলা। এই দায়িত্ব তারা বিশ্বস্ততার সঙ্গে পালন করবেন- দেশবাসীর প্রত্যাশা সেটাই।

মহিউদ্দিন খান মোহন: সাংবাদিক ও রাজনীতি বিশ্নেষক