১৯৪৭ সালের আগস্টে বাঙালিদের জন্য পূর্ব পাকিস্তান সৃষ্টি হলেও ১৯৪৮ সালের শুরুতেই বাঙালিরা বুঝে উঠেছিল, পূর্ব পাকিস্তান হিসেবে কিছুতেই বেশি দিন থাকা যাবে না। তাই পাকিস্তানের পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকরা যেমন মূলে নানাভাবে আঘাত করে বাঙালিদের স্বাধীন চেতনাকে ভূলুণ্ঠিত করতে ব্যস্ত হয়ে উঠেছিল, তেমনি বাঙালিরাও সর্বোচ্চ ত্যাগ স্বীকার করেই মুক্তির জন্য পাকিস্তানি শাসকদের শোষণ-অত্যাচারের জিঞ্জির ভেঙে বেরিয়ে আসার সর্বমুখী ও সর্বজনীন সংগ্রাম শুরু করে। এরই ধারাবাহিকতায় ১৯৭১ সালের মার্চ মাসে বাঙালিদের মুক্তি এবং স্বাধীন বাংলাদেশ ঘোষণা অপরিহার্য হয়ে ওঠে। এ জন্য আধুনিক সমরাস্ত্রে সজ্জিত পাকিস্তানি শাসক-শোষকদের বিরুদ্ধে প্রায় নিরস্ত্র বাঙালিদের সশস্ত্র সংগ্রাম অর্থাৎ যুদ্ধ অপরিহার্য হয়ে দেখা দেয়। 

এমনই এক অবস্থায় ১৯৭১ সালের ৭ মার্চে সাড়ে সাত কোটি বাঙালির পক্ষে লাখ লাখ বাঙালি সেই দিনের ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে অর্থাৎ আজকের হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে সমবেত হয় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নির্দেশ পাওয়ার জন্য। বঙ্গবন্ধু সেভাবেই অতীত, বর্তমান এবং ভবিষ্যতের জন্য সুস্পষ্ট নির্দেশনা সংবলিত একটি ভাষণ দেন। প্রায় ২৩ মিনিটের বক্তৃতায় হাজার বছরের বাঙালিদের সেই সময়ের জন্য যেমন সবচেয়ে উপযুক্ত ছিল, তেমনি ভাষণটি আজও অতীব প্রাসঙ্গিক। এ জন্য বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ বিশ্বের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ভাষণ এবং বঙ্গবন্ধুর এ ভাষণ অবিচ্ছেদ্য।

৭ মার্চের বঙ্গবন্ধুর ভাষণে সত্যিকার অর্থেই লক্ষণীয় কিছু বিষয় ছিল। পাকিস্তানিদের রোষানলের মধ্যে থেকেও স্বাধীন বাংলাদেশের ঘোষণা প্রত্যাশী বাঙালি জনতার সামনে দাঁড়িয়ে নির্ভীক চিত্তে ও দৃঢ় কণ্ঠে শুধু বাঙালিদের মুক্তি ও স্বাধীনতার শতভাগ পক্ষে বক্তৃতা প্রদান করা ছিল বঙ্গবন্ধুর জন্য এক জীবন-মরণ চ্যালেঞ্জ। কিন্তু অতি রাজনৈতিক প্রজ্ঞা নিয়ে বঙ্গবন্ধু সুকৌশলে যা উচ্চারণ করেছিলেন, তা পৃথিবীর ইতিহাসে আর একটিও নেই। পরিস্থিতি এমনই ছিল যে, রেসকোর্স ময়দানে আসার আগেই তার গ্রেপ্তার হওয়ার কথা, ভাষণ কালেই গ্রেপ্তার বা গুলিবিদ্ধ হওয়ার কথা কিংবা ভাষণ শেষে অনির্দিষ্টকালের জন্য অন্তরীণ হওয়ার কথা। কিন্তু পাকিস্তান শাসকদল কিছুই করতে সাহস পায়নি বরং তারা কিৎকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে পড়েছিল।

বঙ্গবন্ধু জীবনের ঝুঁকি নিয়ে বক্তৃতা দিতে মুক্তি পাগল বাঙালি জনতার সামনে যখন এসেছিলেন, তখন তার পরিবারের সদস্যরা তাকে উৎসাহ দিয়েছেন এবং নিজেরাও সাধারণ বাঙালিদের কাতারে দাঁড়িয়ে ছিলেন। এটিও পৃথিবীর স্বাধীনতার সংগ্রামের ইতিহাসে একজন নেতার ক্ষেত্রে বিরল ঘটনা। ভাষণে বঙ্গবন্ধু কিছু অসাধারণ শব্দ চয়ন করেছিলেন। যেমন- জীবন দিয়ে চেষ্টা করেছি; ২৩ বছরের ইতিহাস মুমূর্ষু নর-নারীর ইতিহাস; ভায়েরা আমার; রক্তের দাগ শুকায় নাই; আমি প্রধানমন্ত্রিত্ব চাই না; এ দেশের মানুষের অধিকার চাই; আর যদি একটা গুলি চলে; প্রত্যেক ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তোল; আমি যদি হুকুম দেবার নাও পারি; সাত কোটি মানুষকে দাবায়ে রাখতে পারবা না; আমি যা বলি তা মানতে হবে; এই বাংলায় হিন্দু-মুসলমান বাঙালি-অবাঙালি যারা আছে তারা আমার ভাই। এ শব্দগুলো খুবই হৃদয়গ্রাহী হয়েছিল এবং এগুলো ওই ভাষণের প্রয়োজনীয়তাকে অসাধারণ করে তুলেছিল। 

একজন ভাষণদাতার কেবল উচ্চারিত বক্তব্যই ভাষণকে কালজয়ী ও মাধুর্যময় করে তুলতে পারে না এবং কখনও পারেনি। এ ক্ষেত্রে ভাষণদাতার দৈহিক অবয়র, শারীরিক উপস্থাপনা, ব্যক্তিত্ব, দাঁড়ানোর স্টাইল, শব্দচয়ন, দর্শক-শ্রোতার মনের ও চোখের গতি প্রকৃতির সঙ্গে নিজের মনের ও চোখের গতি প্রকৃতিকে এক করে ফেলা একটা বড় বিষয়। বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণকালে ওইগুলো প্রত্যাশার চেয়েও অনেক বেশি ছিল। ভাষণের সার্থকতার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে, শ্রোতাদের মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে যাওয়া। বক্তার বক্তব্য ও অঙ্গভঙ্গির সঙ্গে শ্রোতাদের লীন হয়ে যাওয়া। এ ভাষণে তা ছিল। 

ভাষণটি ছিল যেন পুরোটাই একটি কাব্যিক উপস্থাপনা। বিশ্বজয়ী একটা ভাষণের জন্য যা যা দরকার তার সবই ওই ভাষণের মধ্যে এবং ভাষণের আগে ও পরে যুক্ত ছিল। এ জন্যই কবি নির্মলেন্দু গুণ ভাষণটির আদ্যপ্রান্তের একটি কাব্যিক পরিবেশনা করতেও সক্ষম হয়েছেন; যা ইতিহাসের আর কখনও এমনটি ঘটেনি। কবি নির্মলেন্দু গুণ তার কবিতায় চমৎকার বর্ণনা ধরেই বঙ্গবন্ধু বিশ্বদরবারে রাজনৈতিক কবি হিসেবে স্বীকৃতিপ্রাপ্ত হয়েছে।

ওই সময় রেসকোর্স ময়দানে সেই ভোর থেকে অপেক্ষমাণ জনতার চাওয়া-পাওয়ার সঙ্গে বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণের সঙ্গে সম্পৃক্ত সবকিছু মিলে একেকার হয়ে পড়েছিল। ভাষণের কোনো স্থানে সামান্যতম ফাঁকফোকর বা ঘাটতি ছিল না এবং আজও কোনো ঘাটতি বা ফাঁকফোকর খুঁজে পাওয়া যাবে না। বঙ্গবন্ধুর সর্বমুখী দৃঢ়তা এবং অতুলনীয় নেতৃত্বের অসাধারণতা প্রকাশ পায়, যখন তিনি কোনো আনুষ্ঠানিক কর্তৃত্ব না পেয়েও কর্তৃত্ববাদী জুলুমবাজ পাকিস্তানি শাসক কর্তৃপক্ষকে আঙুল উঁচিয়ে অ্যাসেমব্লিতে বসার জন্য ৫টি দাবি করেন। যথা- সামরিক আইন মার্শাল ল উঠিয়ে নিতে হবে; সব সামরিক বাহিনীর লোকদের ব্যারাকে ফেরত নিতে হবে; যেভাবে হত্যা করা হয়েছে তার তদন্ত করতে হবে এবং জনগণের প্রতিনিধির কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করতে হবে।

নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠ আওয়ামী লীগের নেতা হওয়া সত্ত্বেও বঙ্গবন্ধুকে প্রধানমন্ত্রিত্ব বা ক্ষমতা দেওয়া হয়নি। তারপরও তিনি বাঙালিদের একচ্ছত্র নেতৃত্বের কর্তৃত্ববলে সেই ভাষণে নিম্নরূপ ৪টি নির্দেশ পালনের জন্য বাঙালিদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছিলেন- আজ থেকে বাংলাদেশের কোর্ট-কাচারি, আদালত-ফৌজদারি, শিক্ষা-প্রতিষ্ঠান অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ থাকবে; রিকশা, গরুর গাড়ি, রেল ও লঞ্চের চলাফেরা হরতালের আওতার বাইরে থাকবে; সেক্রেটারিয়েট, সেমি গভর্নমেন্ট দপ্তর, ওয়াপদা বন্ধ থাকবে; মাসের ২৮ তারিখে কর্মচারীগণ যার যার বেতন নিয়ে আসবে।

উপরোক্ত নির্দেশ দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই বঙ্গবন্ধু একই সঙ্গে বুঝতে পেরেছিলেন, এসব নির্দেশ পালন করতে গেলে বাঙালিদের ওপর পাকিস্তানিদের চরম আঘাত আসবে এবং যা প্রকারান্তরে মুক্তিযুদ্ধের সূচনা করবে। এখানেও বঙ্গবন্ধুর দূরদর্শিতা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। তাই তিনি ভাষণরত অবস্থাতেই কিছু কিছু নির্দেশনা দিয়েছিলেন। যেমন- ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তুলে যার যা কিছু আছে তাই নিয়ে শত্রুর মোকাবেলা করতে হবে; পাকিস্তানিদের চলাচলের সব রাস্তা-ঘাট চিরতরে বন্ধ করে দিতে হবে; পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর যারা বাঙালিদের আন্দোলন দমনের কাজে নিয়োজিত তারা ব্যারাকে ফিরে যাবে; যারা শহীদ হয়েছেন এবং বিভিন্নভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন তাদের আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে সাহায্য করা হবে; শিল্প মালিকরা হরতালে অংশগ্রহণকারী শ্রমিকদের বেতন-ভাতা তাদের হাতে পৌঁছে দেবে; তার পুনরাদেশ না পাওয়া পর্যন্ত খাজনা ট্যাপ প্রদান বন্ধ থাকবে; সকল ধর্ম ও গোত্রের মানুষকে ভাই ভাই হিসেবে অবস্থান করতে হবে; বাঙালিদের কথা না শুনলে কোনো বাঙালি রেডিও, টেলিভিশনে যোগদান করবে না; মায়না-পত্রের জন্য মাত্র দুই ঘণ্টা ব্যাংক খোলা থাকবে; পূর্ব বাংলা থেকে এক পয়সাও পশ্চিম পাকিস্তানে চালান হবে না; পূর্ব বাংলায় টেলিগ্রাম টেলিফোন চলবে এবং বিদেশের সঙ্গেও চলবে; প্রতিটি কাজে বাঙালিরা বুঝে শুনে চলবে; গ্রামে-মহল্লায় আওয়ামী লীগের নেতৃত্বের সংগ্রাম পরিষদ গড়ে তুলে যার যা কিছু আছে তাই নিয়ে প্রস্তুত থাকতে হবে।

৭ মার্চের সংকটকালে প্রদত্ত সংক্ষিপ্ত ভাষণের মধ্য দিয়েও আমরা বঙ্গবন্ধুর চির লালিত কিছু আদর্শ ও বিশ্বাসের প্রতিফলন দেখতে পাই। তিনি বাঙালিদের চাওয়া-পাওয়ার ভিত্তিতে শাসনতন্ত্র রচনা করেই দেশ গঠন এবং বাঙালিদের অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক মুক্তি নিশ্চিত করার কথা বলেছিলেন অর্থাৎ দেশ গড়ার লক্ষ্যে একটি উপযুক্ত শাসনতন্ত্রের অপরিহার্যতার কথা স্পষ্টভাবে বলেছিলেন। তিনি বিশেষভাবে উল্লেখ করেন, ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান হওয়ার পরপরই শাসনতন্ত্র ও গণতন্ত্র নিশ্চিত করার কথা থাকলেও ২৫ বছরে তার বিন্দু পরিমাণ কাজ করা হয়নি। তিনি উল্লেখ করেন, জাতীয় সংসদে একজন প্রতিনিধির ন্যায্য দাবি মেনে নেওয়া হবে। এর ফলে তার অসাম্প্রদায়িক চেতনার বহিঃপ্রকাশ ঘটে। অন্যদিকে জাতীয় সংসদের কার্যকারিতার কথা উল্লেখ করে বঙ্গবন্ধু মূলত গণতন্ত্রের প্রতি তার বিশ্বাসের কথাই জোর দিয়েছেন। সংগ্রামের একেবারে শেষ প্রান্তে এত কিছুর পরও বাঙালিরা স্বতঃস্টম্ফূর্ত ও শান্তিপূর্ণভাবে প্রতিবাদ সমাবেশ ও মিছিল করায় বঙ্গবন্ধু প্রতিবাদী এবং স্বাধীনতাকামী বাঙালিদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়ে উগ্রতার পরিবর্তে শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ ও সহিষুষ্ণতার প্রতিই তার আনুগত্য প্রকাশ করেছেন।

বঙ্গবন্ধু তার ভাষণেই সাধারণ মানুষের ট্যাপে প্রতিপালিত সেনাবাহিনীকে তাদের অবস্থান ও দায়িত্ব-কর্তব্য সম্পর্কে সচেতন করে দিয়ে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেন, তাদের কাজ দেশ রক্ষা করা এবং সাধারণ মানুষের বুকে গুলি চালানো নয়। ভাষণে তিনি গরিব শ্রমিক, দিনমজুর কাজকে হরতালের আওতার বাইরে রেখে এবং কর্মচারী ও শ্রমিকদের বেতন-ভাতার প্রাপ্তির নির্দেশনা প্রদান করে হিউম্যান করিডোর খোলা রেখে মানবিকতার বহিঃপ্রকাশ ঘটিয়েছেন। এতে বুঝা যায় তিনি সর্ব অবস্থায় গরিব ও দুঃখী মানুষের পক্ষে ছিলেন।

উপরোক্তভাবে এত অল্প সময়ের একটি ভাষণে বঙ্গবন্ধু পাকিস্তানি শাসকদের প্রতি হুঁশিয়ারি, সরকারি কাজে নিয়োজিত সরকারি কর্মচারীদের প্রতি নির্দেশনা, বাঙালি জাতির প্রতি নির্দেশনা, মুক্তিযুদ্ধের প্রস্তুতি, আপদকালীন সময়ে করণীয়, বিদেশের সঙ্গে যোগাযোগ, তার অনুপস্থিতিতে করণীয়, আওয়ামী লীগের নেতৃত্ব, মানবিকতা, দেশের অভ্যন্তরীণ শত্রুতা ইত্যাদি সবকিছু সুস্পষ্টভাবে উচ্চারণ করে মাত্র কয়েকটি বাক্যে এই বলে জাতির উদ্দেশ্যে উচ্চারণ করেন, 'রক্ত যখন দিয়েছি রক্ত আরও দিব। এ দেশের মানুষকে মুক্ত করে ছাড়ব ইনশাল্লাহ। এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম। জয় বংলা।'