লিবিয়া থেকে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে ইতালি যাওয়ার পথে মাল্টার কাছাকাছি একটি এলাকায় নৌকাডুবিতে ১৫ বাংলাদেশি নিখোঁজ হওয়ার পর নরসিংদী জেলা গোয়েন্দা পুলিশ মানব পাচারকারী দলের দুই সদস্যকে গ্রেপ্তার করেছে।

তারা হলেন- রায়পুরা উপজেলার হাসনাবাদ এলাকার বাচ্চু মোল্লার ছেলে তারেক মোল্লা (৩০) এবং একই উপজেলার আগানগর এলাকার কালীপদ শীলের ছেলে সুবল চন্দ্র শীল (৪৫)। 

নরসিংদীর অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (অপরাধ) সাহেব আলী পাঠান সমকালকে এই তথ্য জানিয়েছেন।

তিনি বলেন, ‘আসামিরা রায়পুরা এলাকার আরও অনেককে বিদেশে পাঠাবে বলে বিভিন্ন দেশে পাচার করেছে। নরসিংদী জেলা গোয়েন্দা শাখা (ডিবি) মানব পাচারকারী এই চক্রকে সনাক্ত করে এবং মানবপাচারের সাথে জড়িত সকল আসামিদের গ্রেপ্তারের লক্ষ্যে অভিযান অব্যাহত রেখেছে। আসামিদের বিরুদ্ধে রায়পুরা থানায় মামলা রুজু করা হয়েছে।’

ভূমধ্যসাগরের সেই ঘটনা নিয়ে সমকাল অনলাইনে ‘নরসিংদীর ১৫ জনের পরিবারের আহাজারি থামেনি’ শিরোনামে সংবাদ প্রকাশিত হয়েছিল।

এই দালাল চক্রের শিকার ভুক্তভোগীর পরিবার জানান, গত ২৭ জানুয়ারি লিবিয়া থেকে ইতালির উদ্দেশ্যে যাওয়ার পথে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দেওয়ার সময় নৌকাডুবিতে  

নিখোঁজ ২৮ জন, তাদের মধ্যে ১৫ জনই নরসিংদীর। ধারণা করা হচ্ছে, তাদের সবারই মৃত্যু হয়েছে। ওই নৌকার বেঁচে যাওয়া যাত্রী ইউসুফ মৃধা রায়পুরা উপজেলার খোরশেদ মৃধার ছেলে।

দুর্ভাগ্যের শিকার ব্যক্তিরা হলেন-রায়পুরার ডৌকারচরের নাদিম সরকার (২২), আলমগীর সরকার (৩৫), আল-আমিন ফরাজী (৩৩), আমিরগঞ্জের ইমরান মিয়া (২১), আশিস সূত্রধর (২১), সবুজ মিয়া (২৫), দক্ষিণ মির্জানগরের এসএম নাহিদ (২৫), হাইরমারার শাওন মিয়া (২২), সেলিম মিয়া (২৪), বেলাব উপজেলার আল আমিন (২৮), নারায়ণপুরের মতিউর রহমান (৩৭), সল্লাবাদের শরীফুল ইসলাম (২৪), বিপ্লব মিয়া (২৪), সালাউদ্দিন (৩২) ও মো. হালিম (২৬)। বাকি ১৩ জন ফরিদপুর, কিশোরগঞ্জ, বরিশাল, মাদারীপুর, গোপালগঞ্জ, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, গাজীপুর ও সিলেটের বাসিন্দা। সবার বাড়িতেই আহাজারি চলছে।

পুলিশের কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, রায়পুরা উপজেলার আমিরগঞ্জের আগানগর গ্রামের পরিমল চন্দ্র শীলের ছেলে মনি চন্দ্র শীল গত ৫-৬ বছর ধরে লিবিয়া চাকরি করছেন। গ্রেপ্তার হওয়া তারেক মোল্লা (৩০) ও তার বড় ভাই মামুন মোল্লা (৩৯) তাদের নিকট আত্মীয়দের মাধ্যমে ইতালি নিয়ে যাবে বলে বিভিন্ন লোকের নিকট থেকে অর্থ আদায়সহ বিভিন্ন দেশে মানবপাচার করতে থাকে। 

এরই ধারাবাহিকতায় আমিরগঞ্জ ও এর আশপাশের এলাকার আশিষ সূত্র ধর (২১) আলামিন ফরাজী (৩০), নাদিম সরকার (২২) সহ আরও কয়েকজনকে বৈধপথে ইতালি নেওয়ার কথা বলে প্রায় সাড়ে ৮ লাখ টাকার মৌখিক চুক্তি হয়। 

পরবর্তীতে বিভিন্ন তারিখ ও সময়ে তারেক মোল্লা ও মামুন মোল্লা দুভাই মিলে আশিষ সূত্রধরের পিতার বসতবাড়ি হতে ৬ লাখ টাকা গ্রহণ করে। বাকি ২ লাখ টাকা আশিষ ইতালি পৌঁছার পর  তারেক মোল্লা আশিষের পিতা অনিল সূত্রধরের কাছ থেকে নিবে বলে জানায়। একইভাবে ভিকটিম নাদিম সরকারের কাছ থেকে সাড়ে ৮ লাখ টাকায় মৌখিকভাবে চুক্তিবদ্ধ হয়। 

বিভিন্ন তারিখ ও সময়ে তারেক মোল্লা এবং মামুন মোল্লা সাড়ে ৬ লাখ টাকা নগদ গ্রহণ করে। বাকি ২ লাখ টাকা ভিকটিম নাদিম সরকার ইতালি পৌঁছার পর তারেক মোল্লা গ্রহণ করবে মর্মে কথা হয়। একইভাবে ভিকটিম আলামিন ফরাজীর ভাই ইয়ামিনের কাছ থেকেও সাড়ে ৮ লাখ টাকায় মৌখিক চুক্তি হয়। পরে বিভিন্ন তারিখ ও সময়ে সাড়ে ৬ লক্ষ টাকা তারা নগদ হিসেবে গ্রহণ করে।

গত বছর ২৯ নভেম্বর সন্ধ্যা ৬টার দিকে মানবপাচারকারী চক্রের সদস্য তারেক মোল্লা আশিষকে তার বাড়ি হতে নিয়ে ঢাকা বিমানবন্দরের উদ্দেশ্যে রওনা দেয়। পথে ঢাকার রামপুরা করোনা টেস্ট সম্পন্ন করেন। পরদিন (৩০ নভেম্বর) সকাল ৮টায় ঢাকা বিমানবন্দর হতে তারা ইতালির উদ্দেশ্যে রওনা হয়। 

পরবর্তীতে আশিষ সূত্রধরকে দালালরা ইতালি না পাঠিয়ে পারস্পরিক যোগসাজশে প্রতারণা করে লিবিয়াতে পাঠায়। লিবিয়া পৌঁছার পর আশিষ তার পরিবারকে জানান, তিনি লিবিয়াতে রয়েছেন। 

সর্বশেষ গত ২৭ জানুয়ারি সন্ধ্যার পর আশিষ সূত্রধরের সঙ্গে তার পরিবারের সদস্যরা আর যোগাযোগ করতে পারেন না। দালাল চক্রের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তারা জানান, আশিষ ইতালিতে রয়েছেন। তাদের আরও ২ লাখ টাকা লাগবে বলে চাপও দেন পরিবারকে।