এ কেমন সমাজ, যেখানে ভোক্তাদের জিম্মি করে নাকের ডগায় নানা পদের মোড়লের নির্লজ্জ নৈরাজ্য এবং খবরদারিতে প্রায়ই আমরা বিহ্বল হয়ে যাই। সর্বত্রই যাতনা। প্রায়ই দেখা যায়, পরিবহন খাতের নগ্ন থাবায় আমজনতা নতিস্বীকার করে তাদের আবদার মানতে বাধ্য হয়। বলা নেই কওয়া নেই মধ্যরাতে হঠাৎ এ সমাজে পরিবহন ধর্মঘটের ডাক শোনা যায়। অথচ এমন কি হওয়ার কথা ছিল? জাতীয় দৈনিকের প্রতিবেদন অনুযায়ী খোদ রাজধানীতে ৯৫ শতাংশ গাড়ির ইঞ্জিন সিএনজিচালিত। ৬০ শতাংশ দূরপালল্গার গাড়িতেও সিএনজির সিলিন্ডার সংযুক্ত। অথচ ডিজেলের দাম বাড়ার অজুহাতে বাড়তি ভাড়া হাঁকিয়ে জনদুর্ভোগ সৃষ্টি করে তৃপ্তির ঢেঁকুর তুলছে। এ কেমন আচরণ? সেবা খাতের মোড়লদের অরাজকতার শেষ কোথায়?
ফুটপাতে পথচলা নাগরিকের অধিকার। অথচ এখানটায় শকুনের থাবা। নির্বিঘ্নে নিরাপদে ভাবলেশহীন চিত্তে পায়চারী করার সুযোগটুকু আজ বন্দি। যানজটের সময় দেখা যায়, মোটরসাইকেল আরোহীরা সহাস্যে ফুটপাত দিয়ে যান চালিয়ে নিরাপদ গন্তব্যে চলে যাচ্ছে। যেন দেখার কেউ নেই। বিপণিবিতানগুলো এমনভাবে পসরা সাজিয়ে বসে আছে; মনের অজান্তেই বলতে ইচ্ছে করে, এ যেন তাদের মৌরসি সম্পত্তি। যেভাবে ইচ্ছা সেভাবে ব্যবহার করতে পারবে। বিপণিবিতান, হোটেল-মোটেল, চেইনশপ, সুপারশপ পণ্যের বিপরীতে সরকার নির্ধারিত মূসক চালানে ভ্যাট আদায়ের রীতি কিতাবে আছে। বাস্তবে আমরা কী দেখি? মালিকপক্ষের এসবে অনীহা। তাদের ভাবখানা দেখলে মনে হবে, চালানের কদাচিৎ কপি চেয়ে যেন ভোক্তারা অপরাধই করে ফেলেছে। এ কেমন রীতি!
সমাজের চারপাশে মূল্যবোধের দীনতা, পাপবোধ, অসংগতি, ব্যভিচার এবং বেহায়াপনার
রুগ্‌ণ প্রতিযোগিতা দৃশ্যমান। লিভ টুগেদার যেন উচ্চবিত্তের যাপিত জীবনে নৈমিত্তিক প্রপঞ্চে রূপ নিয়েছে। যেখানটায় গণমাধ্যমে প্রকাশ্যে মেডিকেলপড়ূয়া শিক্ষিত তন্বী অবলীলায় ভ্রূণ হত্যার বিচার চায়- আর যাই হোক এসব যে ছেলেখেলায় পরিণত হয়েছে, তা অনায়াসে বলে দেওয়া যায়। শালীনতা, সভ্যতা, মান্যতা, নৈতিকতা বলে কিছু আছে? মানবাধিকারের দোহাই দিয়ে এসব কর্ম সম্পাদনের খেসারত হিসেবে আত্মহত্যা, চাপ, হতাশার মতো বাহন সমাজ-সংস্কৃতিতে জেঁকে বসেছে, যা কখনোই শুভবার্তার ইঙ্গিত বহন করে না।
বিদেশি জিনিসের প্রতি আমাদের আলগা প্রেম-কদর। একে পাওয়ার নেশায় প্রায়ই আমরা ছুটে বেড়াই। অখ্যাত ব্র্যান্ডের পণ্য ব্যবহারের ক্ষেত্রে ভোক্তাদের মাঝে অযুত অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও এ থেকে জাতি বিন্দুমাত্র পেছনে যেতে নারাজ। যেখানটায় মানের নিশ্চয়তার অভাব, অনলাইননির্ভরতা, খুচরা যন্ত্রাংশের দুষ্প্রাপ্যতা, ভেজাল প্রসাধনীর সয়লাব। তার পরও কি আমদের হুঁশ হবে না? ফলে বিকাশমান দেশীয় শিল্প বিখ্যাত তাঁত, কুটিরশিল্পের মতো নানামুখী তৎপরতা মৃতপ্রায় ভাগাড়ে পরিণত হচ্ছে। অথচ এসব কি হওয়ার কথা ছিল?
দেশের সর্বত্র জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে সরকারি এবং বেসরকারি কলেজে একাধিক বিষয়ে সম্মান এবং স্নাতকোত্তরে জ্ঞান বিতরণ হয়; যদিও পর্যাপ্ত এবং মানসম্পন্ন শিক্ষকের যথেষ্ট ঘাটতি রয়েছে। শিক্ষাসংশ্নিষ্ট অনেক বড় কর্তার আলোচনায়ও এসবের নিষ্ফম্ফল আবেদনের ইঙ্গিত পাওয়া যায় এবং এও শোনা যায়, হয়তো নিকট ভবিষ্যতে এর যবনিকাপাত ঘটতে পারে। কিন্তু বাস্তবে আমরা কি দেখছি? নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা না করে প্রায় অনেক কলেজ বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ তকমায় ভূষিত হওয়ার ঘৃণ্য কর্মযজ্ঞে জড়িয়ে কীসের ইঙ্গিত দিচ্ছে?
পবিত্র প্রতিষ্ঠানের পরিচয়ের মাঝে যদি গলদের উপস্থিতি থাকে, তাহলে কোমলমতি শিশুরা কী শিখবে?
ফুলের গন্ধ শুঁকতে নাকের কাছে নিতে হয়। আর পচা জিনিসের গন্ধ এমনিতেই চলে আসে। এসব বিষয়ে আমাদের চিন্তা ও মননে পরিবর্তন আশু প্রয়োজন। শুধু নো কমেন্টস প্রথা অনুসরণে সাময়িক তৃপ্তি, আত্মতুষ্টি এবং নিজেকে হয়তো ভালো রাখা যাবে। তবে এসবের আড়ালে স্বকীয়তা, সভ্যতা, নৈতিকতা, লজ্জাবোধ, মান্যতা ক্রমান্বয়ে সময়ের জাদুঘরে পৌঁছে যেতে পারে।
ড. মোহাম্মদ আলী ওয়াক্কাস সোহেল: শিক্ষক, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়