প্রযুক্তির উৎকর্ষের এই যুগে প্রযুক্তিই মানুষের বহু সমস্যার সমাধান দিচ্ছে। আজকের ডিজিটাল বাংলাদেশে নির্বাচন ব্যবস্থার সংকটের মতো জটিলতম সমস্যার সমাধান প্রযুক্তির মাধ্যমে করা অসম্ভব নয়। আমরা এখানে যে প্রযুক্তিগত সমাধানের কথা বলছি, সেটি হলো সারাবিশ্বে বিশেষ করে আর্থিক খাতে আস্থা ও নিরাপত্তার প্রতীক হয়ে ওঠা 'ব্লকচেইন' প্রযুক্তি। নির্বাচনে যদিও ইতোমধ্যে ইভিএম ব্যবহূত হচ্ছে। প্রযুক্তিটি সর্বজনের আস্থা অর্জনে ব্যর্থ হয়েছে।
অপরদিকে ব্লকচেইন এমন একটি প্রযুক্তি, যা ব্যবহার করে বর্তমানে পরস্পরের মাঝে জানাশোনা কিংবা আস্থা নেই এমন ব্যক্তিদের মধ্যেও বিশ্বাসযোগ্য লেনদেন নিশ্চিত করা হয়ে থাকে। ব্লকচেইন প্রযুক্তি তৃতীয় পক্ষের মধ্যস্থতা ছাড়াই সংশ্নিষ্ট পক্ষগুলোর বিশ্বাসযোগ্যতা বজায় রেখে যে কোনো আর্থিক লেনদেনে শতভাগ নিরাপত্তা ও নিশ্চয়তা বিধান করার ক্ষেত্রে ইতোমধ্যে সফলতার পরিচয় দিয়েছে। ভোট প্রক্রিয়া অনেকটা ব্যাংকের আর্থিক লেনদেনের মতোই, যেখানে ভোটদাতা ভোট প্রদান করেন এবং ভোটগ্রহীতা ভোট গ্রহণ করেন। যেহেতু ব্লকচেইন তথ্যের (ভোট) স্বচ্ছতা এবং তথ্যদাতার (ভোটার) গোপনীয়তা একই সঙ্গে নিশ্চিত করতে সক্ষম, তাই ভোট গ্রহণ প্রক্রিয়ার জন্য এটি একটি অতি উত্তম প্রযুক্তি হতে পারে। ইতোমধ্যে সিয়েরা লিওন, রাশিয়া, থাইল্যান্ড এবং আমেরিকার কয়েকটি স্টেটে ব্লকচেইনভিত্তিক ভোটিং ব্যবস্থা সম্পূর্ণ বা আংশিকভাবে চালু করা হয়েছে।
ইলেকশন কমিশন ব্লকচেইনভিত্তিক অনলাইনে ভোট গ্রহণের জন্য একটি সফটওয়্যার তৈরি অথবা ক্রয় করতে পারে। সফটওয়্যারটি জাতীয় ভোটার আইডি ডাটাবেজ থেকে ভোটার-সংক্রান্ত সব তথ্য সংগ্রহ করবে। সবার বিশ্বাসযোগ্যতা অর্জনের জন্য নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী সব প্রতিপক্ষকে এই সফটওয়্যারের সোর্স কোড প্রদান করবে। প্রতিটি দলের তথ্যপ্রযুক্তি বিষয়ে বিশেষজ্ঞ প্রতিনিধির উপস্থিতিতে এর সঠিকতা প্রদর্শন করা হবে। টেস্ট সম্পন্ন হলে সফটওয়্যারটির একটি ডিজিটাল স্বাক্ষর গ্রহণ করে সব এজেন্টকে দিতে হবে। যেহেতু সবার প্রতিনিধির কাছেই সোর্স কোডটি থাকবে; তাই বিভিন্ন দল ইচ্ছা করলে নিজেদের বিশেষজ্ঞ নিয়োগ করে সহজেই সফটওয়্যারটির সঠিকতা যাচাই করে দেখতে পারে।
ভোটের দিন নির্বাচন কমিশন নিবন্ধিত সব রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধিসহ জনসমক্ষে অ্যাপ্লিকেশনটি ডিজিটাল স্বাক্ষর (যা সব প্রতিনিধির কাছে আছে) মিলিয়ে চালু করবে। ডিজিটাল স্বাক্ষর মিলিয়ে অ্যাপ্লিকেশনটি চালু করার অংশটি অনলাইনে লাইভ প্রদর্শন করে নির্বাচন কমিশন এই অ্যাপ্লিকেশনটির ওপর সর্বস্তরের জনগণের সম্পূর্ণ আস্থা অর্জনের ব্যবস্থাও করতে পারে।
ভোটাররা দু'ভাবে ভোট দিতে পারবেন। প্রথমত, ব্যক্তিগত কোনো স্মার্ট ডিভাইস ব্যবহার করে আঙুলের ছাপ অথবা জাতীয় আইডি কার্ড স্ক্যান করার অপশন ব্যবহার করে ঘরে বসেই ভোট দিতে পারবেন। এনআইডি ব্যবহার করা হলে ভোটদাতার স্মার্ট ডিভাইসে একটি 'ওয়ান টাইম পাসওয়ার্ড' পাঠাতে হবে। এ পদ্ধতিতে বিদেশে অবস্থানরত বাংলাদেশি নাগরিকরাও ভোট দিতে পারবেন। দ্বিতীয়ত, যাদের স্মার্ট ডিভাইস ব্যবহারের সুযোগ নেই তাদের জন্য ভোটকেন্দ্রে গিয়ে ভোট প্রদানের সুবিধা থাকবে। আজকাল প্রত্যন্ত গ্রামেও ইন্টারনেট সুবিধা পৌঁছে গেছে বিধায় বাংলাদেশের যে কোনো স্থান থেকেই ভোটার ভোট দিতে সক্ষম হবেন। ভোটার আঙুলের ছাপ ব্যবহার করে ভোট দেবেন। প্রতিটি ভোটকেন্দ্রে আঙুলের ছাপ গ্রহণের স্ক্যানারযুক্ত পর্যাপ্তসংখ্যক টাচ-স্ট্ক্রিন ডিভাইস থাকবে। ডিভাইসের সিস্টেমটি অনলাইন ভোট গ্রহণ অ্যাপ্লিকেশনের সঙ্গে ইন্টারনেটের মাধ্যমে সংযুক্ত থাকবে। ভোটারের আঙুলের ছাপ মিলে গেলে স্ট্ক্রিনে প্রত্যেক প্রার্থীর প্রতীক ভেসে উঠবে। ভোটার যাকে ভোট দেবেন তার প্রতীকে আঙুল স্পর্শ করবেন। এ ক্ষেত্রে আঙুলের ছাপের মাধ্যমে ভোট গ্রহণ করা হবে বিধায় একজনের ভোট অন্যজনে দেওয়া কিংবা যার ভোট তাকে ছাড়া অন্য কারও পক্ষে দেওয়া সম্ভব হবে না। ফলে ভোট দেওয়ার ক্ষেত্রে কোনো ধরনের কারচুপি করা সম্ভব হবে না।
অন্যদিকে, ভোট দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই তা স্বয়ংক্রিয়ভাবে গণনা হতে থাকবে এবং অনলাইনে ভোটারসহ যে কেউ যে কোনো সময় সে সময়কার ফলাফল দেখতে পারবেন। ভোট শেষে অফিসিয়ালি নির্বাচন কমিশনের ওয়েবসাইটে ফল প্রকাশিত হবে যদিও; তা আগে থেকেই দেখতে পারবেন এবং নির্বাচন কমিশনের পক্ষেও তা পরিবর্তনযোগ্য থাকবে না। কারণ ভোটসংক্রান্ত সব তথ্যই ব্লকচেইনে সংগৃহীত হবে। তাই এটি পরিবর্তন করা সম্ভব হবে না। ভোটকেন্দ্রগুলো সারাক্ষণ সিসিটিভির আওতাধীনে রেখে তা সরাসরি সম্প্রচার করা যেতে পারে। এতে কেন্দ্রগুলোর নিরাপত্তাও বহু গুণ বেড়ে যাবে।
ব্লকচেইনভিত্তিক অনলাইন ভোট গ্রহণ পদ্ধতি ব্যবহার করে শুধু যে সহজ, নির্ভুল ও বিশ্বাসযোগ্যভাবে ভোট গ্রহণ করাই সম্ভব হবে, তাই নয়; এর মাধ্যমে
বর্তমান ভোট ব্যবস্থাপনার অন্যান্য প্রধান ত্রুটি যেমন- কেন্দ্র দখল করে গণহারে কোনো প্রার্থীর পক্ষে সিল মারা; একজনের ভোট অন্যজনে দেওয়া; ভোট গণনায় কারচুপি করা; একজন ভোটার কর্তৃক একাধিক ভোট দেওয়া; ভোটের ফলাফল পরিবর্তন করা ইত্যাদি সহজে দূর করা সম্ভব হবে। প্রক্রিয়াটি অত্যন্ত স্বচ্ছ হবে বিধায় তা সবার কাছে গ্রহণযোগ্য হবে। অনেকের মনে হতে পারে, অনলাইনভিত্তিক ভোট গ্রহণ পদ্ধতির জন্য বাংলাদেশ এখনও প্রযুক্তিগতভাবে সক্ষম নয়। কিন্তু এমন আশঙ্কা করার কোনো কারণ নেই। কারণ, তথ্যপ্রযুক্তির যে স্তরে বাংলাদেশ এখন প্রবেশ করছে, তাতে খুব সহজেই এ প্রক্রিয়া গ্রহণ করা যায়। এ ক্ষেত্রে ভোট গ্রহণ পদ্ধতি একটি অনলাইন ব্যাংকিং পদ্ধতি বা আরও সহজভাবে বললে বিকাশে টাকা লেনদেন করার চেয়ে বেশি জটিল কিছু নয়।
সাইফুর রহমান: সিনিয়র তথ্য প্রযুক্তিবিদ, অস্ট্রেলিয়ান পাবলিক সর্ভিস ও শাহীদুল ইসলাম:  গবেষক ও উন্নয়নকর্মী