আমাদের দেশে একজন বাবর দুই দশক আগে বিখ্যাত হয়ে উঠেছিলেন নানা কারণে। তিনি জীবন শুরু করেছিলেন 'লাগেজ ব্যবসায়ী' হিসেবে। পরে জানা-অজানা পদ্ধতিতে প্রচুর বিত্ত-বৈভবের মালিক হয়েছিলেন। এক সময় পা রাখেন রাজনীতির মাঠে। ১৯৯১ সালে পঞ্চম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি মনোনীত প্রার্থী হিসেবে নেত্রকোনার একটি আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। ২০০১ সালে দ্বিতীয়বার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার পর তিনি ঠাঁই পান খালেদা জিয়ার নেতৃত্বাধীন মন্ত্রিসভায়। দায়িত্ব পান স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর। প্রথমে ওই মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী ছিলেন বিমানবাহিনীর সাবেক প্রধান এয়ার ভাইস মার্শাল আলতাফ হোসেন চৌধুরী। দুর্বৃত্তদের গুলিতে একটি শিশুর মৃত্যুর ঘটনায় 'আল্লার মাল আল্লায় নিয়া গেছে' মন্তব্য করে বিপাকে পড়েন তিনি। প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া আলতাফ হোসেন চৌধুরীকে সরিয়ে দেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর পদ থেকে। তার জায়গায় আর কাউকে নিয়োগ দেননি।
শোনা যায়, সে সময় সরকারের বাইরে থাকা ক্ষমতাধর এক ব্যক্তির ইচ্ছায় এটি ঘটেছিল। কেননা, আলতাফ হোসেন চৌধুরী প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশ ও অনুমতি ছাড়া কোনো কাজ করতেন না। পক্ষান্তরে লুৎফুজ্জামান বাবর ছিলেন ওই বিশেষ ব্যক্তির বিশ্বস্ত অনুচর। ফলে আলতাফ হোসেন চৌধুরীর বিদায়ে বাবরের ভাগ্য খুলে যায়। তিনি হয়ে যান স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সর্বেসর্বা। নিয়ম অনুযায়ী কোনো মন্ত্রণালয়ে কেবিনেট মন্ত্রী না থাকলে প্রধানমন্ত্রী ওই মন্ত্রণালয়ের ভারপ্রাপ্ত মন্ত্রী হিসেবে কাজ করেন। ফলে প্রতিমন্ত্রী হিসেবে বাবরকে প্রতিদিনই ফাইলপত্র বগলদাবা করে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে আসা-যাওয়া করতে দেখা গেলেও বেশিরভাগ সিদ্ধান্ত নিতেন তিনি তার অঘোষিত বসের আদেশ-নির্দেশ অনুসারে।
লুৎফুজ্জামান বাবর 'লুকিং ফর শত্রুজ' কিংবা 'দিস ইজ ঘোছনা অব গভর্নমেন্ট' ইত্যাদি অদ্ভুত ইংরেজি শব্দ উচ্চারণের জন্য সে সময় ব্যাপক পরিচিতি লাভ করেছিলেন। তবে অদক্ষতা, দুর্নীতি এবং অব্যবস্থাপনার কারণে অর্জন করেছিলেন কুখ্যাতিও। ২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারি জরুরি অবস্থা জারির পর বাবর চেষ্টা করেছিলেন বাঁচতে। সে সময় ঢাকায় তৎকালীন মার্কিন রাষ্ট্রদূত প্যাট্রিসিয়া বিউটেনিসের সঙ্গে সখ্য গড়ে বিএনপি সরকারের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়ারও চেষ্টা করেছিল। কয়েক দিন তাকে খুব দৌড়ঝাঁপ করতে দেখা গিয়েছিল। কিন্তু শেষ রক্ষা হয়নি। ওয়ান ইলেভেন সরকারের হাতে আটক হয়ে চলে যান কারাগারে। এর পরের ঘটনা সবারই জানা। দুর্নীতির কারণে তার জেল হয়েছে। ২১ আগস্টের গ্রেনেড হামলা মামলায় এখন ফাঁসির আসামি হয়ে কারান্তরালে দিন কাটাচ্ছেন। ক্ষমতার অপব্যবহার একজন মানুষের জীবনে কী চরম পরিণতি ডেকে আনতে পারে, তার প্রকৃষ্ট উদাহরণ হতে পারেন সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবর।
এক সময়ের মহাপ্রতাপশালী লুৎফুজ্জামান বাবরের নাম বিস্মৃতির অন্তরালে হারিয়ে যেতে বসেছিল। কিন্তু অতিসম্প্রতি আরেকজন 'কীর্তিমান' বাবরের নাম সংবাদমাধ্যমে উঠে আসার পর আবার তা আলোচনায় স্থান পেয়েছে। কয়েক দিন আগে এ বাবরের হাতকড়া পরা ছবি সংবাদপত্রে প্রকাশিত হয়েছে। দুই হাজার কোটি টাকা বিদেশে পাচারের একটি চাঞ্চল্যকর মামলায় পুলিশ তাকে গত ৭ মার্চ রাজধানীর বসুন্ধরা আবাসিক এলাকা থেকে গ্রেপ্তার করেছে।
আলোচ্য বাবরের পুরো নাম খন্দকার মোহতেশাম হোসেন বাবর। গত ৯ মার্চ সমকালে খন্দকার বাবরের ুকীর্তির যে বিশদ বিবরণ প্রকাশিত হয়েছে, তা পড়ে চক্ষু চড়কগাছ না হয়ে উপায় নেই। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এক সময় বিএনপি সরকারের মন্ত্রী চৌধুরী কামাল ইবনে ইউসুফের ঘনিষ্ঠ ছিলেন বাবর। ২০০৮ সালের নির্বাচনের পর ভাই খন্দকার মোশাররফ হোসেন মন্ত্রী হলে তিনি ক্ষমতার বলয়ে ঢুকে পড়েন। তিনি এতটাই প্রভাবশালী হয়ে উঠেছিলেন যে, তাকে ফরিদপুরের মানুষ আড়ালে-আবডালে 'রাজা' বলে সম্বোধন করত। স্থানীয় প্রশাসনের তিনি ছিলেন নিয়ন্ত্রক। সরকারি কাজের টেন্ডার, হাট-বাজার, রাস্তাঘাট, বাস টার্মিনাল ইজারাসহ এমন কোনো কাজ নেই, যেখানে বাবরের খবরদারি ছিল না।
ক্ষমতার অপব্যবহার করে খন্দকার মোহতেশাম বাবর গড়ে তুলেছেন অর্থবিত্তের পর্বত। রয়েছে দেশে-বিদেশে একাধিক বিলাসবহুল বাড়ি। যে ভাইয়ের ক্ষমতার দাপট ব্যবহার করে বাবর তার উত্থান ঘটিয়েছেন, সে ভাই এখন কথা বলছেন ভিন্ন সুরে। এ বিষয়ে তার ভাই সাবেক মন্ত্রী খন্দকার মোশাররফ হোসেন সমকালকে বলেছেন, 'আমার ভাই তো ৭-৮ বছর বয়সী বালক নয়। সে স্বাধীন মানুষ; স্বাধীনভাবে চলাফেরা করেছে। সে একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ। এ নিয়ে আমাকে প্রশ্ন করার কী আছে?'
এদিকে সাবেক ওই মন্ত্রীর এপিএস ফুয়াদ হোসেনের হাজার কোটি টাকার অবৈধ সম্পদ অর্জনের খবর বেরিয়েছে গত ১০ মার্চের সমকালে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মন্ত্রীর এপিএস হওয়ার পরই তার ভাগ্যের চাকা দ্রুত ঘুরতে থাকে। এই সময়ের মধ্যে সে ঢাকা, ফরিদপুর, চট্টগ্রাম, সিলেটসহ বিভিন্ন স্থানে পোশাক কারখানা, প্লট, বাড়ি, ফ্ল্যাট, শত শত বিঘা জমির মালিক হয়েছে নামে-বেনামে। এ ছাড়া বিভিন্ন ব্যাংকে তার রয়েছে প্রায় ৩০ কোটি টাকা। এপিএস ফুয়াদও এখন দুর্নীতির মামলায় জেলে রয়েছে। ফুয়াদের এসব অপকর্ম সম্পর্কে জানতে চাইলে খন্দকার মোশাররফ হোসেন সমকালকে বলেছেন, 'ফুয়াদ এত সম্পদ করেছে- এটা তো ধারণায় ছিল না। এ সবকিছু টের পেলে বহু আগেই ওকে তাড়িয়ে দিতাম। লোকজনই বা ওরে এত টাকা দিতে গেল কেন? ওর তো তেমন কোনো ক্ষমতাও ছিল না।'
ছোট ভাই বাবর আর এপিএস ফুয়াদের বিষয়ে খন্দকার মোশাররফ হোসেনের মন্তব্য যে 'ধরি মাছ না ছুঁই পানি' ধরনের, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। নিজের ভাই এবং এপিএস এত কিছু করে বেড়ালো, আর তিনি কিছুই টের পেলেন না- এটাও কি দেশবাসীকে বিশ্বাস করতে হবে? অনেকের ধারণা, বাবর আর ফুয়াদের দুর্নীতির সঠিক তদন্ত হলে থলে থেকে আরও কোনো বড়সড় বেড়াল বেরিয়ে পড়তে পারে।
মহিউদ্দিন খান মোহন :সাংবাদিক ও রাজনীতি বিশ্নেষক