একাত্তরের অগ্নিঝরা মার্চ মাসে সারাদেশের মতো খুলনাও ছিল উত্তাল। ২৫ মার্চের গণহত্যার খবর ছড়িয়ে পড়লে ওই সময়ই থেকেই প্রতিরোধ যুদ্ধের প্রস্তুতি শুরু করেন খুলনার ছাত্র-জনতা। যার ধারাবাহিকতায় ২৭ মার্চ রাতে ইউএফডি ক্লাবে পাকিস্তানি বাহিনীর তাঁবুতে প্রথম আক্রমণ করা হয়। ২৮ মার্চ পাকিস্তানি বাহিনীর বিশাল কনভয় খুলনা প্রবেশকালে তীব্র প্রতিরোধ গড়ে তোলেন ছাত্র-শ্রমিক-জনতা। ৩ এপ্রিল গল্লামারী রেডিও স্টেশনে পাকিস্তানি বাহিনীর ঘাঁটিতেও আক্রমণ করা হয়।

স্বাধীন বাংলা ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ খুলনা জেলার যুগ্ম আহ্বায়ক এবং মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক বীর মুক্তিযোদ্ধা স ম বাবর আলী বলেন, মার্চের উত্তাল সময়টায় হরতাল, মিছিল-সমাবেশসহ প্রতিটি কর্মসূচি খুলনায় কঠোরভাবে পালিত হয়েছে। বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণের পর আমরা মানসিকভাবে যুদ্ধের প্রস্তুতি নিতে শুরু করি। ২৩ মার্চ পাকিস্তান দিবসের পরিবর্তে 'বাংলাদেশ দিবস ও পতাকা দিবস' ব্যাপক আয়োজনে পালিত হয়। হাদিস পার্কে বিশাল জনসভা থেকে আমরা শপথ নিলাম 'দেশ স্বাধীন করবোই'। তিনি বলেন, ২৫ মার্চের গণহত্যার পর আমরা রাগে-ক্ষোভে ফুঁসতে লাগলাম। করণীয় নির্ধারণে আমরা খানজাহান আলী রোডে আলিয়া মাদ্রাসার সামনে 'কবীর মঞ্জিলে' বৈঠক আহ্বান করলাম। বাড়ির অন্যতম মালিক হুমায়ূন কবীর ছিলেন আওয়ামী লীগের নিবেদিতপ্রাণ কর্মী। ওই স্থানে গোপনে বৈঠকের পরিকল্পনা করেন মুজিব বাহিনীর খুলনা জেলা কমান্ডার শেখ কামরুজ্জামান টুকু। আমরা সিদ্ধান্ত নিলাম কবীর মঞ্জিল আগামী দিনগুলোতে বিপ্লবী পরিষদের সদর দপ্তর হিসেবে বিবেচিত হবে। ২৭ মার্চ সকালে অতি সতর্কতার সঙ্গে একে একে টুকু ভাই, শেখ আবদুল কাইয়ুম, আমিসহ অন্যরা মিলিত হলাম এবং আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে ঠিক হলো যুদ্ধ অনিবার্য। যুদ্ধ পরিচালনার জন্য একটা বিপ্লবী পরিষদ গঠন করা হলো। সিদ্ধান্ত হলো যে, এই পরিষদ যুদ্ধ চলাকালীন সময়ে সর্বোচ্চ পরিষদ হিসেবে বিবেচিত হবে। এই পরিষদের সিদ্ধান্ত হবে চূড়ান্ত। ২৭ মার্চ সন্ধ্যায় হঠাৎ শেখ কামরুজ্জামান টুকু সিদ্ধান্ত নেন, খুলনা সার্কিট হাউসে ও তৎসন্নিকটস্থ ইউএফডি ক্লাবে পাকিস্তানি সেনাদের তাঁবুতে আক্রমণ করা হবে। ১টা ২২ বোর রাইফেল, গোটা দুয়েক দেশি বন্দুক আর ওদের তৈরি বোমা ও ককটেল নিয়ে কামরুজ্জামান টুকু ভাই এ অভিযান পরিচালনা করেন। ইউএফডি ক্লাবে রাত ৮টায় মিলিটারিদের নৈশভোজের সময় এই ঝটিকা আক্রমণ শুরু হলো। প্রথমে বোমা ও ককটেলের বিস্টেম্ফারণ ঘটানো হয়। পরে ২২ বোর রাইফেল এবং দেশি বন্দুক দিয়ে গুলি করা হয় সার্কিট হাউস ও ইউএফডি ক্লাবের খান সেনাদের ছাউনিতে। মুহূর্তের মধ্যে সম্পূর্ণ এলাকা রণক্ষেত্রে পরিণত হয়। পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে হাজার হাজার গুলিবর্ষণ করা হয়। অতর্কিত এই আক্রমণের জন্য খান সেনারা আদৌ প্রস্তুত ছিল না। ফলে বহু পাকিস্তানি সেনা এই হামলায় আহত হয়। খুলনায় পাকিস্তানি মিলিটারিদের ওপর এটাই ছিল প্রথম আক্রমণ।

খানজাহান আলী থানা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের কমান্ডার বীর মুক্তিযোদ্ধা স ম রেজওয়ান আলী বলেন, মার্চের পুরোটা সময় সারাদেশের মতো খুলনায়ও চলছিল দুর্বার আন্দোলন। ২৫ মার্চের কালরাত্রিতে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর আক্রমণ ঢাকাকে করেছে তছনছ আর রক্তাক্ত। এর আগেই স্বাধীন বাংলাদেশ ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের পক্ষ থেকে বিভিন্ন স্থানে কমিটি গঠন করা হয়েছে।

খুলনা শহরের অদূরে বয়রা। বয়রায় তখন ব্যাপক প্রস্তুতি। নেতারা সিদ্ধান্ত নিলেন, যশোর রোড দিয়ে যদি পাকিস্তানি সেনারা খুলনা অভিমুখে অগ্রসর হয়, তবে প্রতিরোধ করবে। ২৮ মার্চ খবর এলো যশোর সেনানিবাস থেকে বিরাট এক কনভয় খুলনার দিকে অগ্রসর হচ্ছে। নোয়াপাড়া থেকে সেনাবাহিনী যাতে খুলনা শহরে প্রবেশ করতে না পারে, সে জন্য যশোর রোডের ওপর গাছ কেটে ফেলা হলো, ইট জোগাড় করে ব্যারিকেড দেওয়া হলো এবং দু'তিন জায়গায় কালভার্ট ভেঙে গাছপালা দিয়ে ঢেকে দেওয়া হলো। সেনাবাহিনীর কনভয় সেসব উপেক্ষা করে রাস্তার ব্যারিকেড পরিস্কার করে চলে আসে ফুলতলায়। সেনাবাহিনীর জিপ ফুলতলায় পৌঁছানোর সঙ্গে সঙ্গে যুদ্ধ শুরু হয়। ওইদিন ফুলতলা থানার ওসি হাবিবুর রহমান, তার পুলিশ বাহিনী এবং যুগ্মীপাশার মুসা বীরবিক্রমে যুদ্ধ করেন। পাকিস্তানি বাহিনীর অস্ত্রের কাছে প্রতিরোধ ভেসে যায়। হানাদাররা ব্যাপক হত্যাযজ্ঞ চালিয়ে খুলনার দিকে অগ্রসর হয়। পাকিস্তানি কনভয় দৌলতপুর পৌঁছলে অধ্যাপক আবু সুফিয়ানের নেতৃত্বে ছাত্র-শ্রমিক-জনতা প্রতিরোধ গড়ে তোলেন। ভারী অস্ত্রের কাছে কেউ টিকতে পারেননি। তার পরও ছোট ছোট এসব প্রতিরোধ যুদ্ধ আমাদের আত্মবিশ্বাস বেড়ে যায়।