রাজনীতিতে এখন আর নিজেকে কেউ কর্মী বলে না। সবাই নিজেকে নেতা বলতেই স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে। অন্য রাজনৈতিক দলগুলো যেহেতু রাজনীতি চর্চায় নেই, সেহেতু আওয়ামী লীগের কথাই বলতে চাই। আওয়ামী লীগ এবং এর অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনগুলো এখন নেতার দলে পরিণত হয়েছে। কর্মী হারিয়ে গেছে। আওয়ামী লীগের এখনকার যে কোনো অনুষ্ঠান আয়োজনে উপস্থিতি কানায় কানায় পূর্ণ থাকে। নেতার ভিড়ে কোথাও আর বসার জায়গা দূরের কথা, দাঁড়ানোর জায়গাও পাওয়া যায় না। অথচ '৭৫ পরবর্তী বিভিন্ন সময়ে দেখা গেছে, আওয়ামী লীগ করার লোক খুঁজে পাওয়া যেত না। এখন যেদিকে তাকানো যায় সেদিকেই শুধু আয়ামী লীগ আর আওয়ামী লীগ। এখন যা দেখা যায়, এই আওয়ামী লীগ আসলে কতটা আদর্শিক আওয়ামী লীগ সে ব্যাপারে গবেষণার প্রয়োজন নেই; এমনিতেই বলে দেওয়া যায়।
মনে পড়ে, আমি তখন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র। সময়টা আনুমানিক ১৯৯৮ সাল। আওয়ামী লীগ ক্ষমতার মসনদে। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের সম্মেলনে ঢাকা থেকে আবদুল জলিল, মোহাম্মদ নাসিম প্রমুখ জাতীয় নেতা গিয়ে বগুড়ার সাখাওয়াত হোসেন শফিককে সভাপতি ও রাজশাহীর আহসানুল হক পিন্টুকে সাধারণ সম্পাদক করে একটি আংশিক কমিটি গঠন করে দেন। তখন আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকলেও বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের এমনই হাল ছিল যে, পূর্ণাঙ্গ কমিটি করার মতো যোগ্য নেতা খুঁজে পাওয়া যেত না। যার কারণে ২০০২ সালে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাস করে আসা পর্যন্ত শুনিনি যে তখন পর্যন্ত সেই কমিটি পূর্ণাঙ্গ রূপ লাভ করেছে। ওই সময় প্রায় ৩০ হাজার ছাত্রছাত্রীর ক্যাম্পাসে ছাত্রলীগের মিছিলে ৩০ জনকেও খুঁজে পাওয়া যেত না। বিশ্ববিদ্যালয়ের হলগুলোতে ছাত্রলীগের উপস্থিতি ছিল না বললেই চলে। যে দুই-একজন ছাত্রলীগ করা ছেলে বা মেয়ে থাকত তারা প্রত্যেকেই নিজেকে হল সভাপতি বা আহ্বায়ক ইত্যাদি পরিচয় দিত এবং এখনও এসব মিথ্যা পরিচয় দিয়ে বেড়ায়। আবার জীবনে কোনোদিন ছাত্রলীগের মিছিল বা কোনো কর্মসূচিতে যায়নি এমন বহু চতুর মানুষকে এখন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের সাবেক বিরাট নেতা পরিচয় দিয়ে চলতেও দেখা যায়।
এখন সারা বাংলাদেশের চিত্র এমনই। যে কখনও আওয়ামী লীগ, ছাত্রলীগ করেনি বরং উল্টো এক সময় দলের বাইরে থেকে আওয়ামী লীগকে ধ্বংস করার নানা এজেন্ডা বাস্তবায়ন করেছে; সে এখন সবচেয়ে বড় আওয়ামী লীগ নেতা। তারা এখন দলের ভেতরে অনুপ্রবেশ করে সারা বাংলাদেশে আওয়ামী লীগকে আজ দল হিসেবে ধ্বংসের দিকে নিয়ে যাচ্ছে। বিষয়টি এখন ঘরের শত্রু বিভীষণে পরিণত হয়েছে। বহু ঝড়-ঝঞ্ঝা, ত্যাগ-তিতিক্ষা পেরুনো দল আওয়ামী লীগকে এ গোষ্ঠীটি তার চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য থেকে বের করে ফেলতে ইতোমধ্যে সক্ষম হয়েছে। কারণ আওয়ামী লীগ আজ ত্যাগী নেতাদের দল নয়। ত্যাগীদের বহু আগেই সাইড লাইনে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে। দলের বিভিন্ন পর্যায়ে আজ চতুর আর নষ্ট মানুষদের দোর্দণ্ড প্রতাপ। মাঝেমধ্যে কিছু নষ্ট লোক ধরা পড়ছে। কিন্তু শত শত নষ্ট লোক দাপিয়ে বেড়াচ্ছে। সমাজের বিভিন্ন স্তর, অফিস-আদালতে আওয়ামী লীগের বড় নেতা, মন্ত্রী, উপদেষ্টার লোক পরিচয়ে তাদের নাম ভাঙিয়ে নানা রকম অপকর্ম করে বেড়াচ্ছে এক দল মানুষ। তাদের রুখবে কে?
আওয়ামী লীগে সত্যিকার দৃঢ়চেতা ও আদর্শিক নেতা থাকলেও সেটি সংখ্যায় অতি নগণ্য। আর আদর্শহীনদের বলয়টা এত বড় যে, সেটি ভেদ করে এখনও যেসব আদর্শিক নেতা আছেন তারা হালে পানি পান না। একজন শেখ হাসিনার মাত্র দুটি চোখ আর কত দিকে নজর দিতে পারে! এসব আদর্শহীন নেতা দলীয় পদ-পদবি টাকার বিনিময়ে বিতরণ করে আদর্শহীন দিয়ে দল ভারি করে তুলছে।
মানুষের আস্থা ও ভরসার জায়গাটি ঠিক রাখতে হবে। ঐতিহ্যবাহী দল আওয়ামী লীগের ময়লা-আবর্জনা পরিস্কার করতে হবে নিজেদেরই। দলকে সুবিধাবাদীদের খপ্পর থেকে বের করে সত্যিকারের আদর্শিক আওয়ামী লীগে রূপান্তর করতে হবে। তাহলেই মানুষের মঙ্গল নিশ্চিত হবে।
সাজ্জাদ কাদির: টিভি উপস্থাপক
sazzadkadir71@gmail.com