আঠারো বিশিষ্ট নাগরিক যৌথভাবে ৭ এপ্রিল বিভিন্ন সংবাদপত্রে একটি বিবৃতি দিয়েছেন। বিবৃতিটি হয়তো দেশে কিছুটা আলোড়ন সৃষ্টি করবে- অন্তত পক্ষে অসাম্প্রদায়িক গণতান্ত্রিক এবং ধর্মনিরপেক্ষতা ও বাহাত্তরের সংবিধানের চার মৌল নীতিতে দৃঢ়ভাবে আস্থাশীল মানুষদের মধ্যে। কিন্তু আমি বুঝতে অক্ষম, মুক্তিযুদ্ধের প্রধান দলটি দীর্ঘকাল একটানা ক্ষমতায় থাকলেও তাদের মূল নেতৃত্ব এই যৌথ বিবৃতি এবং আমার মতো ক্ষুদ্রজনের এই নিবন্ধটিকে আদৌ আমলে নেবেন কিনা?

দেশের প্রথম সারির ১৮ বিশিষ্ট নাগরিক হলেন- আবদুল গাফ্‌ফার চৌধরী, সৈয়দ হাসান ইমাম, অধ্যাপক অনুপম সেন, রামেন্দু মজুমদার, ফেরদৌসী মজুমদার, ডা. সারওয়ার আলী, আবেদ খান, সেলিনা হোসেন, লায়লা হাসান, অধ্যাপক আবদুস সেলিম, মফিদুল হক, অধ্যাপক শফি আহমেদ, শাহরিয়ার কবির, নাসির উদ্দীন ইউসুফ, অধ্যাপক মুনতাসীর মামুন, সারা যাকের ও শিমূল ইউসুফ। তারা বলেছেন, আসুন, আমরা যে যার অবস্থান থেকে বিজ্ঞানভিত্তিক, সম্প্রীতি ও ন্যায়ের সমাজ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে একযোগে কাজে নেমে পড়ি। এখন সময় হয়েছে ধর্মান্ধ মৌলবাদীদের এ দেশ থেকে বিতাড়িত করার।

মাত্র দু-তিন মাস হলো অধ্যাপক রুমা সরকারকে রাষ্ট্রদ্রোহের মিথ্যা অভিযোগে গ্রেপ্তার করলে প্রতিবাদের ঝড় ওঠে। যেমন উঠেছে অধ্যাপক লতা সমাদ্দারকে টিপ পরার দায়ে লাঞ্ছনার ঘটনায়। রুমা সরকারকে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। মামলা তদন্তাধীন। প্রভাবশালীদের চাপে তাকে কলেজের অধ্যাপক পদ থেকে সাময়িক বহিস্কারও করা হয়েছে বলে শুনেছি। তবে তাকে জামিনে মুক্তি দেওয়া হয়েছে।

এ জাতীয় কয়েক হাজার ঘটনা বা এগুলোর চাইতেও আরও ভয়াবহ ঘটনা বাংলাদেশের নানা স্থানে বিগত ১০টি বছরে দিব্যি সংঘটিত হয়েছে এবং এসব ঘটনার খবর সংবাদপত্রে প্রকাশিতও হয়েছে। মসজিদে প্রকাশ্য দিবালোকে বা রাতে মাইকে উগ্র সাম্প্রদায়িক উত্তেজনামূলক বক্তব্য দিয়ে হাজার হাজার লোক জড়ো করে মন্দির, গির্জা, হিন্দু পল্লি আক্রমণ, লুটপাট নারী অপহরণ, ধর্ষণ, অগ্নিসংযোগ করার ঘটনাও দিব্যি ঘটতে পেরেছে। এখন অবস্থা এমন দাঁড়িয়েছে, আওয়ামী লীগেরও অনেকে ওই সংঘাত সৃষ্টিকারীদের সঙ্গী হয়েছে বা নীরব দর্শক হয়ে তা দেখছে।

পুলিশের ভাবখানা এই যে মাইকের ঘোষণা, হাজার হাজার লোক সমবেত হয়ে সাম্প্রদায়িক উত্তেজনাকর স্লোগান দিলেও তাদের কর্ণকুহরে তা প্রবেশ করে না। টেলিফোনে আতঙ্কিত লোকজন খবর জানালেও পুলিশের নড়ন-চড়ন চোখে পড়ে না। জিজ্ঞেস করলে জবাব পাওয়া যায়, ঘটনা কিছুটা শুনেছি, তবে এখনও কেউ মামলা করেনি। মামলা করলেই তদন্ত ও উপযুক্ত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। অভিযোগ আছে, ধর্মীয় উগ্র মৌলবাদীরা আজ সরকারের মধ্যে সরকারের দুর্বলতার কারণেই তাদের অবস্থান মজবুত করে নিতে সক্ষম হয়েছে।

পাঠ্যপুস্তকের সাম্প্রদায়িকীকরণ একটি সুদূরপ্রসারী চিন্তার ফসল- তাতে সন্দেহ নেই। পঞ্চম শ্রেণির পাঠ্যপুস্তক থেকেই শিশুরা একটু একটু করে বুঝতে শুরু ও বোঝার ক্ষমতা অর্জন করে। তখনই যদি তাদের পাঠ্যবইয়ে সাম্প্রদায়িক চিন্তা নিয়ে লেখা গল্প, কবিতা, উপদেশ প্রভৃতি শেখানো হয়, তবে সাম্প্রদায়িকতা যে তাদের মননে স্থায়ী বাসা বাঁধবে এবং অমুসলিমদের হেয় জ্ঞানই শুধু নয়; তাদের ঘৃণা করতে শেখাবে- তা সহজেই উপলব্ধি করা যায়। এভাবে বছরের পর বছর শিশুরা ওই চিন্তাধারা নিয়ে বড় হতে থাকবে। মুক্তিযুদ্ধের বাংলাদেশে যদি সাম্প্রদায়িকতা, পশ্চাৎপদতা, কূপমণ্ডূকতা পাকিস্তানের মতো স্থায়ী আসন করে নেয়; তাহলে নামেই শুধু দেশটা বাংলাদেশ থাকবে; কার্যত তা আধুনিকতাবর্জিত, সভ্যতাবর্জিত, হাজার বছর ধরে লালিত, বিকশিত বাঙালি সংস্কৃতি পরিত্যক্ত হবে পাকিস্তান-আফগানিস্তানের মতো এবং তার সুস্পষ্ট লক্ষণ নানাভাবে ইতোমধ্যে দৃশ্যমান।

মুজিব জন্মশতবার্ষিকী উপলক্ষে ঢাকায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ভাস্কর্য নির্মাণের সিদ্ধান্ত হয়েছিল। তা জানামাত্র উগ্র মৌলবাদী হেফাজতে ইসলাম হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছিল, এমন ভাস্কর্য যদি নির্মাণ করা হয়, তবে তা ভেঙে বঙ্গোপসাগরে নিক্ষেপ করা হবে। ওই হুঁশিয়ারি দ্বারা তারা এক ঢিলে দুই পাখি মারল। বাঙালি সংস্কৃতির স্মারক ভাস্কর্য তারা সহ্য করবে না এবং দ্বিতীয়ত বঙ্গবন্ধুর প্রতি তারা বিন্দুমাত্র শ্রদ্ধা পোষণ করে না। কী ভয়ংকর মূর্তি নিয়ে এ সংগঠনের আবির্ভাব হয়েছিল, তা এ প্রসঙ্গে স্মরণযোগ্য। তারা হঠাৎ সারাদেশ থেকে লক্ষাধিক মানুষের জমায়েত করে ঢাকা মহানগরীর প্রাণকেন্দ্রে। সেখান থেকে তারা তাদের ১৩ দফা দাবিনামা প্রকাশ করে, যাতে সরকার গৃহীত নারীনীতি, শিক্ষানীতি বাতিল করার দাবি জানিয়ে বলেছিল- এই ১৩ দফা বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতি না দিলে তারা এই 'ইসলামবিরোধী সরকার'কে উৎখাত করে ছাড়বে। অতঃপর জাদুকরি ঘটনা ঘটল। হেফাজতের সঙ্গে সরকারের আপস হয়ে গেল এবং তারা প্রকাশ্যে বলে উঠল, এই সরকার আমাদের বন্ধু; তবে আমরা আমাদের ঘোষিত ১৩ দফা কর্মসূচি বাস্তবায়নের দাবি ছাড়ব না। সময়ের ব্যবধানে দেখা গেল তাদের আমিরের মতানুযায়ী রাতারাতি সুপ্রিম কোর্ট প্রাঙ্গণ থেকে জাস্টিসিয়া নামক ভাস্কর্যকে 'দেবীমূর্তি' অভিযোগে অপসারণ করে লোকচক্ষুর অন্তরালে নিয়ে যাওয়া হলো। দেশের গণতন্ত্র ও স্বাধীনতাকামী মানুষ তাতে স্তম্ভিত।

এবার আসি জামায়াতে ইসলামী প্রসঙ্গে। বিএনপি নেতৃত্বাধীন নির্বাচনী জোটে থাকায় বিএনপি ন্যায্যতই কঠোর সমালোচনার পাত্র। কিন্তু এর পাশাপাশি অভিযোগ আছে, বিভিন্ন জেলা থেকে শত শত জামায়াত নেতাকর্মী (যাদের বিরুদ্ধে গাড়ি পোড়ানো এবং অন্যান্য অভিযোগে মামলা ছিল) আওয়ামী লীগে আনুষ্ঠানিকভাবে যোগদান করে তাদের একটি অংশ নৌকা প্রতীকে মনোনীত হয়ে ইউনিয়ন ও উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান-মেম্বার নির্বাচিত হয়ে বসেছে। কিন্তু কথা ছিল তাদের বেআইনি ঘোষণা করার। আইনমন্ত্রী আনিসুল হক অনেকবার বলেছেন, আইন প্রণয়ন করা হচ্ছে। শিগগিরই জামায়াতে ইসলামীকে বেআইনি ঘোষণা করা হবে। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার ট্রাইব্যুনাল গণহত্যার দায়ে জামায়াতের শীর্ষ নেতাদের বিচার করে রায় দানকালে স্পষ্টতই কয়েকটি মামলার রায়ের মন্তব্য দিতে গিয়ে জামায়াতে ইসলামীকে সন্ত্রাসী সংগঠন বলে মন্তব্য করে তার বিচার করার পক্ষে মতামত প্রকাশ করেছেন। কিন্তু বিচারকদের এই অভিমতকেও আমলে নেওয়া হয়নি।

সাত-আট বছর আগে আমাদের সর্বোচ্চ আদালতও তাদের বেআইনি ঘোষণা করেছিলেন। এসব সত্ত্বেও পঞ্চদশ সংশোধনী মারফত জিয়ার পঞ্চম সংশোধনী ও জামায়াত আজ স্থায়ীভাবেই বৈধ সংগঠন। ওই সংশোধনী মারফত এরশাদের অষ্টম সংশোধনীতে বর্ণিত রাষ্ট্রধর্ম ইসলামও রীতিমতো বৈধতা অর্জন করেছে আদালতের রায় ভিন্ন রকম হওয়া সত্ত্বেও।

এমন পরিস্থিতিতে সাম্প্রদায়িকতার প্রসার কেন ঘটবে না? শিক্ষক হৃদয় মণ্ডল, রুমা সরকার কেন গ্রেপ্তার হবেন না? কেনই বা অধ্যাপক লতা সমাদ্দার টিপ পরার দায়ে লাঞ্ছিত হবেন না? সার্বিক বিবেচনায় দেশে আজ এক ভয়াবহভাবে সাম্প্রদায়িকতার প্রসার ঘটে চলেছে; কখনও তা লোকচক্ষুর অন্তরালে আবার কখনও প্রকাশ্যে। আজ মোহমুক্তির দিন এসেছে। তাই মুক্তিযুদ্ধ ও ভাষা আন্দোলনের আদর্শ; বঙ্গবন্ধুর স্বপ্ন এবং বাঙালি সংস্কৃতিকে ধ্বংসের হাত থেকে বাঁচাতে; সব অহংকার ও জাতীয় মর্যাদা রক্ষা করতে; শিশুদের সাম্প্রদায়িক শিক্ষার কবল থেকে মুক্ত করতে একদিকে জাতীয় ঐক্য, অপরদিকে প্রগতিশীল সবার এক কাতারে দাঁড়ানোর বিকল্প নেই।

রণেশ মৈত্র: একুশে পদকপ্রাপ্ত, জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক